মণিপুরের ইম্ফল উপত্যকা আজ এক নিস্তব্ধ শ্মশানে পরিণত হয়েছে। যে উপত্যকায় একসময় ভোরের আলোয় উৎসবের সুর শোনা যেত, সেখানে আজ কেবল রাস্তার মোড়ে মোড়ে টায়ার পোড়া কালো ধোঁয়া আর আধাসামরিক বাহিনীর বুটের শব্দ।
৭ এপ্রিলের গভীর রাতের সেই অভিশপ্ত মুহূর্তটি মণিপুরের চলমান জাতিদাঙ্গার ইতিহাসে এক নতুন কালিমালিপ্ত অধ্যায় যোগ করেছে।
বিষ্ণুপুর জেলার মইরাং ট্রংলাওবি গ্রামে যখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই পাহাড়ের দিক থেকে ধেয়ে আসা একটি শক্তিশালী রকেট বা আইইডি (IED) কেড়ে নিল দুই নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ।
পাঁচ বছরের একটি শিশু আর মাত্র পাঁচ মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য কন্যাসন্তান—যাদের পৃথিবীটা ছিল কেবল মায়ের কোল আর দুলে ওঠা দোলনা, তারা আজ চিরতরে শান্ত।
আরও পড়ুনঃ আরও ১৪৯ পুলিশ আধিকারিককে সরিয়ে দিল নির্বাচন কমিশন
তাদের মা, যিনি একজন নার্স, গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।
এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চলতে থাকা মেতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যকার এক অন্তহীন ও বিষাক্ত সংঘাতের ফল।
মণিপুরের এই নতুন করে জ্বলে ওঠার পেছনে রয়েছে এক গভীর ক্ষোভ এবং বঞ্চনার ইতিহাস। গত বছরের মে মাসে তফশিলি জনজাতির (ST) মর্যাদা নিয়ে যে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা ২০২৬ সালেও নেভেনি। পাহাড় এবং উপত্যকার মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ এলাকা, যেখানে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী।
কিন্তু মইরাং ট্রংলাওবির ঘটনার পর সেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গ্রাম থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে সিআরপিএফ (CRPF) ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জঙ্গিরা রকেট হামলা চালানোর সাহস পেল? এই নিরাপত্তাহীনতার বোধই সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
৮ এপ্রিলের ভোর থেকে ইম্ফল উপত্যকার মেতেই মহিলারা এবং যুবকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। হাজার হাজার মানুষ বিষ্ণুপুরের রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের ক্ষোভ ছিল মূলত সিআরপিএফ-এর ওপর।
উত্তেজিত জনতা মনে করে, কেন্দ্রীয় বাহিনী কেবল নামেই আছে, কিন্তু পাহাড় থেকে আসা হামলা আটকাতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় যখন এক বিশাল জনতা সিআরপিএফ ক্যাম্প লক্ষ্য করে এগিয়ে যায়। উত্তেজিত জনতা ক্যাম্পের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চড়াও হলে পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী গুলি চালাতে বাধ্য হয়।
হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ গুলি চালিয়েছে তারা! সাধারণ মানুষের উপর!
এই সংঘর্ষে আরও দুই বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ৩১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। রিলেশনস অ্যান্ড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স (RIMS) হাসপাতালে আরও একজনের মৃত্যুর খবরে মৃতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে।
এই রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির টাইমিং বা সময়টা লক্ষ্য করার মতো। বর্তমানে ভারতের অন্য বেশ কিছু রাজ্যে, যেমন আসাম, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন চলছে / চলবে।
ভারতের নিরাপত্তা পরিকাঠামোয় নির্বাচন পরিচালনা করা একটি বিশাল কাজ, যার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী বা সিআরপিএফ জওয়ানদের সেই সব নির্বাচনী রাজ্যে মোতায়েন করতে হয়।
মণিপুরের সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে, নির্বাচনের জন্য মণিপুর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না। যদি সত্যিই তাই হয়, তবে এই নিরাপত্তাহীনতার শূন্যস্থানই কি জঙ্গিদের আরও বেপরোয়া করে তুলল? যখন রাষ্ট্রের মনোযোগ ভোটের বাক্সে, তখন কি সীমান্তের এই অশান্ত প্রান্তিক অঞ্চলগুলো কম গুরুত্ব পাচ্ছে? স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির কারণেই এই হামলা সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং এক উচ্চপর্যায়ের ‘ইউনিফাইড কমান্ড’ বৈঠক করেছেন। পাঁচ জেলায় তিন দিনের জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কারফিউ জারি করা হয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করলেই কি মানুষের মনের ক্ষোভ প্রশমিত হবে?
উত্তরটি সহজ নয়।
মণিপুরের এই লড়াই এখন কেবল দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সাধারণ নাগরিক বনাম নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। একদিকে ঘরছাড়া হাজার হাজার মানুষ রিফিউজি ক্যাম্পে দিন কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে যারা ঘরে আছেন, তাদের ওপর আকাশের দিক থেকে নেমে আসছে মৃত্যু।
আরও পড়ুনঃ মোফাক্কেরুল সহ ৫০ জনকে NIA হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ
মণিপুরের এই সংকট আজ কেবল খবরের হেডলাইন নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। যখন পাঁচ মাসের একটি শিশু যুদ্ধের শিকার হয়, তখন সেই যুদ্ধ কোনো পক্ষকেই জয়ী করে না।
নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে মণিপুরের এই ক্রন্দন কি দিল্লির কান পর্যন্ত পৌঁছাবে? নিরাপত্তা বাহিনীকে কি আবার নতুন করে সাজানো হবে?
এই প্রশ্নগুলো এখন ইম্ফলের বাতাসে ভাসছে।
সাধারণ মানুষের দাবি একটাই—তারা কেবল শান্তি চায় না, তারা চায় নিরাপত্তা। তারা চায় না তাদের সন্তানদের ঘুম আর কোনোদিন বারুদের গন্ধে ভেঙে যাক।
মণিপুর আজ বিচার চাইছে, বিচার চাইছে সেই দুই অবোধ শিশুর হত্যার, যারা লড়াই শব্দটার মানে বোঝার আগেই ইতিহাসের পাতায় রক্তের দাগ হয়ে রয়ে গেল।



