শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
দেখতে দেখতে একটা বছর শেষের পথে,আরো একটা বছর শুরু হবে কিছুদিনের মধ্যে আর শুধু যে,নতুন বছর শুরু হবে তাই নয়,ফেলে আসা সকল উৎসবগুলিও নতুন করে উদযাপিত করার সুযোগ আসছে।আর বছরের শুরুতেই বাঙালীর পৌষ পার্বণের উদযাপনের পর পালা বাগেশ্বরীর।ঠিক বুঝেছেন! আপামর বাঙালীর মা স্বরসতীর পুজোর কথা বলছি।শ্বেত সরস্বতী হলেন,নির্মলতা,সৃষ্টি এবং শুদ্ধ জ্ঞানের প্রতীক।কিন্তু,আজ এই বিশেষ প্রতিবেদনে,বলব! বৌদ্ধধর্মের তান্ত্রিক দেবী নীল সরস্বতী বা নীল তারার কথা।তিনি হলেন,ধ্বংস, প্রজ্ঞা, বাকসিদ্ধি এবং মুক্তিদাত্রী তান্ত্রিক শক্তি।আজকের এই প্রতিবেদনটিতে,দেবী নীল সরস্বতীর ঐতিহাসিক উপাখ্যান এবং বর্তমানে এর তান্ত্রিক চর্চার বাস্তব তথ্য তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুনঃ হাত পা বেঁধে শ্লীলতাহানি! অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করল আরামবাগ মহকুমা আদালত
দশমহাবিদ্যা এবং তারার স্বরূপ:
নীল সরস্বতীর ধারণাটি হিন্দুধর্মের শাক্ত ঐতিহ্যের একটি গভীর অংশ, যা দশটি মহাজাগতিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত দশমহাবিদ্যা ধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।তান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নীল সরস্বতী আর দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় দেবী তারা অভিন্ন। তারা মূলত মুক্তির শক্তি এবং রুদ্র জ্ঞানের দেবী।
তারা মহাবিদ্যা তিনটি রূপে পূজিত হন:
উগ্রতারা,একজটা বা সিদ্ধিদাত্রী রূপ, এবং নীল সরস্বতী বা বাগ্সিদ্ধিদাত্রী রূপ। যখন তারা বা উগ্রতারা বাগ্মীতা বা জ্ঞানের ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন তিনি নীল সরস্বতী নামে পরিচিত হন।
বৈদিক সংযোগ:
তান্ত্রিক গ্রন্থ ছাড়াও কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে যে বৈদিক যুগেও সাধকগণ তন্ত্রসিদ্ধি ও অসীম জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে নীল সরস্বতীর আরাধনা করতেন। এটি প্রমাণ করে যে দেবীর এই রূপের উপাসনা বহু প্রাচীন।
পৌরাণিক উপাখ্যান:
পুরাণ মতে,দেবী নীল সরস্বতীকে নিয়ে বেশকিছু গল্প প্রচলিত আছে।যেমন- হলাহল পান
এক পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, সমুদ্র মন্থনের সময় সৃষ্ট হলাহল বিষ পান করে মহাদেব যখন কাতর হন, তখন দেবী তারা বা নীল সরস্বতী মাতৃরূপে আবির্ভূতা হন। তিনি মহাদেবকে স্তন্যপান করান এবং বিষের জ্বালা উপশম করেন।
রাবণ-কুম্ভকর্ণের উপাখ্যান
রামায়ণের একটি উপাখ্যানেও সরস্বতীর অবদান রয়েছে। রাবণের ভাই কুম্ভকর্ণ যখন ব্রহ্মার কাছে বর চাইছিলেন, তখন বাগদেবী সরস্বতী তার মুখগহ্বরে অবস্থান করে কুম্ভকর্ণের বাক নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে কুম্ভকর্ণ ইন্দ্রাসনের বদলে নিদ্রাসন চেয়ে বসেন। এটি ভবিষ্যতে রামের হাতে রাবণ বধ নিশ্চিত করে সত্যের জয়কে ত্বরান্বিত করার জন্য দেবীর প্রজ্ঞাময় পদক্ষেপ ছিল। যদিও এটি সরাসরি নীল সরস্বতী নয়, কিন্তু দেবীর জ্ঞানের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে তা দেখায়।
দেবীর মূর্তিতত্ত্ব
নীল সরস্বতী তার ভয়ঙ্কর মূর্তি ও প্রতীকীর মাধ্যমে গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা প্রদান করেন।তাঁর গাত্রবর্ণ গভীর নীল। তিনি নরমুণ্ডের মালা, নরকরোটির মুকুট এবং বাঘছাল পরিধান করেন। তাঁর চার হাত খড়্গ, নরমুণ্ড, পদ্ম এবং কাঁচি ধারণ করে। এই রূপ অজ্ঞানতার বিনাশ এবং জীবনের জাগতিক বন্ধন ছিন্ন করার প্রতীক।দেবীর পায়ের নিচে শবরূপে শায়িত মহাদেব থাকেন। এটি এই তত্ত্বকে বোঝায় যে দেবী হলেন সর্বোচ্চ শক্তি।যা শিবের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
আরাধনার ফল:
নীল সরস্বতীর সাধনার প্রধান লক্ষ্য জ্ঞান লাভ। সাধকগণ বিশ্বাস করেন, এই আরাধনায়:
বাগসিদ্ধি: অসাধারণ বাকপটুতা, বাণীতে দক্ষতা এবং মানুষের ওপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আসে।
