শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
স্বামী বিবেকানন্দ— যাঁর নাম শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে গৈরিক বসনধারী এক তেজস্বী যুবকের ছবি।শিকাগোর ধর্মসভা থেকে শুরু করে ভারতের পুনর্জাগরণ,স্বামীজির পরিচিতি বিশ্বজুড়ে।কিন্তু এই বিশাল ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে,এমন অনেক না বলা কিছু ছোট ছোট ঘটনা,অথচ যা তাঁর মানবিকতা এবং তীক্ষ্ণ রসবোধের পরিচয় দেয়।আজ তাঁর জন্মতিথিতে বঙ্গবার্তা স্বামীজির জীবনের তেমনই কিছু ‘অচেনা’ কথা তুলে ধরবে আপনাদের সামনে এই বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
আরও পড়ুনঃ বিশৃঙ্খলা কোর্টরুমে! রাগে এজলাস ছাড়লেন বিচারপতি
* রাজস্থানের সেই রূপসী ও স্বামীজির শিক্ষা
পরিব্রাজক অবস্থায় স্বামীজি যখন রাজস্থানের খেতরিতে ছিলেন,তখন সেখানকার মহারাজা তাঁর সম্মানে এক সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন করেন।আমন্ত্রিত গায়িকা ছিলেন একজন বাঈজী।সন্ন্যাসী হিসেবে পরনারীর গান শোনা অনুচিত মনে করে বিবেকানন্দ সেখানে যেতে অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে সেই গায়িকা একটি ভজন গেয়েছিলেন যার মর্মার্থ ছিল— “প্রভু, আমার দোষগুণ বিচার করো না,কারণ তুমি সমদর্শী।“গানটি শুনে স্বামীজি স্তব্ধ হয়ে যান।তিনি বুঝতে পারেন,তাঁর অন্তরেও কোথাও এক সূক্ষ্ম অহংকার ও বিচারবোধ কাজ করছিল।তিনি সেই মজলিসে গিয়ে গায়িকাকে আশীর্বাদ করেন এবং বলেন,এই নারীই আজ তাঁকে প্রকৃত ‘সমদর্শিতা’র পাঠ দিলেন।
* রসবোধ ও উপস্থিত বুদ্ধি
স্বামীজি যে খুব রসিক ছিলেন,তা তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানতেন।আমেরিকায় থাকাকালীন একবার এক উদ্ধত ইংরেজ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনার দেশের মানুষ কেন আমাদের মতো জুতো–মোজা পরে সবসময় ফিটফাট থাকে না?” স্বামীজি স্মিত হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,”আপনাদের দেশে দর্জি মানুষ তৈরি করে,কিন্তু আমার দেশে চরিত্র মানুষ তৈরি করে।” এই উত্তর শুনে ওই ইংরেজ নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন।
* শরীরচর্চা ও ফুটবল প্রেম
আমরা প্রায় সকলেই জানি যে,খেলাধুলো ও শরীরচর্চার ওপর তাঁর আগ্রহের কথা।কিন্তু,অনেকেই জানি না যে,স্বামীজি একজন দক্ষ ফুটবলার এবং কুস্তিগীর ছিলেন।তরুণ নরেন্দ্রনাথ যখন সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজে যেতেন,তখন তিনি রীতিমতো শরীরচর্চা করতেন।তাই তো তিনি মনে করতেন,”গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে।“তাঁর মতে,দুর্বল শরীরের অধিকারী হয়ে আধ্যাত্মিকতা লাভ সম্ভব নয়।শরীর সবল না হলে মনের জোর আসে না।এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারা সেই সময়কার যুবসমাজের কাছে ছিল এক বিশাল প্রেরণা।যা,পরবর্তীতে পরাধীন ভারতের বিপ্লবীদের কাছেও সমানভাবে সমাদৃত হয়েছিল।
* প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা
স্বামীজি বেলুড় মঠে অবস্থান করা কালীন মঠে,কেবল সন্ন্যাসীরাই থাকতেন না,সেখানে ছিল এক অদ্ভুত পশুশালা।তাঁর একটি প্রিয় ছাগল ছিল,যার নাম তিনি রেখেছিলেন ‘হংসী‘।এছাড়াও তাঁর একটি পোষা হরিণ ছিল।স্বামীজির এই পশুপ্রেম প্রমাণ করে যে,সন্ন্যাস জীবনের কঠোরতার মাঝেও এই অবলা জীবগুলোর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ করাই আসল সন্ন্যাসধর্ম পালন।পাশাপাশি,এটাও প্রমাণ করে যে স্বামীজি শুধু মানুষের জন্য নয়,সমস্ত জীবের মুক্তির কথাই ভাবতেন ও তার সকল উপদেশ সকল জীবকূলের হিতার্থেই উচ্চারিত করেছেন।যেমন তাঁর সকল জীবকূলের জন্য সেই অমোঘ বাণী–
“জেগে ওঠো,সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।”
স্বামীজির এই অজানা দিকগুলো আমাদের শেখায় যে,আদর্শবাদ মানেই কেবল গম্ভীর থাকা নয়,বরং জীবনকে তার সমস্ত বৈচিত্র্য নিয়ে গ্রহণ করাই হলো আসল মনুষ্যত্ব।আজকের এই পবিত্র দিনে তাঁর আদর্শ আমাদের পথ চলার পাথেয় হোক।









