অজ্ঞানতা জ্ঞানের শত্রু নয়। জ্ঞানের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো জ্ঞানের ভ্রম। সরল ভাষায় ব্যাপারটা এইরকম–
কেউ কিছু না জানলে তাকে শেখানো যায়। কিন্তু না জেনে কেউ যদি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস রাখে “সে জানে” , তাকে শেখানো প্রায় অসম্ভব। এটা এমনই এক সমস্যা যে এটাকে রোগ বলেও আখ্যা দেয়া যায়। আর এই রোগ আমাদের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় আছে।
এই রোগের কারণেই শ্রী চৈতন্য কে আমরা চিনতে পারলাম না শুধু তাই নয়, যেটুকু চিনলাম ভুল চিনলাম। না চেনায় ক্ষতি নেই। কিন্তু ভুল চেনায় ক্ষতি আছে।।
আরও পড়ুনঃ সমস্ত সংগ্রামে জয় আসে মাতৃকার নামে! জয়নগরের অধিশ্বরী মা জয়চণ্ডী
শ্রীচৈতন্য তার রহস্যময় অলৌকিক কর্মময় দিব্য জীবন কাটিয়ে অন্তরালে চলে গেলেন।।
পড়ে রইল একটি ইমেজ। একটি ভ্রান্তি। একজন গেরুয়াধারী সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। মুন্ডিত মস্তক। কৃষ্ণ প্রেম এবং হরিনাম সংকীর্তনের জোয়ারে যিনি নিজে ভাসছেন এবং সমগ্র সমাজকে ভাসিয়ে নিচ্ছেন, এবং একইসঙ্গে তিনি স্বয়ং ঈশ্বর। শ্রীকৃষ্ণের অবতার। ঈশ্বর বা শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে কিছু মাত্র উপলব্ধি না রেখে বা অত্যন্ত ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ ধারণা নিয়ে আমরা তারমধ্যে ঈশ্বরত্ব প্রতিষ্ঠা করে দিলাম।
এই ইমেজটাকেই , বা এই ভ্রান্তিকেই আমরা চরম সত্য মনে করে যত্ন করে কুড়িয়ে নিলাম এবং মন্দিরের ঈশ্বরের বেদীতে স্থাপন করলাম।। এই ইমেজের উপর ভিত্তি করেই আমরা মঠ, মন্দির মিশন প্রতিষ্ঠা করলাম। এই ভ্রান্তির উপর ভিত্তি করেই নিজেরা এক একজন শ্রীচৈতন্য বিশারদ হয়ে উঠলাম। গ্রন্থ রচনা করলাম। তথাকথিত ভক্ত সম্প্রদায় সৃষ্টি করলাম। যুগ যুগ ধরে এই ভ্রান্তি প্রতিষ্ঠা পেয়ে রইল।
আর আসল শ্রী চৈতন্য, সত্যস্বরূপ শ্রী চৈতন্য দূর নক্ষত্রের মতন সুদূরেই রয়ে গেলেন।
শ্রী চৈতন্য কি আদৌ সন্ন্যাসী ছিলেন? কি প্রকৃতির সন্ন্যাসী ছিলেন তিনি? একটু আলোকপাত করা যাক।
চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত এবং চৈতন্য মঙ্গল ( জয়ানন্দ ও লোচন দাস) এই চার আকর গ্রন্থতেই শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস কে প্রথাগত সন্ন্যাস বলে স্বীকার করা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা স্বয়ং শ্রী চৈতন্য নিজেকে সন্ন্যাসী বলে পরিচয় দিতেন না। সার্বভৌমকে বলেছিলেন
“প্রভু বলে শুন সার্বভৌম মহাশয়।
সন্ন্যাসী আমারে নাহি জানিহ নিশ্চয়”।।

“সবজন জানিলো এ কপট সন্ন্যাস” ( চৈতন্য মঙ্গল, লোচন দাস)

“গৌড় নিধি কপট সন্ন্যাসী বেশধারী
অখিল ভুবন অধিকারী” (চৈতন্য ভগবত)

“আচার্য কহেন ছাড়ো আপন চাতুরী।
আমি সব জানি সন্ন্যাসের ভারীভুরি”।।( চৈতন্যচরিতামৃত)
আরও পড়ুনঃ কামারপুকুর-জয়রামবাটি যাওয়ার পথ এবার আরও সহজ! তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্প নিয়ে মিলল বড় সুখবর
শ্রী চৈতন্য কে সন্ন্যাসী হিসেবে স্বীকার না করাটাই স্বাভাবিক। শ্রী চৈতন্যের সাধনার প্রকৃতি এবং রূপকল্প অনুযায়ী তিনি শঙ্করপন্থী নৈর্ব্যক্তিক মার্গের ত্যাগী সন্ন্যাসী হতেই পারেন না। শ্রী চৈতন্য রাধাভাব পরিগ্রহ করে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কেন্দ্রাতিগ আকর্ষণে ছুটে চলেছেন। কায়িক রূপকল্প তাঁর প্রধান আশ্রয়। মহাতান্ত্রিক শ্রী চৈতন্য রাধাকৃষ্ণ রস সাধনার চরম পর্যায়ে পৌঁছে আপন দেহেই বৃন্দাবন খুঁজে নিয়ে মহারাস উপভোগ করছেন। মুহূর্তে মুহূর্তে তার মধ্যে ভাব সমাধি ও অষ্ট-সাত্বিক বিকার দেখা যাচ্ছে।
এ হেন ব্যতিক্রমী মহাসাধক “নৈর্ব্যক্তিক ও নির্বাণ মার্গের প্রতিভু নয়” বিবেচনা করে কেশব ভারতী শ্রী চৈতন্যকে সন্ন্যাস দান করলেন না। দান করলেন ব্রহ্মচর্য। তাই তার নাম হলো শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। শংকরাচার্যের দশনামী সম্প্রদায়ের ব্রহ্মচারীদের “চৈতন্য” উপাধি দান করা হয়, সন্ন্যাসীদের নয়।
আবার দেখুন , লোচন দাস, বৃন্দাবন দাস, মুরারি গুপ্ত এই তিনজন সাধক কবি ও জীবনীকাররা এটাও বলছেন কেশব ভারতী শ্রী চৈতন্যকে, যে মন্ত্র দান করেন সেই মন্ত্র অনেক আগেই শ্রী চৈতন্য অলরেডি কেশব্ ভারতীকে দান করেছিলেন।।
অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটাই যেন একটা drama.। কোন বিশেষ প্রয়োজনে শ্রী চৈতন্য কে সন্ন্যাসের খোলস নিতে হয়েছিল। এবং সেটা প্রচারও করতে হয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
এই প্রসঙ্গ অবতারণা করার একটিই তাৎপর্য —
সেটি হল শ্রী চৈতন্য সম্পর্কে আমরা যে ভ্রান্তি গুলো নিয়ে চলেছি তার থেকে মুক্ত হওয়া। এই ধরনের অজস্র ভ্রান্তির কুয়াশা শ্রীচৈতন্য কে আবছা করে রেখেছে। আমরা সেগুলিকে একটু একটু করে পরিষ্কার করে, শ্রী চৈতন্য জীবনসত্য উদঘাটন করার চেষ্টা করব। শ্রীচৈতন্য মহাতান্ত্রিক। মহাযোগী। মহাশৈব। শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব ও শ্রেষ্ঠ প্রেমিক। শ্রেষ্ঠ সংস্কারমুক্ত সাম্যবাদী মহাসাধক। শ্রীচৈতন্য সত্য স্বরূপ। তিনি “সন্ন্যাসের” অনেক ঊর্ধ্বে।









