চন্দন দাস, কলকাতাঃ
যদি ধৈর্য থাকে তবেই এই লেখাটি পড়ুন, এবং নিজেদের কে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে মুক্ত করুন।
প্রথমেই আপনাদের ধার্মিক হওয়ার ভুল ধারণাটি দূর করে দেই। ধর্ম অর্থাৎ ধারণ। কি ধারণ করবেন? নিজের ধর্মে পাওয়া সংস্কার না মানব সংস্কৃতি। আপনি যখনই নিজেকে সনাতন বা অন্য যে কোনো ধর্মের পরিচয়ে নিয়ে আসছেন, আসলে আপনি নিজেকে আবদ্ধ করে নিচ্ছেন একটি মত বা বিচারর সঙ্গে। বিচারও কিন্তু একটি কর্ম। তাই নিজেকে সেই বিচার থেকেও মুক্ত করা উচিত। ধার্মিক হওয়ার জন্য কোনো ধর্মের খাতায় নাম লেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। এক ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্মেও যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ধর্ম পরিবর্তন মানে, আমি একটি শিকল থেকে মুক্ত হয়ে, অন্য একটি শিকলে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছি।

শ্রীশ্রী ঠাকুর অন্য সময় যতই বামনাপনা দেখান না কেনো, সাধনার সময় নিজের পৈতেটি খুলে গাছে ঝুলিয়ে দিতেন। সেটা শুধু মাত্র বর্ণের অহম ত্যাগ নয়, অপিতু নিজেকে সমস্ত বিচার ও সংস্কার মুক্ত করতে। যারা হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ করে অন্ধের মত দৌড়ায়, তাদের জীবনেও কৃষ্ণ লাভ হয়না। যারা বলে কৃষ্ণই সব, যারা বলে কালীই সব, যারা বলে শিবই সব…তারা ভ্রান্ত ধারণা বা মনকে স্বান্তনা দেওয়ার প্রকৃিয়া অবলম্বন করেছেন মাত্র। তারা নিজেরা কেনো, তাদের চোদ্দ গুষ্ঠীতেও না কেউ কালীকে নিজের চোখে দেখেছে, আর না কৃষ্ণকে। যদি দেখতো, এই রকম পাগলের প্রলাপ বকতো না।

শাস্ত্রবাক্য যা নিজের অভিগ্যতার সাথে মেলে, সেটুকুই গ্রহণীয়। তার বাইরে পুরোটাই দন্ত কথা বলে বিচার করা উচিত। মানুষ মরে স্বর্গে বা নরকে যায়…কাউকে প্রমাণ করতে বলুন, সেই কতগুলো বই খুলে দেখাতে বসবে। আরে বাবা নিজে মরে হাতে নাতে প্রমাণ দে, তো মানি। কালী বড় না কৃষ্ণ…ডাক দুজনকে সামনা সামনি…তারপর নয় বিচার করে দেখা যাবে কে কেমন। এই মেনে মেনেই তো ধর্মের নামে এত হিংসা। এত অন্য ধর্মের মানুষের উপর নির্যাতন…মন্দির ভাঙা, মূর্তি ভাঙা, মসজিদ ভাঙা….বৌদ্ধমঠ নষ্ট করা। ধর্মের নামে কত মানুষের রক্তে এই পৃথিবী স্নান করেছে তার ঠিক নেই। আমি অমুক ধর্মের, আমি তমুক ধর্মের…আমি শাক্ত, আমি বৈষ্ণব….ব্যাস নিজের মত অন্যদের উপরে চাপিয়ে নিজেকে ধর্মের মাতব্বর ভাবা। যুগ যুগ ধরে তো তোমরা খুব ধার্মিক…তাহলে পৃথিবীর এই দশা হলো কি করে?

পরমেশ্বরকে কেবল সনাতনীরাই পায়, কেনো অন্য ধর্মের মানুষরা পায়না? সাকার আর নিরাকারের সাধন এক। সাকার বিগ্রহে নিরাকারকে দর্শন করতে তোমরা অসমর্থ…আর মূর্তি ভাঙো। আমাদের এই মানব শরীরও তো একটি বিগ্রহ। পাহাড়, গাছ-পালা, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ তারা সবই তো বিগ্রহ….তবে তার মধ্যে নিরাকার কে যখন খুঁজে পাও, তাহলে মূর্তিতে কেনো নয়?

