মারাদোনাকে যখন কলকাতায় নিয়ে আসা হয়, তখন দেশে বিশ্বকাপ বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের জনপ্রিয়তা ততটা ছিল না। আর এ দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তাও কমছিল। যে কারণে কয়েকজন বিশ্বের তারকা ফুটবলারদের নিয়ে জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার একটা প্রকল্প নেওয়া হয়। সেই সূত্রেই যুবভারতীতে আসেন মারাদোনা।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বের কাছে মাথা নিচু হল কলকাতার, এবার বাংলা ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরেও মমতা সরকারের নামে ছিছিক্কার
তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন সুভাষ চক্রবর্তী। ক্রীড়া দফতরের পক্ষ থেকে একটা অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল মারাদোনাকে। কলকাতার রাস্তায় বিমানবন্দর থেকে উপচে পড়েছিল মানুষের ঢল। ১৯৮৬-৮৭ সালে ইতালির ক্লাব নাপোলির হয়ে জেতার পর যেমন করে তাঁদের অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল, কলকাতা দেখে মারাদোনার সেই রাতের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আবেগে চোখে জল এসেছিল মারাদোনার।

কাট টু ২০২৫। তুমুল হইচই কলকাতায়। কী, না ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল মেসি কলকাতায় আসছেন। যতটা না তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাস ছিল ফ্যানদের মধ্যে, বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবিটাই বদলে গিয়েছে। হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটেও মেসির টিকিটি দেখতে পাননি দর্শকরা। যুবভারতীতে যা নিয়ে চরম অব্যবস্থা তৈরি হয়। রাগে, গা চিড়বিড় করে মেসিকে দেখতে আসা ভক্তরা এই অব্যবস্থার জন্য কাঠগড়ায় তুললেন প্রশাসনকে। কেউ কেউ বললেন, “নেতা-মন্ত্রীরা যেভাবে মেসিকে ঘিরে রেখেছিলেন, তাতে বোঝা গেল ওঁরা আমাদের টাকায় ছবি তুললেন। লজ্জা, ছিঃ!”
মারাদোনার আসার কথা মনে করিয়ে দিয়ে এক দর্শক জানালেন, “এই চরম অব্যবস্থার মধ্যে মনে পড়ে যায় প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর কথা। এখনকার নেতা-মন্ত্রীর মতো তাঁকে কখনও ছবি তুলতে হয়নি। এর আগে কত বড় অনুষ্ঠান হয়েছে, কই, কিছুই হয়নি তো। আজ সুভাষবাবুকে বড্ড মিস করছি।”

সকাল ঠিক ১১টা ৩০ মিনিট নাগাদ যুবভারতীতে ঢুকল মেসির (Kolkata Messi) গাড়ি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ ও রদ্রিগো ডি পল। ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা দেখে হাসিমুখেই ছিলেন মেসি। কিন্তু গাড়ি থেকে নামার পরেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। মন্ত্রী, কর্তা ও আমন্ত্রিতদের ভিড়ে প্রায় ঘিরে ফেলা হয় আর্জেন্টিনার তারকাকে। ছবি তোলার হুড়োহুড়িতে তাঁর হাঁটার জায়গাটুকুও প্রায় ছিল না। নিরাপত্তারক্ষীরা চারদিক থেকে ঘিরে রাখলেও গ্যালারি থেকে প্রায় ২০ মিনিট ধরে মেসিকে দেখাই গেল না। যা নিয়ে চরম হতাশ দর্শকরা।
আরও পড়ুনঃ রাজ্যে ৮৫ লক্ষ ভোটারের বাবার নামে গলদ! এবার তথ্য যাচাই করবে কমিশন
এর মধ্যেই গ্যালারিতে শুরু হয় অসন্তোষ। ‘উই ওয়ান্ট মেসি’ স্লোগান শুরু হয় স্টেডিয়ামে। টিকিট কেটে আসা দর্শকদের ভরসা ছিল স্টেডিয়ামের তিনটি জায়ান্ট স্ক্রিন। কিন্তু সেখানেও পরিষ্কার ভাবে মেসিকে দেখা যাচ্ছিল না। মোহনবাগান ও ডায়মন্ড হারবারের প্রাক্তন ফুটবলারদের সঙ্গে পরিচয়পর্ব চলাকালীনও তাঁকে ঘিরে ভিড় কমেনি। নেতা-মন্ত্রীরা তো বটেই, আয়োজকদের লোকজনও এমন ভাবে মেসিকে ঘিরে রেখেছিলেন যে মেসির টিকিটিও দেখতে পাননি দর্শকরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও প্রধান আয়োজক শতদ্রু দত্তকে মাইক্রোফোনে বারবার অনুরোধ জানাতে হয়। তাতেও কাজ হয়নি। পরিস্থিতি সামলাতে লাঠিচার্জ শুরু হয় স্টেডিয়ামে।
১১টা ৫২ মিনিট নাগাদ মেসিকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শাহরুখ খান বা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় স্টেডিয়ামে পৌঁছননি। মেসি বেরিয়ে যেতেই দর্শকদের ক্ষোভ চরমে পৌঁছয়।

মোটা অঙ্কের টিকিট কেটে এসেও প্রিয় ফুটবলারকে দেখতে না পাওয়ায় শুরু হয় ভাঙচুর। গ্যালারির হোর্ডিং ভাঙা হয়, চেয়ার ছুড়ে মারা হয় মাঠে। সেই সময় গ্যালারিতে পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। মেসিকে না দেখতে পাওয়ার হতাশা ও ক্ষোভ মিলেমিশে গোটা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।









