Wednesday, 28 October, 2026
28 October
HomeদেশVladimir Lenin: লেনিনের সাথে ভারতের কি সম্পর্ক! ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে লেনিনের অবদান

Vladimir Lenin: লেনিনের সাথে ভারতের কি সম্পর্ক! ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে লেনিনের অবদান

ভারতের মূলধারার জাতীয়তাবাদী নেতারা লেনিন ও সোভিয়েত বিপ্লবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতেন।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ নিবন্ধ ও ঐতিহাসিক সমীক্ষা:

বর্তমান ভারতে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিয়ে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিতর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট চিন্তাধারা এবং ভ্লাদিমির লেনিনের ভূমিকার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ থেকে প্রায়শই মার্ক্সবাদ বা লেনিনের চিন্তাধারাকে ‘বিদেশি’ (Videshi) কিংবা ‘জাতীয়তাবাদ-বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে ঐতিহাসিক তথ্য ও স্বাধীনতা সংগ্রামের দলিল থেকে স্পষ্ট যে, ভারতের স্বরাজ আন্দোলন এবং তৎকালীন প্রথম সারির দূরদর্শী নায়কেরা অক্টোবর বিপ্লব ও লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী দর্শনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।

লন্ডন, মস্কো কিংবা কলকাতার ঐতিহাসিক পাতা উল্টালে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক শোষণমুক্ত ভারতের ভিত তৈরিতে বিশ্বজনীন এই বিপ্লবী দর্শনের প্রভাব কতটা গভীর ছিল।

আরও পড়ুনঃ  নজিরবিহীন নৈরাজ্য এলাহাবাদ হাইকোর্টে! ভাঙচুর চালালেন আইনজীবীরা; তছনছ বিচারপতির এজলাস

১. লেনিন ও ‘নয়া ঔপনিবেশিকতা’র তত্ত্ব: সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার

উনিশ শতকের শেষের দিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্রিটিশ শাসন কেবল সামরিক দখলদারিত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক শোষণের যন্ত্র।

ইতিহাসবিদ বিপুল চন্দ্রের মতে, উনিশ শতকীয় সাম্রাজ্যবাদ ভারতকে ব্রিটিশ শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং তৈরি পণ্যের বাজারে পরিণত করেছিল। তৎকালীন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে লেনিনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Imperialism: The Highest Stage of Capitalism’ (সাম্রাজ্যবাদ: পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়) এক নতুন দিশা দেখায়। লেনিন প্রমাণ করেছিলেন যে, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

২. বাল গঙ্গাধর তিলক থেকে শুরু করে প্রারম্ভিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদ

কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার বহু আগেই ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতারা লেনিনের চিন্তাভাবনার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

  • তিলকের প্রতি লেনিনের সমর্থন (১৯০৮): ১৯০৮ সালে বাল গঙ্গাধর তিলককে কারাদণ্ড দেওয়া হলে লেনিন তার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং ব্রিটিশ শাসকদের ‘হীন শিয়াল’ বলে সমালোচনা করেন।

  • তিলক ও শ্যামজী কৃষ্ণবর্মার সুর: ১৯০৬ সালে নাসিকের এক সভায় তিলক রাশিয়া আন্দোলনের কৌশল শেখার ওপর জোর দেন। ১৯০৭ সালে শ্যামজী কৃষ্ণবর্মা তাঁর ‘ইন্ডিয়ান সোসিওলজিস্ট’ পত্রিকায় লেখেন যে, ইংরেজদের সোজা রাস্তায় আনতে রাশিয়ান আন্দোলনের পথ অবলম্বন করা প্রয়োজন।

১৯২০ সালে সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের (AITUC) প্রতিষ্ঠাতা সম্মেলনে লালা লাজপত রায় স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, “পুঁজিবাদ মানবজাতির রক্ত চুষে নিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ এবং সামরিকবাদ হলো পুঁজিবাদের দুই যমজ সন্তান।” তিনি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের বলশেভিক-বিরোধী প্রচারণাকে ‘মিথ্যা ও ভণ্ডামি’ বলে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন।

৩. মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর দৃষ্টিতে অক্টোবর বিপ্লব

ভারতের মূলধারার জাতীয়তাবাদী নেতারা লেনিন ও সোভিয়েত বিপ্লবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতেন।

  • মহাত্মা গান্ধী: ১৯২৮ সালের ৫ নভেম্বর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ (Young India) পত্রিকায় গান্ধীজি লিখেছিলেন:

