সোমেন দত্ত, কোচবিহারঃ
বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএর বিপুল জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে আরএসএস। নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছে বিজেপি, জেডিইউ, এলজেপি(আরভি) এবং অন্যান্য জোটসঙ্গীরা, সেখানে আরএসএস এবং বিজেপির বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, জটিল সামাজিক সমীকরণযুক্ত জেলাগুলিতে বিশেষভাবে সংঘের মাঠপর্যায়ের কাজ জোটকে বাড়তি অক্সিজেন জুগিয়েছে। তারা মূলত জোর দিয়েছে সুশাসন ও উন্নয়নের ওপর।
সংবাদ মাধ্যমের খবর, আরএসএস বিহারের ৩৮টি জেলার প্রতিটিতে অন্তত ১০০ জন করে স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করেছিল, যারা তাদের সহযোগী সংগঠনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেছে। এর পাশাপাশি প্রায় ৫ হাজার এবিভিপি সদস্যকে পাঁচজনের ছোট দলগুলিতে ভাগ করে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে পাঠানো হয়েছিল। এই দলগুলি নীরবে কাজ করেছে। আরএসএসের এই চেষ্টা এনডিএর ভোটশেয়ার ২০২০ সালের নির্বাচনের তুলনায় অধিকাংশ আসনেই বাড়াতে সাহায্য করেছে। ২০২০ সালে এনডিএর কিছু শরিক, যেমন তৎকালীন অবিভক্ত লোক জনশক্তি পার্টি এবং জাতীয় লোক মোর্চা আলাদাভাবে নির্বাচন লড়েছিল। কিন্তু এবার সবাই একজোট হওয়ায় আরএসএস জোটের সব প্রার্থীকেই সমানভাবে সমর্থন করেছে।
আরএসএস সূত্রে খবর, যে যে আসনে এনডিএর যেসব শরিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সেগুলির ভোটশেয়ারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। বিজেপির ৪২.৫৬ ভোট থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮.৪৪ শতাংশ, জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর ভোট ৩২.৮৩ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৬.২ শতাংশ। এলজেপি(আরভি)-এর ভোট ১০.২৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৩.১৮ শতাংশ, হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা (সেক্যুলার)-এর ভোট ৩২.২৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮.৩৯ শতাংশ, এবং আরএলএমের ৪.৪১ ভোটের হার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪১.০৯ শতাংশ। এনডিএর সংখ্যাগরিষ্ঠতার গেরো পার করার আরও একটি কারণ হল মানুষের ভোট দেওয়ার ধরন বদলানো। আরএসএস কর্মীরা ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে কর্মক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থ—এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিতে হবে, প্রচলিত জাতিভিত্তিক ভোটের বদলে। বস্তুত, এই প্রথার জন্য বিহার বহুদিন ধরে পরিচিত। স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকেই সংঘের বিভিন্ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিহারে বাস করতেন। ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি ছাত্ররা সময় বের করতে পারলেই যোগ দিতেন নানা কর্মসূচিতে। আরএসএসের এক পদাধিকারী জানান, তাদের বাড়ি–বাড়ি প্রচার ভোটারদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে কেবলমাত্র জাতিভিত্তিক রাজনৈতিক পছন্দ বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থকে দুর্বল করে।

সবচেয়ে নজরকাড়া ফল এসেছে সীমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে। এটি এমন কিছু জেলার সমষ্টি যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সমাজসেবা, কমিউনিটি কাজ এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে গত দশকে আরএসএস এখানে ধীরে ধীরে তাদের পায়ের নীচের মাটি শক্তি করেছে। সংঘ কর্তাদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কারণেই তারা এই অঞ্চলের ২৮–৩২টি আসনে জাতিভেদের বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে হিন্দু ভোট একত্রিত করতে পেরেছেন। ৩২টি আসনের মধ্যে যেখানে মুসলিম ভোটাররা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে এবারের নির্বাচনে এনডিএ জিতেছে ২১টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি ১০টি, জেডিইউ ৮টি, এলজেপি (আরভি) ২টি এবং আরএলএম ১টি আসন জিতেছে। ২০২০ সালের তুলনায় এটি ভালো ফল। কারণ, সেবার এনডিএ এই আসনগুলির মধ্যে ১৮টিতে জিতেছিল।
আরও পড়ুনঃ গোয়েন্দা সতর্কবার্তা! ওড়িশায় বেআইনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান
বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চাও জুলাই থেকে একটি নীরব কিন্তু লক্ষ্যভিত্তিক প্রচার চালিয়েছে, বিশেষভাবে মুসলিম পরিবারগুলির ওপর গুরুত্ব দিয়ে। তারা কেন্দ্রের বিভিন্ন কল্যাণ প্রকল্প, যেমন উজ্জ্বলা ও আবাস যোজনার উদাহরণ তুলে ধরে জানিয়েছে, এসব প্রকল্প ধর্মনিরপেক্ষভাবে সবারই উপকার করেছে। সংখ্যালঘু মোর্চার প্রধান জামাল সিদ্দিকি বলেন, “অনেক মুসলিম পরিবার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে, কারণ তারা স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন চাইছিল।” তাঁর দাবি, নীতীশ কুমারের টেকসই সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন প্রচেষ্টা—এই দুটোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পরম্পরাগত নির্বাচনী ব্যবস্থার পাশাপাশি, আরএসএস এ বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মিশন ত্রিশূল নামে একটি বিশেষ প্রচারও করে। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত নিজেও এতে যুক্ত ছিলেন। প্রশ্ন হল, মিশন ত্রিশূল কী ? মিশন ত্রিশূল হল তিন ধাপের একটি কাঠামো, যার লক্ষ্য হল এনডিএর জয়ের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ অঞ্চলে বিরোধী মনোভাবের প্রভাব কমানো। মিশনের প্রথম ধাপে বুথ স্তরে ভোটার মানসিকতার বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা হয়। আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকরা গ্রাম ও ছোট শহরের মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন, বেকারত্ব, রাস্তার অভাব, কল্যাণমূলক সুবিধা বিলম্বে পাওয়া, বা স্থানীয় নেতাদের প্রতি ক্ষোভ এসব বিভিন্ন অসন্তোষের কারণ জানতে।
দ্বিতীয় ধাপটি হল যোগাযোগ কৌশল। যেসব এলাকায় অসন্তোষ পাওয়া গেল, সেখানে আরএসএস স্থানীয় সমস্যাগুলিকে বিজেপির বৃহত্তর জাতীয় প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করে, উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক পরিচয়, জাতীয়তাবাদ এবং স্থিতিশীলতা।
স্বেচ্ছাসেবকরা সরকারি প্রকল্প, কর্মসংস্থান প্রচেষ্টা, কৃষি সংস্কার, এবং সংরক্ষণ নীতি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এগুলিকে সুশাসন ও উন্নয়নের বড় গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেন (RSS)। মিশন ত্রিশূলের শেষ ধাপটি হল হিন্দু ভোটারদের একত্রিত করা। এবিভিপি, বাজরং দল, ভিএইচপি, মজদুর সংঘের মতো সংগঠনগুলি এই কাজে সাহায্য করে। তারা কোন বুথ বিজেপির শক্তিশালী, কোনটি দুর্বল – এগুলি চিহ্নিত করে এবং নিশ্চিত করে যে বিজেপি-সমর্থক ভোটাররা ভোটদানে সক্রিয় হয়।









