শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
শুধুমাত্র,দূর্গাপুজো,কালীপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজো এটুকেই ক্ষান্ত।কথায় আছে,বাঙালীর বারোমাসে তেরো পার্বণ।এই তেরোটা পার্বণের মধ্যে আরো অনেক পার্বণ আছে,তার মধ্যে অন্যতম হল,নবান্ন উৎসব।কিন্তু,এক সময়ে বাংলার প্রায় প্রতিটি বাঙালী পরিবারে পালিত হত,এই উৎসব।বর্তমানে,যান্ত্রনির্ভর সভ্যতার যুগে,আমরা আমাদের মাটিতেই,কেমন যেন পরবাসী হয়ে উঠেছি।সে কথা থাক্,জানেন কি আজও গ্রামবাংলার বুকে কিছু জায়গায় এই নবান্ন উৎসব সারম্বরে পালিত হয়।
আসুন জেনে নেওয়া যাক্,বাংলার কোথায় কোথায় নবান্ন উৎসব এখনো ভালোভাবে পালিত হয়।তার একটি বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চল এবং কৃষিপ্রধান জেলাগুলিতে এই উৎসবটি এখনো বড় পরিসরে পালিত হয় (বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর):
এই উৎসব রাঢ় অঞ্চলের বৃহত্তম লৌকিক উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এখানে কার্তিক মাসের সংক্রান্তির দিন ‘মুট’ আনার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয় এবং অগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন ভোজন সম্পন্ন হয়।
আরও পড়ুনঃ ধৃতি যোগে মূলা নক্ষত্র, বাড়ি-গাড়ি কেনার সুযোগ এই চার রাশির
নবান্ন উৎসবের মূল উদযাপন মূলত নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে বেশি চোখে পড়ে:

১. তারাপীঠের নবান্ন উৎসব
নবান্ন উপলক্ষে কার্তিক পূজার আয়োজন হলই,তারাপীঠের নবান্ন উৎসবের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক।এছাড়া,এই উৎসবে দেবী মূর্তি পূজার রীতি নেই।আসলে,তন্ত্রের দেবী তারার প্রধান আরাধনা ক্ষেত্র।তাই পীঠে মা তারা ছাড়া অন্য কোনো দেবী মূর্তি গড়ে পূজার প্রচলন নেই।যেহেতু,দেবী মূর্তির পূজা করা হয় না, তাই অগ্রহায়ণ মাসে,নবান্ন উৎসবের দিন তারাপীঠের মানুষ একত্রিত হয়ে কার্তিক ঠাকুরের মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে মহা ধুমধামের সাথে পূজা শুরু করেন।
এই কার্তিক পূজা ধীরে ধীরে এতই জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, এটি এখন তারাপীঠের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী উৎসবের মধ্যে অন্যতম। সাধারণত ৪-৫ দিন ধরে চলে।অনেক ভক্তরাই একে দুর্গাপূজার মতো আনন্দের উৎসব বলে মনে করেন।
আরও পড়ুনঃ রবির ছুটির দিনে কেমন থাকবে বাংলার আবহাওয়া

বর্ধমানের নবান্ন উৎসবের বিশেষত্ব রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা আলাদা, কারণ এটি মূলত অঞ্চলভিত্তিক লোকাচার এবং এখানকার জমির উর্বরতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বর্ধমান জেলাকে একসময় ‘বাংলার শস্যভান্ডার’ বলা হতো,তাই এখানকার নবান্ন উৎসবের মাহাত্ম্য ছিল অন্যরকম।
বর্ধমান জেলা প্রাচীনকাল থেকেই ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয়। এখানকার নবান্ন উৎসব তাই কেবল একটি প্রথা নয়, এটি প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের উদযাপন। নতুন ধানের চালের তৈরি বহুবিধ পদ এখানে তৈরি হয়। এখানকার অনেক কৃষিপ্রধান পরিবারে নবান্নের দিন ‘গোলা পূজা’ বা শস্যের মরাই পূজার চল আছে। শস্যের ভাণ্ডার পূর্ণ হওয়ায় লক্ষ্মী দেবীকে এই সময় ‘হেমন্ত লক্ষ্মী’ রূপে আরাধনা করা হয়, যাতে আগামী বছরেও শস্য ভাণ্ডার পূর্ণ থাকে।
এই উৎসব মূলত নতুন চাল,খেজুরের বা আগের নতুন গুড় এবং টাটকা ফল ও সবজি নির্ভর।নবান্ন উৎসবের এমন দুটি হারিয়ে যাওয়া বা কম প্রচলিত রেসিপি নিচে দেওয়া হলো:

