পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময় যে দল ৩৪ বছর টানা শাসন করেছে, আজ সেই বামেরা কার্যত রাজনৈতিক প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৪২ আসনের একটিও জিততে পারেনি তারা। প্রশ্ন উঠেছে— “বামেরা কি আবার কোনোদিন বাংলার মসনদে ফিরতে পারবে?”
সংগঠন ও বাস্তব চিত্র: দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত হাল
দক্ষিণ ২৪ পরগনা: একসময় বামদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় বর্তমানে সংগঠন ভাঙনের চিত্র স্পষ্ট। সিপিএমের জেলা কমিটির ১৮ জন সদস্য গত বছর পদত্যাগ করেছেন। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে প্রতিযোগিতায় বামেদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য।
উত্তর ২৪ পরগনা: বারাসত, হাবড়া, বসিরহাটের মতো এলাকায় সিপিএমের সংগঠন একসময় তীব্র ছিল, কিন্তু এখন বুথভিত্তিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে সিপিএম অধিকাংশ ওয়ার্ডে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে শেষ করেছে।
আরও পড়ুনঃ গণনা শুরু বিহারে, এগিয়ে তেজস্বী, এগিয়ে ‘এনডিএ’; ভোটের জরুরি ১০ অঙ্ক
মুর্শিদাবাদ ও মালদা: এই দুই জেলায় একসময় বাম ভোটব্যাঙ্ক দৃঢ় ছিল। কিন্তু বর্তমানে কংগ্রেস ও তৃণমূল— দুই দলের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় বাম প্রার্থীরা জামানত হারাচ্ছেন।
পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর: হালদিয়া, তমলুক, খেজুরির মতো শিল্পাঞ্চলে একসময় বামেদের শক্ত সংগঠন ছিল। এখন সেখানে বিজেপি দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, আর সিপিএম কার্যত ছায়া মাত্র।
উত্তরবঙ্গ (জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার): ধূপগুড়ির মতো পুরনো বাম ঘাঁটি এখন বিজেপি-তৃণমূলের দ্বৈরথের কেন্দ্র। সিপিএমের উপস্থিতি ‘প্রতীকী’ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
আরও পড়ুনঃ রাজনীতির আঙিনায় বিপাকে তৃণমূল নেতা; অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা!
কেন পিছিয়ে পড়ছে সিপিএম সহ বাম দলগুলো?
নেতৃত্বের অভাব ও জনসংযোগের সংকট: দলের পুরনো নেতৃত্বে নবীন মুখের অভাব প্রকট। তরুণ ভোটারদের কাছে বাম রাজনীতি আর আকর্ষণীয় নয়।
রাজনৈতিক কৌশলে স্থবিরতা: আধুনিক প্রচারণা, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন বা জনমুখী আন্দোলনে পিছিয়ে পড়েছে দল।
ভোটভাগের বাস্তবতা: তৃণমূল ও বিজেপির উত্থানে বাম ভোট দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে— ফলে সিপিএম কোথাও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: স্থানীয় স্তরে মতবিরোধ, এবং সংগঠনে শৃঙ্খলার ঘাটতি আরও ক্ষতি করছে।
তবুও কি ফিরতে পারে লালঝান্ডা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “সিপিএম সহ বাম দলগুলো এখনো একমাত্র দল যার গ্রামীণ স্তরে কাঠামোগত শিকড় ছিল— যদি তারা আবার কর্মসূচি-নির্ভর আন্দোলনে ফোকাস করে, তাহলে কিছু জেলায় পুনরুত্থানের সম্ভাবনা আছে।”
দলের নবীন নেতৃত্বও দাবি করছে— “আমরা পরবর্তী প্রজন্মের বাম রাজনীতি গড়ে তুলছি। রাজনীতিতে আদর্শের মৃত্যু হয়নি, শুধু সংগঠনের পুনর্গঠন দরকার।”
জেলা-ভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট— সিপিএম সহ বাম দলগুলো পুনরুত্থান সহজ নয়। কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘অসম্ভব’ শব্দটি বহুবার নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে।
তাই প্রশ্ন এখনো খোলা: বাম রাজনীতি কি আবার বাংলায় মাথা তুলবে, না কি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে যাবে লাল অধ্যায়?









