বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা মানুষের কথা বলে ব্রতকথা। অগ্রহায়ণ মাস লৌকিক ব্রতকথার অন্যতম মাস। আজ আবার রবিবার, আজ শোনাবো নাটাই চণ্ডী ব্রতর কথা।
নাটাই চণ্ডী, লোককথায় অনেকেই বলেন ইনি বনদুর্গা। যেহেতু নামে চণ্ডী আছে, অনেকে নাটাই মা ও বলে থাকেন, তাই মাতৃ শক্তি হবেন নিশ্চিত।
ব্রত আছে আর ব্রতকথা নেই হয় নাকি? এখানেও আছে এক গল্প।
আরও পড়ুনঃ রাঁচিতে বিরাট শাসন! বিরাট রাজার ঝোড়ো সেঞ্চুরিতে ইনিংস শেষে চালকের আসনে ভারত
বহুকাল আগে এক সওদাগরের এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল, কিন্তু ওনার স্ত্রী দেহ রাখেন, পরে দ্বিতীয় বিবাহ করেন সওদাগর। তাদের আরো দুই ছেলে-মেয়ে হয়।
সওদাগরের মনে প্রথম পক্ষের ছেলেমেয়েদের প্রতি বেশি স্নেহ ছিল, কারণ তারা ছিল মাতৃহারা, আর সৎ মায়ের কাছ থেকে আদর তারা পেত না। তিনি বাণিজ্য বন্ধ রাখেন তাদের দেখভালের জন্য।
এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রীর জোড়াজুড়িতে স্বামী বাধ্য হয় বাণিজ্য যেতে। যাওয়ার আগে গয়লা ও ময়রাকে মায়ের নামে কিছু দান করে বলে যায় যেন ঐ দুই ছেলে-মেয়ের খাওয়া দাওয়ার অসুবিধা না হয়। সে এসে তার খরচ দিয়ে দেবে।
এদিকে বাবা চলে যেতেই সৎমা তাদের বিভিন্ন কাজে পাঠিয়ে দেয়। বিনিময়ে তাদের খেতে দেয় ভাতের ফ্যান।
কিন্তু সেই সৎমা দেখে এত খাটনি আর ফ্যান খেয়েও ওদের শরীর বেশ হৃষ্টপুষ্ট।
তার তদারকির জন্য পরদিন ওদের সাথে নিজের ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দেয়। পরে যখন চারজন ফিরে আসে, তারা জানায় গয়লা আর ময়রার কথা।
আরও পড়ুনঃ পুতিনের সঙ্গে ভারতে আসতে পারে সুদর্শন চক্রের আধুনিক সংস্করণ S-৫০০
পরদিনেই সৎমা গয়লা আর ময়রা কে মিথ্যে বলে ঐ দুই ছেলেমেয়েদের খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, বলে বাণিজ্যে জাহাজডুবি হয়েছে, আর সওদাগর টাকা মেটাতে পারবেনা।
এদিকে আবার খাটনির চোটে ঐ দুই ছেলেমেয়ের শরীর কঙ্কালসার হয়, একদিন গোরু চড়াতে গিয়ে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লে উঠে দেখে গোরু নেই।
কেঁদেকেটে দুজনে চলে যায় পাশের এক গৃহস্থ বাড়িতে যেখানে নাটাই চণ্ডীর পুজো চলছিল।
তা দেখে ভাইবোন দুজনেই নাটাই মায়ের কাছে গোরু গুলো চায়।
এদিকে ওদের চাওয়া দেখে গৃহস্থ বাড়ির সকলে হাসাহাসি করে, তারপর তারা বলে নাটাই মায়ের কাছে চোদ্দো ডিঙা ধন, বাবা, নিজেদের জন্য বৌ, জামাই, হীরে সব চাইতে।
তা শুনে দুজনেই এইগুলোই কামনা করে, আর সত্যি সত্যি পরদিন তারা এই সবকিছু পায়!
বাবা ফিরে এসে তাদের খুঁজলে সৎমায়ের কীর্তির কথা জানতে পারে।
প্রমাদ গুণে সৎমা যখন বাণিজ্যের গয়না গোছাতে ব্যস্ত, তখন আচমকা খোঁড়া গর্তে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারায়।
নাটাই মায়ের কৃপায় আবার সুখ নেমে আসে ওদের জীবনে। কথায় বলে এই মাকে যা চাওয়া হয় , মায়ের কৃপায় তাই পায় সকলে।
পূর্ববঙ্গীয় রীতিতেও চল আছে এই ব্রতের, তবে এখানেও দেখা যায়। পুজোর উপকরণ হিসাবে একধরনের সেদ্ধ পিঠে থাকে , কচু পাতায় সাতটা সাতটা করে নুন ছাড়া ও নুনদেওয়া এই পিঠে গুলো রাখা হয়, সাথে থাকে বিভিন্ন ফুল ও কলমি শাকের ফুল। অগ্রহায়ণ রবিবারের সন্ধ্যায় শিয়াল ডাকার আগে কাকের চোখ এড়িয়ে ঘট বসিয়ে পুজো শুরু করতে হয়। আবার কাকের নজর এড়িয়ে মাটির উঠোনে ছোট পুকুর কাটে অনেকে যা আবার কাকের চোখ এড়িয়েই ভোরে সরিয়ে নেয়। আর কে প্রসাদে নোনা পিঠে আর কে নুনছাড়া পিঠে পাবে সেটাও নির্ভর করে ভাগ্যের ওপর! পুজোয় ব্রতকথা থাকবেই।
আজকে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার এই সংস্কৃতি। তবু বিশ্বাস কিছু মানুষ এখনো পালন করেন এসব রীতি। যার জন্যেই আমাদের বাংলা এখনো সজীব। অগ্রহায়ণের যদি চারটে রবিবার থাকে, এটি সবাই পালন করেন তিনটি রবিবার।








