শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
বাংলার ঘরে ঘরে চিরাচরিত প্রথা মেনে পালিত হয় পৌষ সংক্রান্তিতে,আপামর বাঙালির চেনা পৌষ পার্বণ।মূলত,বাংলা ক্যালেন্ডারের শেষ মাসের শেষ দিনে এবং সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশের এই শুভক্ষণে কৃষিভিত্তিক এই উৎসব নতুন শস্যের আগমন এবং শীতের প্রাচুর্যকে বরণ করে নেয়।আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে,এই উৎসবের ধর্মীয় পবিত্রতা এবং বাংলার খাদ্য সংস্কৃতি ও লোক-ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রদর্শনী তুলে ধরা হল।
আরও পড়ুনঃ শীতের কামড় আরও তীব্র হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গে, মকর সংক্রান্তির আগে কেমন থাকবে বাংলার আবহাওয়া
লক্ষ্মীপুজোর ঐতিহ্য!
পৌষ পার্বণের মূল ভিত্তি হলো নতুন ধান বা নবান্ন।শীতকালে উৎপাদিত ধান ঘরে তোলার পর এই উৎসব পালিত হয়।যদিও সংক্রান্তি মূলত সূর্যদেবকে উৎসর্গীকৃত হলেও,তবে বাংলার এই উৎসবে গৃহস্থের ঘরে লক্ষ্মী দেবীর বিশেষ পূজা করা হয়। নতুন ধানের চাল থেকে তৈরি হয় লক্ষ্মীর প্রতীকী পদ, যা প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির জন্য দেবীর কাছে নিবেদন করা হয়।এই দিনে বাড়ির মহিলারা উঠোন বা দরজায় ধানের গোলাতে,লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ এবং অন্যান্য শুভ চিহ্নের সুন্দর আলপনা আঁকেন।
পিঠে-পুলি:বঙ্গীয় রন্ধনশিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন
পৌষ পার্বণের প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন ধরনের পিঠে-পুলি। এই সময়েই বাংলার ঘরে তৈরি হয় রকমারি পিঠে, যার প্রধান উপকরণ হলো নতুন চালের গুঁড়ো, দুধ, খেজুর গুড় (বিশেষত নলেন গুড়) এবং নারকেল।এই উৎসবে অন্তত এক ডজনেরও বেশি ধরনের পিঠে তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
* দুধপুলি: দুধে ভেজানো পুর ভরা পুলি।
* পাটিসাপটা: ক্ষীর বা নারকেলের পুর ভরা মিষ্টি রোল।
* ভাপা পিঠে: গরম জলের ভাপ বা ধোঁয়ায় তৈরি নরম পিঠে।
* গোকুল পিঠে ও তেলের পিঠে: তেলে ভাজা মিষ্টি।
গঙ্গাসাগর মেলা: পুণ্যস্নানের মহামিলন
পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে বাংলার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটে গঙ্গাসাগরে। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এই দিনে হুগলি নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে—কপিল মুনির আশ্রমে—পুণ্যস্নান করতে ভিড় করেন।”সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার”— এই প্রবাদটি মাথায় রেখেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু-সন্ত ও সাধারণ মানুষ এখানে এসে সমুদ্রে ডুব দেন। এই পবিত্র স্নানকে মোক্ষ লাভের অন্যতম পথ বলে মনে করা হয়। এটি বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের এক প্রাচীনতম ঐতিহ্য।
পৌষ পার্বণ তাই শুধু উৎসব নয়, এটি শীতের শেষে প্রকৃতির দানকে স্বীকার করে নেওয়া, নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া এবং পারিবারিক উষ্ণতা ও সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য দলিল। পিঠে-পুলি, নলেন গুড় আর লক্ষ্মীর আরাধনায় এই দিনটি বাংলার ঐতিহ্যকে সগৌরবে বহন করে চলেছে।