কতটুকু বুঝেছো সনাতনী ভাবধারা কে যে তার সমালোচনা করো? সেই ভাবধারার মানুষদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করো? কজনই বা ইসলাম ধর্মকে বুঝেছে? কজন বুঝেছে ইসাই মতকে…বৌদ্ধ বা জৈন ভাবধারা কে? শুধু নিজের মতকে শ্রেষ্ঠ বলে কথার বা গায়ের জোরে তাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলেছে। বৈষ্ণবরা নিজেদের মতকে সঠিক বলে, সত্য বলে। শাক্ত শৈব নিজেদের মতকে….প্রশ্ন হলো….তাহলে বাকিরা কি ভুল? অন্ধবিশ্বাসী ও ভ্রমিত মানুষ বলবে, হ্যাঁ ভুল। আসলে, সত্যিটা কেউই না জানে, না উপলব্ধি করেছে। শুধু ধারণাকে আর কিছু বইকে আশ্রয় করে সমগ্র মানব জাতি চলছে। মানবতার সাথে সাথে পৃথিবীকেও নষ্ট করে দিচ্ছে।
শান্তি স্থাপনের জন্য তলোয়ার অনেকেই উঠিয়েছেন। কিন্তু তারপর তাদের অনুগামীরা অশান্তি ছড়ানোর জন্য তলোয়ার উঠিয়েছেন। যাদবদের কথাই ভেবে দেখুন। পুরো যদুবংশ ধ্বংস হয়ে গেলো। এমনটা পড়েছি। নিজের চোখে যদিও দেখিনি। তাও বললাম, কারণ আপনারা বইয়ের লেখা পড়তে ও শুনতে ভালবাসেন। ভাল করে ভেবে দেখবেন, যারা নিজেদেরকে অতি ধার্মিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে, পৃথিবীর ইতিহাসে তারাই সব থেকে বেশি অধর্ম করছে বা করে গেছে।
শ্রীশ্রী ঠাকুর, শ্রীশ্রী মহাপ্রভু, স্বয়ং বাম মহেশ্বর, ভগবান বুদ্ধ, এমনকি ঈশামসিও নিজেকে ধার্মিক প্রমাণ করার কোনো চেষ্টাই করেননি। তাঁরা কি ধার্মিক ছিলেন না? আপনার আর আমার থেকে অনেক বেশি ধার্মিক ছিলেন। কিন্তু নিজেদেরকে কোনো বিশেষ মতাদর্শনের শিকলে বাঁধেননি। ভগবান বুদ্ধ, মহাপ্রভু, শ্রীশ্রী ঠাকুর ইত্যাদি তো নিজেদের কে না ভগবান বলেছেন, আর না অবতার।

