মাধ্যমিক, শিক্ষা-জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা৷ প্রথমবার সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়া এবং ফলাফলের উপর উচ্চশিক্ষার বিষয়টি নির্ভর করায় টেনশনে ভুগতে হয় সব পরীক্ষার্থীকেই৷ বিশেষ করে প্রথম বিষয়ের পরীক্ষার আগের রাতে টেনশনের মাত্রা অধিকাংশের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের সারতা গ্রামের বাসিন্দা মধুমিতা করও তার ব্যতিক্রম ছিল না৷ টেনশনের সেই রাত পেরিয়ে সকাল হওয়ার আগেই ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা, তার পরিস্থিতিকে আলাদা করে দিল সকলের থেকে৷ কাকভোরে ঘুম ভেঙে সে জানতে পারল, তার বাবা আর নেই৷ চলে গিয়েছেন না-ফেরার দেশে৷ এমন পরিস্থিতিতে কি পরীক্ষায় বসা যায়? উত্তর মধুমিতা নিজে৷ বাবাকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হলেও সে পরীক্ষা কেন্দ্রে হাজির হয়৷ পরীক্ষাও দেয়৷
আরও পড়ুনঃ আবারও জঙ্গি-বিরোধী অভিযান! জম্মু ও কাশ্মীরের উধমপুর জেলার রামনগরে ফের শুরু গুলির লড়াই
মাধ্যমিক শুরুর কয়েকঘণ্টা আগে জীবনে এমন একটি বিপর্যয়ের পরও পরীক্ষা দেওয়া, এই পথ অনেকটাই মানসিক দোটানার মধ্য দিয়ে পার হতে হয়েছে মধুমিতাকে৷ এই পরিস্থিতিতে তার পাশে ছিলেন আত্মীয়-পরিজনেরা৷ এমনকী, স্কুলের শিক্ষকও হাজির হয়েছিলেন তার বাড়িতে৷ সকলের যোগানো সাহসেই পরীক্ষা দিতে পেরেছে সে৷ পাশাপাশি যে স্কুলে পরীক্ষা কেন্দ্র হয়েছিল, সেখানকার শিক্ষকরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাতে বাবাকে হারানোর যন্ত্রণার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারে ওই কিশোরী৷
গতকাল, সোমবার (২রা ফেব্রুয়ারি) এই বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের সারতা তারকনাথ ইনস্টিটিউশনের পরীক্ষা কেন্দ্র দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদন৷ দুই স্কুলের দূরত্ব সাত কিলোমিটার৷ সারতা তারকনাথ ইনস্টিটিউশনের ছাত্রী মধুমিতা কর৷ সবংয়ের সারতা গ্রামের বাসিন্দা মধুমিতা রবিবার বেশ গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে৷ সকালে উঠে আবার পড়তে বসার পরিকল্পনা ছিল তার৷
সকাল হওয়ার আগে ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ তার ঘুম ভেঙে যায়৷ সে শুনতে পায় বাড়ির লোকেরা কান্নাকাটি করছে৷ কী হয়েছে? ঘর থেকে বাইরে এসে বুঝতে পারে বড় অঘটন ঘটে গিয়েছে৷ বাবা বাদলচন্দ্র করকে ঘিরে কান্নাকাটি শুরু করেছে বাড়ির সকলে৷ কিছুক্ষণ পর স্থানীয় এক চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়৷ তিনিই বাদলচন্দ্র করকে মৃত বলে ঘোষণা করেন৷ মধুমিতার জামাইবাবু অনুপ আদক বলেন, ‘‘শ্বশুরমশাইয়ের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। হাই সুগার ও কিডনির রোগ ছিল। কিছুদিন আগে পায়ে চোটও পেয়েছিলেন। তা নিয়ে ভুগছিলেন। তা থেকে বাড়িতেই মৃত্যু হয়।’’
