শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
ইতু পুজো বাংলার অন্যতম,এক প্রাচীনতম লোক-উৎসব।যা মূলত, মহিলাদের দ্বারা অগ্রহায়ণ মাসে পালিত হয়।এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়,বরং বাঙালির কৃষিভিত্তিক সমাজ,উর্বরা শক্তি এবং সূর্য উপাসনার এক ঐতিহাসিক ধারাকে বহন করে চলেছে।কার্তিক সংক্রান্তি থেকে এই ব্রত শুরু হয় এবং অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবার।এই আরাধনা চলে অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি পর্যন্ত।এরপর,ইতু বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।কিন্তু এই ইতু পুজোর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে গ্রামবাংলার বুকে।
ইতু পুজোর প্রেক্ষাপট:
ইতু পুজোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এর মধ্যে একাধিক প্রাচীন উপাসনা ধারার মিশ্রণ খুঁজে পাওয়া যায়।
এই পুজোর সাথে সূর্য উপাসনার মতো প্রাচীন উপাসনার ধারাটা যুক্ত।অর্থ্যাৎ বলা যেতেই পারে,শুধুমাত্র ছট্ পুজোর দিন সূর্যারধনা করা হয় এটা পুরোপুরি ঠিক নয়।প্রাচীন ধর্মীয় গবেষকদের মতে, ‘ইতু’ নামটি এসেছে বৈদিক দেবতা ‘মিত্র’ থেকে।যিনি,আবার সূর্য দেবের অপভ্রংশ।যা কালক্রমে ‘মিতু’ বা ‘ইঁয়তি’ হয়ে ‘ইতু’ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই ব্রতের সময়কাল হিসাবে জ্যোতিষশাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে,কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে যখন,সূর্য তুলা রাশি থেকে বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করে।এই সময় সূর্যের অবস্থানকে ‘মিত্র’ নামেও অভিহিত করা হয়।অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবার এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়।এরকমটা হওয়ার কারণও আছে।আসলে,সূর্যের এই বিশেষ অবস্থান ও রবিবারের সঙ্গে সূর্যের যোগ। ইতু পুজোকে তাই বাঙালির লৌকিক সূর্য উপাসনা বলা চলে। সূর্য হলেন উর্বরা শক্তির আধার।মূলত,তাঁকে প্রসন্ন করে,বঙ্গের নারীরা সন্তান লাভ এবং সংসারের কল্যাণ কামনা করে।
তবে,আরেকটি লোকমান্যতা অনুযায়ী,ইতু দেব থেকে দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।গ্রামবাংলার বুকে তিনি পরিণত হয়েছেন,শস্যের দেবীতে।কিছু লোকাচার গবেষকবৃন্দের মতে,ইতু পুজো মূলত শস্যবৃদ্ধির কামনায় পালিত হয়।যুক্তি দিয়েছেন যে,যেহেতু অগ্রহায়ণ মাস হল,নতুন ধান ঘরে তোলার সময়।তাই যাতে ফসলের ক্ষতি না হয় কিংবা শস্যে যাতে কৃষকের গোলা ভরপুর হয়,এই কামণায় ইতুর পূজা করা হয়।
এই পুজোর উপকরণেও কিন্তু,কৃষির ছাপ রয়েছে।ইতুর ঘটে ধান, কচু, মানকচু, হলুদগাছ, এবং পাঁচ কলাইয়ের অঙ্কুর দেওয়া হয়। মাটির সরাকে কেন্দ্র করে এই আরাধনা চলে, যা শস্যের প্রাচুর্য ও পৃথিবীর উর্বরতাকেই তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে ইতু পুজো আসলে শস্য দেবীকে উৎসর্গ করার এক প্রাচীন কৃষি উৎসব, যা মাতৃতান্ত্রিক সমাজের ফসলের উপর নারীদের নিয়ন্ত্রণের ধারাকেও বহন করে।
আরও পড়ুনঃ সাময়িক ‘রেস্ট’–এ শীত; বাড়ছে তাপমাত্রা
ইতু পুজোর লোকাচারগুলি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক সরল ও পবিত্র চিত্র ফুটিয়ে তোলে:
* ব্রত পালন: কার্তিক সংক্রান্তিতে ব্রত শুরু হয় এবং অগ্রহায়ণের প্রতি রবিবার ব্রতী মহিলারা উপবাস করে পুজো করেন।
* ঘট স্থাপন: মাটির সরায় মাটি ভরে তাতে শস্যদানা, কচু, মান, হলুদ, কলমি ও শুশনি শাকের দল-দাম দিয়ে ইতুর ঘট বা ‘আটন’ সাজানো হয়। ঘটের গায়ে সিঁদুর দিয়ে পুতুল আঁকা হয়।
* ব্রতকথা: পুজোর শেষে মহিলারা সমবেত হয়ে ভক্তিভরে ইতু ব্রতকথা শোনেন, যা উমনো-ঝুমনো নামে দুই বোনের দুঃখ মোচন ও সমৃদ্ধি লাভের কাহিনি।
* নৈবেদ্য: নতুন চাল, নতুন গুড়, দুধ দিয়ে তৈরি পরমান্ন (পায়েস), পিঠে-পুলি এবং বিভিন্ন মরসুমি ফল ইতুকে নিবেদন করা হয়। এই সমস্ত উপকরণই মূলত নতুন ফসলের আগমনকে চিহ্নিত করে।

ইতু পুজোর লোকায়ত আঙ্গিকের কারণে বাঙালির জীবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।আসলে,এই পুজোকে ঘিরে সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। যেমন-
ঐতিহাসিক সংযোগ: এই ব্রত সূর্য, কৃষি, এবং উর্বরা শক্তির আরাধনার মাধ্যমে বাঙালির প্রাচীন লোক-সংস্কৃতির সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের এক সুক্ষ্ম সংযোগ স্থাপন করে।
নারীর ভূমিকা: ইতু পুজো মূলত মহিলাদের দ্বারা পালিত হয়। এর মাধ্যমে কৃষি ও সাংসারিক মঙ্গল কামনায় নারীর সক্রিয় ও প্রধান ভূমিকাটি প্রতিফলিত হয়।
সাংসারিক কল্যাণ: ব্রতীনিরা ইহলোকে শস্যবৃদ্ধি, ধন-জন বৃদ্ধি, পুত্রলাভ, স্বামীর মঙ্গল এবং পরলোকে মোক্ষ লাভের কামনা করেন।
একটা কথা শেষে বলতেই হচ্ছে যে,ইতু পুজো বাংলার এক জীবন্ত লোক-ঐতিহ্য। সময়ের প্রবাহে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হয়তো এর জৌলুস কিছুটা কমেছে, কিন্তু বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে ইতু পুজো আজও কৃষি, প্রকৃতি ও সূর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন জনজীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে বিদ্যমান।