অকাল্ট জ্ঞান: গূঢ় ও তান্ত্রিক জ্ঞান লাভ হয়।
স্মৃতিশক্তির বৃদ্ধি: স্মরণশক্তি অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুনঃ আজ বেগুনি রঙে উত্তাল শহর তিলোত্তমা, অবরুদ্ধ সিটি অফ জয়ের রাস্তাঘাট
তান্ত্রিক চর্চা:
সাধারণ সরস্বতী পূজার মতো নীল সরস্বতীর আরাধনা সর্বজনীন নয়। এটি একটি গুরুমুখী এবং বিশেষায়িত প্রক্রিয়া।এই সাধনা মূলত তন্ত্রশাস্ত্রের বিধি মেনে হয়:
গুরু পরম্পরা: এটি অভিজ্ঞ তান্ত্রিক গুরুর তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে পরিচালিত হয়।
যন্ত্র ও মন্ত্র: বিশেষ নীল সরস্বতী যন্ত্রম্ এবং তাঁর বীজমন্ত্র “ঔঁ হ্রীং ঐং হ্রীং সরস্বতৈ নমঃ” জপের মাধ্যমে আরাধনা করা হয়।
প্রধান তান্ত্রিক পীঠস্থান ও মন্দিরসমূহ
দেবী নীল সরস্বতীর বা দেবী তারা-র তান্ত্রিক রূপের আরাধনা মূলত তান্ত্রিক এবং শাক্ত পীঠস্থানগুলিতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে প্রচলিত।তাঁর আরাধনার প্রধান কেন্দ্রগুলি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
তারাপীঠ,বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ
এটি দশমহাবিদ্যাদের মধ্যে দেবী তারা-র অন্যতম প্রধান শক্তিপীঠ এবং মহাতীর্থ।তারাপীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী তারা এবং নীল সরস্বতী মূলত অভিন্ন।তাই,দেবী তারাকেই তান্ত্রিকগণ নীল সরস্বতী বা উগ্র-তারা নামে আরাধনা করেন।এই আরাধনা এখানে অত্যন্ত প্রাচীন এবং শক্তি উপাসনার মূল কেন্দ্র।
কামাখ্যা মন্দির,আসাম
দশমহাবিদ্যাদের আরাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।কামাখ্যা মন্দিরের আশেপাশে,বিশেষত তারা মন্দিরে দেবী উগ্র-তারা বা নীল সরস্বতী রূপে পূজিতা হন।এখানকার উপাসনা পদ্ধতিও তান্ত্রিক প্রথা মেনে চলে।
শারদা পীঠ,পাক-অধিকৃত কাশ্মীর
নীলম উপত্যকা হল,অস্থিপুরাণে উল্লিখিত ১৮টি মহাশক্তিপীঠের অন্যতম।কথিত আছে,এই স্থানেই ঋষি শাণ্ডিল্য দেবী নীল সরস্বতী-র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।ফলস্বরূপ,পুরো উপত্যকা, নদী এবং জেলার নাম দেবীর নাম অনুসারে ‘নীলম’ হয়েছে।যদিও মন্দিরটি বর্তমানে, পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত এবং ভগ্নপ্রায়।তবুও তীর্থযাত্রীদের কাছে এর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
আঞ্চলিক কিছু মন্দির এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবারেও তাঁর পূজা হয়। যেমন-
লাভপুর,বীরভূম,পশ্চিমবঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গের লাভপুরের কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটেতে এই দেবীর বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।এই পুজো আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজার পরের শুক্লা চতুর্দশীর রাতে, যা দেবী তারার আবির্ভাব তিথি হিসেবেও পরিচিত।এই বিশেষ পারিবারিক পূজাটির মাধ্যমে দেবীর এই রূপের আরাধনার একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায়।
দুর্গাপুর,পূর্ব বর্ধমান,পশ্চিমবঙ্গ
পূর্ব বর্ধমানের দূর্গাপুরে,বিভিন্ন ক্লাব ও মিলন সংঘ দ্বারা বসন্ত পঞ্চমী বা সরস্বতী পূজার সময় নীল সরস্বতীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার প্রচলন দেখা যায়।এই পূজাগুলি মূলত লোকায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ভাবনার সংমিশ্রণ মাত্র।
বেলওয়া,কাটিহার,বিহার
এখানে ,’নীল সরস্বতী মন্দির’ নামে একটি নির্দিষ্ট মন্দির রয়েছে।যা প্রমাণ করে যে,বিহারের কিছু অঞ্চলেও এই দেবীর স্বতন্ত্র আরাধনা প্রচলিত আছে।
এই সাধনার জন্য সরস্বতী পূজার দিন বা শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিকে শুভ মনে করা হয়।নীল সরস্বতী এভাবে জ্ঞানের এক রুদ্র ও চূড়ান্ত রূপকে প্রতিনিধিত্ব করেন, যা জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে চরম সত্যের দিকে চালিত করে।