এই নিজেকে ধর্মের গুলামিতে বাঁধেননি বলেই শ্রীশ্রী ঠাকুর বিভিন্ন মতে সাধনা করে সত্যটা উপস্থাপন করে যেতে পেরেছেন। আপনি কালী ভজেন না কৃষ্ণ…না ঈশামসি…কি ফড়ক পড়ে? যাঁর পরিচয় সত্যর সাথে হয়ে গেছে, যিনি সত্যকে জেনে নিয়েছেন, তাঁর কাছে সবই এক।
মহাপ্রভু শুদ্রদের প্রতি বিশেষ প্রীতি রাখতেন। কারণ তিনি জানতেন, শুদ্রজাতিকে গোলামীর মানসিকতার থেকে মুক্ত করা খুব প্রয়োজন। এখানকার আদি ও স্থায়ী বসবাসকারীদের আর্যরা শুদ্র ঘোষণা করে দিল। শুরু হলো ব্রাহ্মণ্যবাদের গোলামী। একটি স্বাধীন জাতি নিজের স্বাধীন মানসিকতা নিয়ে যদি গোলামীর বিরোধে সেই দিন ঘুরে দাঁড়াতো, ভারত না মুসলমান শাসকদের গোলামী করতো, আর না ব্রিটিশ সরকারের। মহাপ্রভুর এই শুদ্রদের গোলামী মুক্ত করার চেষ্টাই… হতে পারে, তাঁর জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ ‘কোল্ডেস্ট ডে’! কোথাও ৯, কোথাও সাড়ে ৪; শীত উপহার দিল সান্টাক্লজ
লজ্জা করা উচিত সেই সব উচ্চ বর্ণের মানুষদের যারা বলে….তুই ব্রাহ্মণের ছেলে না হয়েও পূজা পাঠ করছিস…বাড়িতে ঠাকুর রেখেছিস….
কি ভাবে এই গোলামী মানুষের মাথায় মনে ঢুকে রয়েছে আজও, এটা তারই প্রমাণ। যখন ব্রাহ্মণ্যবাদ ছিলনা….তখন কি তোমরা পূজা-পাঠ করতে না? ব্রত পালন করতে না? টোটেম ছিলনা? তখন কোন ব্রাহ্মণ এসে আপনার বাড়িতে এই সব অনুষ্ঠান করতো বলতে পারেন? গোলামী তো রক্তে ঢুকে গেছে। তাইতো আমরা সব কিছুই মেনে নেই। আজ রাজনৈতিক দল, নেতা, গুন্ডাদের গোলামী করছি। রন্ধ্রে রন্ধ্রে সবকিছুতেই গোলামী করা আমাদের স্বভাব হয়ে গেছে। তারপর তো সব নামযাদা গুরুররা আছেনই বিভিন্ন ধর্মে যারা সারাক্ষণ নিজের উল্লু সোজা করে যাচ্ছেন শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে।
বাদ দেই সেই সব কথা। আচ্ছা প্রশ্ন হলো….রামকৃষ্ণ মিশনের শুধু মন্ত্র বলে যীশু পূজাটাই তোমাদের চোখে পড়ে….তাদের বিভিন্ন সেবা কার্য তোমাদের চোখে পড়েনা? তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংস্কার তোমাদের চোখে পড়েনা? তারা তো সেবা কাজ করার সময় কারুর ধর্ম বিচার করে সেবা করেন না। তারা যা পালন করেন, সেটি হলো, শিবজ্ঞানে জীব সেবা। এরপর তো তোমরাও অন্যদের মত দাবী করবে যে শুধু মাত্র সনাতনীদেরই ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হোক। শ্রীশ্রী ঠাকুর বলেছেন, সব রাস্তা একই ঈশ্বরের কাছে যায়। মিশনতো সেই কথা মেনেই গুরু আজ্ঞা হিসাবে কাজ করছে। মিশনের অনেক ইসাই ভক্তও আছে।
মঠ স্থাপনের জন্য টাকাও আসে বিদেশী ভক্তদের থেকে। কজন সনাতনী সেই সময় এগিয়ে এসে মঠের জমি কেনার বা মঠ বানানোর জন্য আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বলতে পারেন? মঠ তো বিদেশের টাকা দেশে নিয়ে এসে দেশের কাজে লাগায়। আর যে সংস্থা ভগবানের নাম বেচে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে দেয়, তাদের জন্যতো আজকাল আপনাদের আলগা দরদ এক্কবারে উথলে পড়ছে। আগে মঠের মত উদার এবং দানশীল হয়ে দেখান। মঠের মত অনুশীলন আনুন নিজেদের মধ্যে, তারপর মঠের সমালোচনা করবেন।
নাস্তিকরা কোনো দিন কোনো মন্দির মসজিদ ভাঙেনি। কোনো দিন ধর্মের নামে মানুষ খুন করেনি। যত হিংসা, যত উপদ্রব সব ধার্মিকরাই করেছে। তাই, মঠের নিন্দা করে, নিজেদের উপরে অতিরিক্ত ধার্মিক হওয়ার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা বন্ধ করুন।
আমি আবারও বলবো, নিজের অভিগ্যতা ছাড়া, শাস্ত্র পড়া বা বই পড়া জ্ঞানকে আমি আবর্জনাই মনে করি। তার বেশি…আর কিছু না। মিথ্যা গুলোর থেকে নিজেরা বেড়িয়ে আসুন। জগতকেও মিথ্যার থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করুন। সমগ্র মানব জাতি ধর্মীয় হিংসার হাত থেকে তবেই রক্ষা পাবে।









