বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি, কলকাতা:
দুর্গাপুজোর ছুটিতে বাঙালির পায়ের তলায় সরষে! কিন্তু পাহাড়ের কনকনে ঠান্ডা কিংবা পুরীর সমুদ্র সৈকত উপভোগ করতে গিয়ে যে পকেটে এমন গঙ্গার ড্রেজিং চলবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি ট্র্যাভেলপ্রেমী সাধারণ মানুষ। পুজো উপলক্ষে দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট কনফার্ম না হওয়ার সুযোগ নিয়ে হাত সাফাই শুরু করেছে বেসরকারি এসি ভলভো ও স্লিপার বাস সংস্থাগুলি। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ট্রেনের এসি ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়াকেও বহু পেছনে ফেলে দিয়ে বাসের টিকিট বিক্রি হচ্ছে ভিটেমাটি বিক্রির দামে!
ভাড়ার রকেট যাত্রা: ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস বনাম বাসের স্লিপার
পুজোর মুখে বাস ভাড়া কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। পরিসংখ্যান বলছে:
-
উত্তরবঙ্গ সফর: দার্জিলিং কিংবা পদাতিক এক্সপ্রেসে যেখানে এসি ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া প্রায় ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা, সেখানে চলতি সপ্তাহের শুক্রবার রাতে উত্তরবঙ্গগামী একটি বেসরকারি এসি স্লিপার বাসের ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫,৯৬০ টাকা!
-
পুরী ভ্রমণ: হাওড়া-পুরী সুপারফাস্ট ট্রেনের এসি ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া যেখানে ২৪৩০ টাকা, সেখানে শুক্রবার রাতের একটি ভলভো বাসের ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ৪,০৯৫ টাকা—যা সাধারণ থ্রি-এসি ট্রেনের টিকিটের ভাড়ার প্রায় চারগুণ!
-
দিঘার বাস: মাত্র ৩৬০ টাকায় যেখানে ট্রেনের এসি চেয়ার কারে দিঘা পৌঁছানো যায়, সেখানে বেসরকারি বাসের ভাড়া হাজার টাকার গণ্ডি ছুঁইছুঁই।
অন্যান্য দিন যে বাসের ভাড়া ছিল ৩০০০ বা ৩২০০ টাকার আশপাশে, পুজোর চাটু পড়তে না পড়তেই ‘ফ্লেক্সি ফেয়ার’-এর অজুহাতে তা পৌঁছে গেছে প্রায় ৬ হাজারের ঘরে। বিশেষ করে রাতের ‘নাইট সার্ভিস’ বাসগুলির আকাশছোঁয়া দামে মধ্যবিত্ত তো বটেই, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পর্যটকদেরও হাত পুড়ছে।
‘সব বুকড, শুধু টিকিটটাই ঝুলে!’ ফাঁপরে পড়া আমজনতা
অনেক কষ্ট করে হোটেল ও গাড়ি বুক করে রাখা থাকলেও শেষ মুহূর্তে ট্রেনের টিকিট নিশ্চিত (Confirm) না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন পর্যটকেরা। ট্রেনের টিকিটের ওপর ভরসা না পেয়ে বাধ্য হয়েই তিন থেকে চার গুণ বেশি টাকা দিয়ে বাসের টিকিট কাটতে হচ্ছে। পর্যটকদের আক্ষেপ, “বেড়ানোর বাজেট শেষ মুহূর্তে বাসের ভাড়াতেই অর্ধেক শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তো আর বেড়ানো বাতিল করা সম্ভব নয়!”
একইভাবে বিমান সংস্থাগুলিও এই সময় পকেট কাটার খেলায় মেতেছে। বিমান ভাড়াও অন্যান্য সময়ের থেকে আকাশছোঁয়া। তবে পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব রেলের দাবি, ভিড় সামাল দিতে প্রচুর স্পেশাল ট্রেন চালানো হচ্ছে, যদিও উত্তরবঙ্গ বা পুরীগামী ট্রেনগুলিতে টিকিটের আকাশছোঁয়া চাহিদা মেটাতে তা যে সাগরে শিশিরবিন্দুর মতো, তা মানছেন সবাই।
আরও পড়ুনঃ জামিন খারিজ, শ্রীভূমিতে সুজিতহীন পুজো হচ্ছে, যেমন কর্ম তেমন ফল
‘ফ্লেক্সি ফেয়ার’-এর দোহাই ও প্রশাসনের নজরদারির দাবি
বেসরকারি বাস সংস্থাগুলির সাফাই—বিমানের মতো বাসেও এখন ‘ফ্লেক্সি ফেয়ার’ চালু রয়েছে। অর্থাৎ, চাহিদা বাড়লে ভাড়া বাড়বে, আবার চাহিদা কমলে ভাড়া কমবে। পুজোর লম্বা ছুটিতে কালীপুজো পর্যন্ত এই চাহিদা থাকবে, তাই ভাড়াও চড়া।
তবে এই লাগামহীন ভাড়াবৃদ্ধি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ‘সারা বাংলা বাস-মিনিবাস সমন্বয় সমিতি’-র সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায়। তিনি কড়া ভাষায় বলেন, “এভাবে মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে যেমন খুশি ভাড়া বাড়ানো অত্যন্ত অনুচিত। সাধারণ মানুষের সমস্যার ফায়দা তুলে বেসরকারি সংস্থাগুলি দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে। সরকারের অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা কড়া নজরদারি চালু করা উচিত।”
পুজোর মেজাজে পর্যটকদের পকেট হালকা করে বাসের মালিকদের পকেট যে এখন থেকেই ভারী হতে শুরু করেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই!


