আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কার হাত ধরে ঢুকেছিল? আপনি চোখ, কান বুঝে ধপাস করে বলে দেবেন মমতা ব্যানার্জী। অটল-মমতা জোট, মমতা মন্ত্রী ইত্যাদি প্রভৃতি। সিপিএম রাও তাই বলে। কিন্তু আসলে কি তাই ?
আরও পড়ুনঃ ‘ভবানীপুরে এবার পাঁঠাবলি হবে’! হাঁড়িকাঠে কার মুখ?
১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধী হারলেন। সিপিএম এবং বিজেপি মিলে ভিপি সিংয়ের সরকারকে সমর্থন দিল। বিজেপি দিল্লিতে মণ্ডল কমিশনের বিরুদ্ধে হিন্দু স্ববর্ণদের প্রতিবাদে চুপ থাকা আর কাশ্মীরের গণহত্যার সময় চুপ থাকার জন্যে একটা শর্ত দিল, লালকৃষ্ণ আডবাণীর রামরথ বের করতে দিতে হবে। ভিপি সিং ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ, তিনি রাজি ছিলেন না। কিন্তু ততক্ষণে রামরথ বেরিয়ে পড়েছে, উত্তরপ্রদেশ ঘুরে পশ্চিমবঙ্গের দিকে আসছে।
এখানেই একটা বড় ঘটনা ঘটল। আইবি অর্থাৎ ইন্টেলিজেন্স বিভাগ জ্যোতি বসুকে বলেছিল, ১৯৭২-এর মতো পরিস্থিতিতে এলে আপনারা বিপদে পড়বেন, কংগ্রেস সরকার করে নেবে। সেটা শুনে জ্যোতি বসু, হরকিষেণ সুরজিতরা দিল্লির সাথে আলোচনা করে ঠিক করলেন, রামরথকে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে ঢুকতে দেওয়া হবে, বাধা দেওয়া হবে না। এতে হিন্দুত্বের হাওয়া রাজ্যে ঢুকবে, কংগ্রেসের ভোট কমবে। একটু ধর্মীয় জিগির তুলে কংগ্রেসের বিরোধিতা করার ফায়দা নেওয়া হবে।
কলকাতা পুরসভার ১৯৯১ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস প্রায় জিতে যাচ্ছিল, মাত্র এক-দুটো সিটের ফারাকে হেরেছিল। এই বিপদ বুঝেই সিপিএম রাম রথকে ঢুকতে দিয়েছিল। হাওড়ার গোলাবাড়িতে তখন প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলো।
১৯৯১ সালে একসাথে লোকসভা এবং বিধানসভা ভোট হলো। জ্যোতি বসু এক বছর আগেই ভোট ডেকে দিলেন। ফলে বিজেপির ভোট হাফ পার্সেন্ট থেকে লাফ মেরে ১১ শতাংশ হয়ে গেল। সেই ভোট কাটল কংগ্রেসের ভোট থেকে। কংগ্রেস মাত্র ৪২-৪৩টা সিট পেল, আর সিপিএম ফের সরকারে ফিরল। অন্তত ৫০ থেকে ৬০টা আসনে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ ভোটের ফারাকে কংগ্রেস হেরেছিল।
২০০৮ সালে আমেরিকার সাথে পরমাণু চুক্তির বিরোধিতায় সিপিএম বিজেপির সাথে আবার হাত মেলাল। সমর্থন তুলে নিল। এরপর ২০০৯ সালের লোকসভায় সিপিএম মাত্র ১৫টা সিটে নেমে গেল। তারপর থেকে পড়তে পড়তে এমন এক জায়গায় গেল যে আর ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় রইল না। ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের ২২ থেকে ২৪ শতাংশ ভোট একেবারে বিজেপিতে চলে গেল। বিক্ষিপ্ত কিছু সিটে নয়, আলিপুরদুয়ার থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত একই ঘটনা। এটা কি কোনো নেতার ইন্ধন ছাড়া হতে পারে? এলাকায় এলাকায় স্থানীয় সিপিএম নেতারা ভোট বিজেপিতে ঢেলে দেওয়ার নির্দেশ পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। ফলে সিপিএম শূন্যে নেমে গেল। ২০২১ সালেও তাই হলো, আবার শূন্য। আর বিজেপি ১২ থেকে এক লাফে ৪০ এর ঘরে।
এখন শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা আর অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গঠনের স্বপ্নটাও আছে। অস্তিত্বের সংকট মেটাতে আর পার্টির নেতাদের এখন একটা নতুন বোঝাপড়া হয়েছে। খবর মতে, দিল্লিতে সিপিএম এবং আরএসএসের মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছে বলে সুত্র মারফৎ জানা যাচ্ছে। সেটা হলো, বিজেপি ৩০ থেকে ৩৫টা আসনে খুব দুর্বল প্রার্থী দেবে, সিপিএম সেখানে লড়বে। বাকি আসনগুলোতে সিপিএম ভোট কাটাকাটি করবে না আর mostly মুসলমান প্রার্থী দেবে। হয়েছেও তাই। বদলে কেরালাতে বিজেপি LDF কে আরও একবার চান্স করে দেবে UDF এর ভোট কেটে।
আরও পড়ুনঃ বাংলার ক্ষমতা পেতে ইস্তেহারে ভাতাতেই ভরসা শাহের
এভাবে বামেদের থেকে আর কিছু ভোট সরিয়ে নিজেদের কাছে নিয়ে এসে ক্ষমতায় আসার আশা আছে বিজেপির। কিন্তু বাধ সাধছে SIR। ভোটার তালিকা থেকে যে নাম বাদ গেছে তাতে মুসলিম ভোটারদের বাদ পড়েছে মাত্র ২.৩ শতাংশ। কিন্তু মতুয়া, রাজবংশী ভোটারদের বাদ পড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ, যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।
আর রাজ্য সরকার বদলে যাওয়ার আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার সহজ উপায় হলো পুলিশ আর তাদের ব্যবহারের পরিবর্তন। সেটাও অন্য কথাই বলছে। তাই ভবিষ্যত খুব একটা ভালো নয় বিজেপির জন্যে আর বিশেষ করে সেই অতিরিক্ত লম্ফঝম্প দেওয়া সমর্থক দের জন্যে। এবার শুধু ECI- ই কিছু করে দেখতে পারে।