    “হিংসার ওপর ভিত্তি করে স্থায়ী কিছু গড়া যায় না, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু এটি অস্বীকার করা যায় না যে, বলশেভিক আদর্শের পেছনে রয়েছে অজস্র নারী-পুরুষের চরম আত্মত্যাগ। লেনিনের মতো পবিত্র আত্মার আত্মত্যাগে উদ্ভাসিত আদর্শ কখনও ব্যর্থ হতে পারে না।”

  • জওহরলাল নেহরু: ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯২৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। ‘The Discovery of India’ গ্রন্থে তিনি লেখেন যে, সোভিয়েত বিপ্লব সমাজকে বহু ধাপ এগিয়ে নিয়েছে এবং একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ নির্ধারণে লেনিনের উদাহরণ তাঁদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

৪. ভগৎ সিং থেকে শুরু করে কাশ্মীরের ‘নয়া কাশ্মীর’ ইস্তেহার

  • ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীরা: বিপ্লবী ভগৎ সিং ফাঁসির আগের মুহূর্তেও লেনিনের জীবনী পড়ছিলেন। কারাগারের ভেতরেই ভগৎ সিং, অজয় ঘোষ ও ধানবন্তরী একত্রে লেনিন স্মৃতি দিবস পালন করেছিলেন।

  • শেখ আবদুল্লাহ ও কাশ্মীর: ‘শের-ই-কাশ্মীর’ শেখ আবদুল্লাহ বলশেভিক বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৪৪ সালে ‘নয়া কাশ্মীর’ কর্মসূচির প্রস্তাব দেন, যা পরে কাশ্মীরের কৃষক, শ্রমিক ও নারী অধিকারের রূপরেখা তৈরি করেছিল।

  • বামপন্থী ছাত্র ও কৃষক সংগঠন: ১৯২৫ সালে কানপুরে ‘কম্যুনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (CPI) গঠিত হওয়ার পর ১৯৩৬ সালে এআইএসএফ (AISF) এবং নিখিল ভারত কিষাণ সভা গঠনেও রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল।

৫. ড. বি. আর. আম্বেদকরের পর্যালোচনা

সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর সংসদীয় গণতন্ত্রের সমর্থক হলেও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। তাঁর ‘State and Minorities’ গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের কথা বলেন। পরবর্তীকালে ‘Buddha and Karl Marx’ গ্রন্থে মার্ক্সবাদের কিছু দিক সমালোচনা করলেও আম্বেদকর স্বীকার করেছিলেন যে, শ্রেণি সংগ্রাম নিরসন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপসাধনে মার্ক্সীয় তত্ত্বের একটি অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  ভগিনী নিবেদিতার জন্মজয়ন্তী; ভারতের মাটি ও মানসে উৎসর্গীকৃত এক মহতী প্রাণের স্মরণ

৬. বিশ্বজুড়ে প্রান্তিক ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মুক্তি সংগ্রামে লেনিন

কেবল ভারতেই নয়, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিক মুক্তি আন্দোলনে লেনিনের প্রভাব ছিল অপরিসীম।

  • আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলন: ডব্লিউ.ই.বি. ডিউ বোয়েস (W.E.B. Du Bois), হিউই নিউটন, অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের মতো আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেতারা লেনিনের লেখাকে নিজেদের মূল পাঠ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কবি ল্যাংস্টন হিউজ লিখেছেন, লেনিন যেন সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে শোষিত মানুষের সঙ্গে হাঁটতেন।

  • আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী নেতা: মার্কাস গার্ভে, নেলসন ম্যান্ডেলা, আমিলকার কাব্রাল, ফ্রাঞ্জ ফ্যানো, কোয়ামে এনক্রুমা এবং কেনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াত্তা—সবাই অক্টোবর বিপ্লব ও কমিন্টার্নের (Comintern) আন্তর্জাতিক নীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

উপসংহার

আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে লেনিন কিংবা মার্ক্সবাদকে কেবল ‘বিদেশি বস্তু’ বলে খারিজ করার প্রচেষ্টা ইতিহাসভিত্তিক সত্যের বিপরীত। ভারতে আধুনিক রাষ্ট্রগঠন, নারী অধিকার, শ্রম আইন এবং কৃষক মুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রে যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা রয়েছে, তার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন ভ্লাদিমির লেনিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলেও, বিশ্বজুড়ে বৈষম্য, পুঁজিবাদী শোষণ এবং নয়া-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লেনিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন