শুভজিৎ মিত্র, কলকাতাঃ
কার্তিক পুজো।আমরা জানি লক্ষ্মী পুজোর মতো বাংলার অনেকেই ঘরোয়া ভাবে কার্তিক পুজো করে থাকেন।এর সাথে আবার এক মজার রীতিও জড়িয়ে আছে।নবদম্পতিদের যাতে কার্তিকের মতো পুত্রসন্তান লাভ হয়,তার জন্য অনেকসময়,আশপাশের মানুষজন খুনসুটি করে,দম্পতির অগোচরেই,বাড়ির সামনে কার্তিক রেখে আসেন।পরে সেই মূর্তিকে ভক্তি ভরে পুজো করেন,নবদম্পতিরা সন্তান লাভের আশায়।

দেবসেনাপতি কার্তিক (Kartikeya) বা স্কন্দ (Skanda) হিন্দু ধর্মের এক পৌরাণিক দেবতা। বাংলার সংস্কৃতিতে তিনি অন্যতম জনপ্রিয় দেবতা হলেও, তাঁর পুজো মূলত গ্রামবাংলার কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে মহাসমারোহে উৎসবের রূপ নেয়। বাংলায় কার্তিক সংক্রান্তির দিন বা সেই সময়ে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়।আজ,আপনাদের জানাব গ্রামবাংলার কোথায় কোথায় কার্তিক পুজো বিখ্যাত।নীচে রইল সেইসব তথ্য:-
গ্রামবাংলার কিছু বিখ্যাত কার্তিক পুজোর বিশদ বিবরণীর
আরও পড়ুনঃ ভুমিকম্প, তাও আবার চাঁদে! পৃথিবীর বুকে ভূমিকম্পের মতো চাঁদের মাটিতেও কম্পন
১. হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়া ও চুঁচুড়ার কার্তিক পুজো’
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক,খানিকটা দূরে অবস্থিত হুগলি জেলার এই গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে কার্তিক পুজো কার্যত, এক বিরাট সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। এর প্রাচীনত্ব প্রায় ৪০০-৫০০ বছর পুরনো বলে মনে করা হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে চোল রাজবংশীয় রাজা রাজেন্দ্র চোল এই অঞ্চলে এসে ত্রিবেণীতে বসতি স্থাপন করলে বহু তামিল মানুষ এখানে বসবাস শুরু করেন। রাজা শিব-পুত্র স্কন্দ-কার্তিকেয়র ভক্ত ছিলেন। মনে করা হয়, তাঁর অনুচরেরাই সপ্তগ্রাম বন্দর নগরীতে কার্তিক পুজোর সূচনা করেন, যা পরবর্তীকালে চুঁচুড়া-বাঁশবেড়িয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
গঙ্গা তীরবর্তী সপ্তগ্রাম ও পরবর্তীতে হুগলি-চুঁচুড়ার বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির সমৃদ্ধির সঙ্গে কার্তিক পুজোর যোগ রয়েছে। বণিক ও বাবু সমাজের মনোরঞ্জনের জন্য গড়ে ওঠা গণিকা সমাজ প্রথম দিকে এই পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল।
শোনা যায়, বারাঙ্গনা সমাজ সুঠাম গড়নের ‘বাবু’ ধরার জন্য এবং পুত্রসন্তান কামনায় কার্তিক ঠাকুরের আরাধনা করত। বাবুরা এই পুজোয় অর্থানুকূল্য করতেন এবং এটি ছিল তাঁদের খরচের প্রতিযোগিতার একটি মাধ্যম। চুঁচুড়ার যৌনপল্লিতে নকল শস্যক্ষেত্র তৈরি করেও পুজোর অনুরাগী হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
উৎসবের বিশেষত্ব ও রূপ
* মূর্তির বৈচিত্র্য: এই অঞ্চলে কার্তিক মূর্তিতে বিশাল বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন—
* বাবু কার্তিক: রাজকীয় পোশাক পরিহিত, সিংহাসনে বসা, বীর সদৃশ ভঙ্গির কার্তিক।
* জামাই কার্তিক: চুঁচুড়ার ষণ্ডেশ্বরতলায় এই ধরনের কার্তিকের দেখা মেলে।
* রাজা কার্তিক: বাঁশবেড়িয়ার বেলতলায় এই পুজো হয়। মাথায় পাগড়ি থাকে।
* লড়াই কার্তিক: চুঁচুড়া গোলাবাগানে ১৫ ফুট উচ্চতার ‘লড়াই কার্তিক’ পূজিত হন, যা অস্ত্রসজ্জায় ঢাল ও তরবারি বহন করে। বাঁশবেড়িয়ায় কার্তিক পুজো হলেও একে ‘রাস’-এর মতো উৎসব বলা চলে, কারণ এখানে কার্তিকের সঙ্গে মহাদেব, কৃষ্ণ, সন্তোষী মা, গণেশ, ভারতমাতা, নটরাজ সহ ৩৩ কোটি দেবতার পুজো করা হয়।
কার্তিক সংক্রান্তি থেকে প্রায় ৩ দিন ধরে পূজা চলে এবং চতুর্থ দিন হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা (কার্তিক মিছিল)। এই শোভাযাত্রা দেখতে কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় করেন।
আরও পড়ুনঃ লক্ষ্মীলাভে খুশি লক্ষ্মী, রেণুরা! শিলিগুড়ির আশ্রমপাড়ায় শীতের ছোঁয়ায় পথের পিঠে
২. পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার ‘কার্তিক লড়াই’ ও ‘খোকা ‘কার্তিক
এরপরেই আসা যাক,কাটোয়ার কার্তিক পুজোর কথায়। যা স্থানীয়ভাবে ‘কার্তিক লড়াই’ নামে বিখ্যাত।কলকাতার দূর্গাপুজো, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো বা বারাসাতের কালী পুজোর মতোই কাটোয়ার কার্তিক পুজো বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। শোনা যায়,আজ থেকে প্রায় ২৭৫ বছর আগে,সেই নবাব আলীবর্দী খানের শাসনকালে এই পুজোর সূচনা।লোকমুখে কাটোয়ার এই কার্তিক পুজো,”ন্যাংটা ‘কার্তিক” বা “খোকা কার্তিক” নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
ঐতিহাসিক ও লৌকিক মান্যতা অনুযায়ী,এক সময় এই কাটোয়া ছিল ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত এক সমৃদ্ধশালী বাণিজ্যিক কেন্দ্র।দিন দিন যত যেতে থাকে অঞ্চলের বাণিজ্যের সমৃদ্ধি বাড়তে শুরু করলে,সঙ্গে সঙ্গে বাবু সমাজ ও আমোদ-প্রমোদের জন্য নিষিদ্ধপল্লী গড়ে ওঠে।এই গঙ্গাতীরের চুনারি পাড়ায় বর্তমানে যা হরিসভা পাড়া।তৎকালীন সময়ে,অবস্থিত নিষিদ্ধ পল্লীর বারবনিতারা মাতৃত্বের স্বাদ লাভের আশায় এই পুজোর সূচনা করেন।
সেই থেকে কাটোয়ার এই অঞ্চলের কার্তিক পুজো শুরু হয়, “ন্যাংটো কার্তিক বা খোকা কার্তিক”-এর।বারবনিতারা পুত্রসন্তান লাভের জন্য কার্তিককে উলঙ্গ শিশু বা ‘খোকা’ রূপে পূজা করতেন।সন্তান লাভের আশায়,ভক্তরা এখনও শিশু কার্তিককে ভুলিয়ে রাখার জন্য খেলনা, বেলুন, মোয়া, কদমা ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে পুজো করে থাকেন।শোনা যায়,নবাব আলীবর্দী খানের শাসনকালে ১৭৫০ সাল নাগাদ কাটোয়ায় এই পুজোর প্রচলন হয়।