১. নতুন চালের পায়েস রেসিপি
নবান্নে সাধারণত নতুন ধানের গোবিন্দভোগ বা সুগন্ধী চালের পায়েস তৈরি করা হয়।
উপকরণ
দুধ (ফুল ক্রিম) – ১ লিটার, গোবিন্দভোগ চাল – ৫০ গ্রাম বা ১/৪ কাপ, গুড় (নলেন বা খেজুর) – ১৫০-২০০ গ্রাম বা স্বাদমতো,কাজুবাদাম ও কিশমিশ – ২০টি করে,তেজপাতা – ২টি,এলাচ গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ,ঘি – ১ চা চামচ।
প্রণালী
গোবিন্দভোগ চাল ভালো করে ধুয়ে ১ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন, তারপর জল ঝরিয়ে নিন।এরপর,একটি পাত্রে দুধ নিয়ে হালকা আঁচে বসান। তেজপাতা ও এলাচ গুঁড়ো দিয়ে দুধ ফুটিয়ে ঘন করে নিন।তারপর,অন্য একটি কড়াইতে সামান্য ঘি গরম করে তাতে কাজুবাদাম ও কিশমিশ হালকা ভেজে তুলে নিন। এই ঘিয়ে চালগুলো দিয়ে ২ মিনিট ভেজে নিন।
* পায়েস তৈরি: দুধ ফুটে উঠলে ভেজে রাখা চাল তাতে দিয়ে দিন। মাঝে মাঝে চামচ দিয়ে হালকা হাতে নাড়তে থাকুন, যাতে পাত্রের তলায় লেগে না যায়।চাল সেদ্ধ হয়ে গেলে এবং দুধ আরও ঘন হয়ে এলে চুলা থেকে নামিয়ে রাখুন।পায়েস একটু ঠান্ডা হয়ে এলে তাতে গুড় বা বাতাসা (কুচানো) দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে দিন। পায়েস পুরোপুরি গরম থাকা অবস্থায় গুড় মেশালে দুধ ফেটে যেতে পারে।সবশেষে ভেজে রাখা কাজুবাদাম ও কিশমিশ ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
২. ছানাবড়া / চাঁচির মিষ্টি (দুধের ছানা বা চাঁচি দিয়ে তৈরি)
নবান্নের মিষ্টি মানেই ছিল নতুন চাল আর গুড়ের ব্যবহার। তবে একসময় অনেক গৃহস্থের বাড়িতে গাই-গরু থাকত এবং দুধ থেকে বিশেষ মিষ্টি তৈরি করা হতো। এই মিষ্টি তৈরিতে গরুর দুধ মেরে ‘চাঁচি’ (দুধের সরকে ঘন করে শুকিয়ে তৈরি করা) জমিয়ে রাখা হতো।
উপকরণ:
* ছানা বা চাঁচি: ১ কাপ,* নতুন গুড়: ১/২ কাপ,* এলাচ গুঁড়ো: ১/২ চা চামচ,* জল: ১ কাপ
প্রণালী:
ছানা বা চাঁচি ভালোভাবে মেখে মসৃণ করে নিতে হবে। ছানা হলে ভালো করে জল ঝরিয়ে নিতে হবে।মাখা ছানা বা চাঁচি দিয়ে ছোট ছোট বড়ার আকার দিন। একটি পাত্রে গুড় এবং জল মিশিয়ে গরম করুন। গুড় গলে গেলে সামান্য এলাচ গুঁড়ো দিয়ে হালকা শিরা তৈরি করুন (খুব ঘন করার দরকার নেই)।
৪. বড়া তৈরি: একটি কড়াইয়ে সামান্য ঘি বা তেল গরম করে ছানার বড়াগুলি সোনালী হওয়া পর্যন্ত হালকা ভেজে তুলুন।ভাজা ছানার বড়াগুলিকে গরম শিরার মধ্যে ছেড়ে দিন।বড়াগুলি শিরা শুষে নরম হয়ে উঠলে পরিবেশন করুন। একসময় এই ছানাবড়া বা চাঁচির মিষ্টি নবান্ন উৎসবে প্রধান মিষ্টান্ন হিসেবে পরিবেশিত হতো।
নবান্ন উৎসব,অনেকেই হয়ত শুনেছেন,আবার অনেকেই হয়ত আজ নতুন শুনলেন।আমাদের বাংলার বুকে এমন অনেক উৎসব,আচার-অনুষ্ঠান আছে,যেগুলো সমন্ধে আজকে সেভাবে কোনো চর্চায় আসে না।








