বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিনিধি:
একদিকে বুথ স্তরে চরম সাংগঠনিক স্থবিরতা, অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তি প্রচার ও ‘অকমিউনিস্ট সুলভ আচরণ’—দলের অভ্যন্তরের এই জোড়া সংকট নিরসনে এবার কড়া অবস্থান নিল সিপিআইএম (CPIM West Bengal) রাজ্য নেতৃত্ব। সদ্য প্রকাশিত দলের ১ নম্বর ‘পার্টি চিঠি’-তে নজিরবিহীনভাবে বুথ ও শাখা স্তরের এই কঙ্কালসার পরিস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে আলিমুদ্দিন বার্তা দিয়েছে—নিচুতলার এই ব্যাধি সরাতে না পারলে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই ভূত তাড়াতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
শাখা ও বুথ স্তরে মূল রোগের উৎস
দলের দেওয়া অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ক্যাডারভিত্তিক বা ‘রেজিমেন্টেড’ পার্টি বলে পরিচিত সিপিএমের একদম প্রাথমিক স্তরেই রক্তক্ষরণ সবচেয়ে মারাত্মক:
-
এজি মেম্বার শূন্য ৬৪% শাখা: সিপিএমের নিয়ম অনুযায়ী পার্টি সদস্যপদ পাওয়ার আগে গণসংগঠনের কর্মীদের ‘সহকারী গ্রুপ’ বা ‘এজি মেম্বার’ (AG Member) করা হয়। কিন্তু পার্টি চিঠির তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ৬৪ শতাংশেরও বেশি শাখায় কোনো এজি মেম্বারই নেই।
-
‘বুথে ফেস নেই’: সোশ্যাল মিডিয়ায় বাম সমর্থক ও যুব কর্মীদের অতি-সক্রিয়তা থাকলেও নির্বাচনের মূল কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ বুথ স্তরে কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। দলের এক নেতার কথায়, “আমরা ফেসবুকে আছি, কিন্তু বুথে ফেস নেই।”
সমাজমাধ্যম, আত্মপ্রচার ও ‘অকমিউনিস্ট সুলভ’ অবক্ষয়
পার্টি চিঠিতে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের নীতিহীনতা এবং নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে:
| ক্ষেত্র | পার্টির অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ ও পদক্ষেপ |
| আত্মপ্রচারের প্রবণতা | দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং ও আত্মপ্রচারের ঝোঁক বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। |
| ডিজিটাল নজরদারি (CCTV) | সামাজিক মাধ্যমের গতিবিধি তদারকি ও সুসংহত করার জন্য প্রতিটি জেলায় একজন করে সর্বক্ষণের কর্মী (Full-timer) নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। |
| নৈতিক অবক্ষয় | চিঠিতে উল্লেখিত ‘অকমিউনিস্ট সুলভ আচরণ’ মূলত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন সম্পর্ক ও নৈতিক স্খলনকে ইঙ্গিত করে। অতীতে প্রাক্তন সাংসদ বংশগোপাল চৌধুরীর বহিষ্কার বা সুশান্ত ঘোষের জেলা সম্পাদক পদ হারানোর ঘটনাকে এই সার্বিক অবক্ষয়েরই অংশ বলে মনে করছে আলিমুদ্দিন। |
আরও পড়ুনঃ অসম্ভবই কি হতে চলেছে সম্ভব? ২০২৯-এ ‘তৃণমূল-সিপিএম’ মেগা জোট!
নতুন রক্তের খোঁজে কিছু জেলার ব্যতিক্রমী ভূমিকা
গোটা রাজ্যে সর্বক্ষণের কর্মী (Full-timer) সংগ্রহের কাজ ধীরগতিতে চললেও, কলকাতা ও হুগলির মতো কিছু জেলা ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে দলের কাজে নিয়ে আসতে কলকাতার জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার এবং হুগলির দেবব্রত ঘোষের বিশেষ উদ্যোগের কথা দলীয় অন্দরে চর্চিত হচ্ছে।
কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ—রাজ্যজুড়ে সংগঠন যেখানে কার্যত সর্বহারা, সেখানে ৩ মাসের এই ডেডলাইনে আলিমুদ্দিন বুথ স্তরে নতুন পুঁজি জোটাতে পারে কি না, রাজনৈতিক মহলে এখন সেটাই দেখার।