বাবাকে চোখের সামনে এভাবে চলে যেতে দেখে বাড়ির অন্য সদস্যদের মতো কান্নায় ভেঙে পড়ে মধুমিতাও৷ তখন আর পরীক্ষার কথা মনে ছিল না তার৷ না-থাকাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু মাধ্যমিক তো শুধু একটা পরীক্ষা নয়৷ উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ পথের একটা দুয়ার৷ যা ভালো নম্বর নিয়ে পার হতে পারলেই ভবিষ্যতের দিশা স্পষ্ট হয়ে যায়৷ তাই পরিবারের সদস্যরাই প্রাথমিকভাবে ওই কিশোরীর মনে জোর ফেরানোর চেষ্টা করেন৷ পাড়া-প্রতিবেশীরাও তাকে বোঝান৷
আরও পড়ুনঃ বাংলার ২ প্রান্ত জুড়বে! চিকেনস নেকের কাছে মাটির নীচে ৪০ কিলোমিটার রেললাইন পাতার পরিকল্পনা ভারতের
মধুমিতার বাড়িতে যান সারতা তারকানাথ ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক অজয় বর্মনও। তিনি বোঝান পরীক্ষা দেওয়ার জন্য৷ অজয় বর্মন বলেন, ‘‘বাবার মৃত্যুতে মেয়ের মনের অবস্থা কী হয় আমরাও জানি। তা জেনেই ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। বোঝালাম, পরীক্ষায় না-বসলে একটি বছর নষ্ট হবে। তাই মনের কষ্ট চেপে যেন পরীক্ষায় বসে। মেয়েটি পড়াশোনায় খারাপ নয়। প্রথম বিভাগে পাশ করার যোগ্যতা রয়েছে বলেই মনে করি। গ্রামীণ এলাকায় থেকেও এতদিন পড়াশোনা করে পরীক্ষায় না-বসলে ক্ষতি হতে পারে ভেবেই বোঝাই। তাতে অবশ্য মধুমিতা পরীক্ষায় বসতে রাজি হয়।’’
ওই কিশোরীর জামাইবাবু অনুপ আদক বলেন, ‘‘সকলে বোঝাতে মধুমিতা পরীক্ষা দিতে রাজি হয়। আমিই মধুমিতাকে মোটরবাইকে করে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যাই। মধুমিতাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার পর শ্বশুরমশাইকে দাহ করা হয়।’’
পরীক্ষা কেন্দ্রেও বিষয়টি জানানো হয়৷ একজন ছাত্রী কয়েকঘণ্টা আগে বাবাকে হারিয়েও পরীক্ষায় বসছে, এই খবর পেয়ে তৎপর হন দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদনের শিক্ষকরাও৷ প্রথম দিন তো বটেই, দ্বিতীয় দিনও পরীক্ষার সময় শিক্ষকরাও তার পাশে থেকে সহায়তা করেছেন৷
দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদনের প্রধান শিক্ষক যুগল প্রধান বলেন, ‘‘আমাদের স্কুলে না-পড়লেও যেহেতু এখানে পরীক্ষা দিচ্ছে, তাই মধুমিতাও আমাদের ছাত্রীর মতোই। সে জন্য পরীক্ষা শুরুর আগে আমাদের শিক্ষিকারা ওর কাছে গিয়ে ভালো করে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে অনুপ্রেরণা জোগায়। যাতে শোকাহত অবস্থা থেকে সে পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক জোর পায়।’’
বাবার মৃত্যুশোক মনে চেপে রেখে পরীক্ষা দেওয়া সহজ কাজ নয়৷ তবে অসাধ্যসাধন করেছে সারতা তারকানাথ ইনস্টিটিউশনের ছাত্রী মধুমিতা কর৷ সোমবার প্রথম ভাষার পরীক্ষা দেওয়ার পর বাইরে এসে সে বলে, ‘‘বাবাকে ছেড়ে আসতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তবু সবাই বোঝানোয় পরীক্ষা কেন্দ্রে আসি। পরীক্ষা ভালো হয়েছে। পরের পরীক্ষাগুলিও দেব।’’ মঙ্গলবারও পরীক্ষায় বসেছে সে৷ তার আগে জানিয়েছে, প্রথম দিনের মতো প্রতিটি পরীক্ষা ভালোভাবে দিতে চায় সে৷