কার্তিক লড়াই’-এর ধারণা
* শোভাযাত্রার প্রতিযোগিতা: প্রাচীনকালে কার্তিকের পুজোকে ঘিরে বাবু-মহাজনদের মধ্যে খরচের প্রতিযোগিতা চলত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিযোগিতা শোভাযাত্রার রূপ নেয়। কাটোয়ায় পুজোর পরের দিন বিভিন্ন পাড়ার কার্তিক ঠাকুরদের নিয়ে এক বিশাল ও জমজমাট শোভাযাত্রার লড়াই হয়।
* থিমের আকর্ষণ: বর্তমানে এই লড়াইয়ে থিম ও আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা চলে। লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় কার্তিক পুজোর মণ্ডপ ও প্রতিমা।
* ‘থাকা’ কার্তিক: কাটোয়ায় একসময় ‘থাকা’ পুজোর প্রচলন ছিল। বাঁশের কাঠামোয় থাক থাক করে বিভিন্ন দেবদেবীর পুতুল সাজানো হতো এবং মধ্যমণি থাকতেন কার্তিক। আজও কিছু জায়গায় এই ‘থাকা’ ঐতিহ্য বজায় রয়েছে।
৩.অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থান
* বর্ধমান (পালদের তিন কার্তিক): পান্ডবেশ্বরের পাল জমিদারদের বংশে বিগত প্রায় ১৭০ বছর ধরে ‘বড় কার্তিক’, ‘মেজো কার্তিক’, ও ‘ছোটো কার্তিক’ এই তিন কার্তিকের পুজো হয়। নিঃসন্তান তিন ভাই স্বপ্নে আদেশ পেয়ে পুজো শুরু করলে তাঁদের বংশে সন্তান লাভ হয় বলে জনশ্রুতি।

* পুরুলিয়া (কাঁচা কার্তিক): পুরুলিয়ার তালবেড়িয়া গ্রামে প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন ‘কাঁচা কার্তিক’ পুজো হয়, যেখানে মূর্তি নির্মাণ শেষে কাঁচা অবস্থাতেই তাঁর পূজা করা হয়।
এই উৎসব প্রমাণ করে যে, পৌরাণিক দেবসেনাপতি কার্তিক কীভাবে বাংলার লোক-সংস্কৃতি, কৃষি সমাজ ও সামাজিক ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক অসাধারণ ঐতিহ্য তৈরি করেছেন।









