মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলা থেকে যে নারকীয় ঘটনার খবর সামনে এসেছে, তা শুনে শিউরে উঠছে গোটা দেশ। সমাজের নৈতিকতা আর মূল্যবোধ ঠিক কতটা নিচে নামলে একজন মানুষ ১৮০ জন নাবালিকাকে নিজের যৌন লালসার শিকার বানাতে পারে, তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে।
মহম্মদ আয়াজ ওরফে তনভীর নামের এক অমানুষের হাতে যেভাবে শৈশব লাঞ্ছিত হয়েছে, তা আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার এক মারাত্মক রূপকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তি আর সোশ্যাল মিডিয়াকে ঢাল বানিয়ে যেভাবে এই অপরাধের জাল বোনা হয়েছিল, তা যেমন ভয়ানক তেমনই গভীর উদ্বেগের।
আরও পড়ুনঃ ডিকাপারায় ২৩ বছরের যুবককে পিটিয়ে খুন, গ্রেফতার ২
অপরাধী মহম্মদ আয়াজ ছিল অত্যন্ত ধূর্ত। সে মূলত স্ন্যাপচ্যাট এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করত তার শিকার ধরার জন্য। নাবালিকা মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের বিশ্বাস অর্জন করাই ছিল তার প্রথম ধাপ।
এরপর সুযোগ বুঝে সে তাদের মুম্বই বা পুণের মতো বড় শহরগুলোতে নিয়ে যেত। সেখানে তাদের ওপর চলত অকথ্য যৌন নির্যাতন। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের সেই মুহূর্তগুলো সে ক্যামেরাবন্দি করে রাখত। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, তার মোবাইল থেকে অন্তত ৩৫০টি অশ্লীল ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে। এই ভিডিওগুলোই ছিল তার ব্ল্যাকমেল করার অস্ত্র। ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মেয়েদের দিনের পর দিন ধ*র্ষণ করা হত এবং অনেককে জোর করে দেহব্যবসায় নামাতেও বাধ্য করা হত।
তদন্তকারীদের মতে, এই গোটা প্রক্রিয়াটি চলত অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করে নাবালিকাদের টার্গেট করত। যারা আর্থিক দিক থেকে দুর্বল বা পারিবারিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তাদেরই সে সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিত।
শুনলে অবাক হবেন যে, এই ভিডিওগুলো সে শুধু ব্ল্যাকমেল করার জন্যই ব্যবহার করত না, বরং একটি বৃহত্তর অপরাধচক্রের মাধ্যমে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও চালাচ্ছিল। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে যে এর পেছনে কোনও বড় মাপের সিন্ডিকেট বা আন্তর্জাতিক পর্নোগ্রাফি চক্রের হাত আছে কি না। একজনের পক্ষে এত বড় মাপের অপরাধ দীর্ঘদিন ধরে একা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুনঃ কালিয়াচকে চাঞ্চল্য! জামিন মোফাক্করুল ইসলামের; উঠছে বড় প্রশ্ন
অভিযুক্ত মহম্মদ আয়াজ আগে একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিল বলেও তথ্য উঠে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এবং এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও থানায় গিয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং অভিযুক্তের কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই ধরণের নরপিশাচদের কোনও ধর্ম বা জাত হয় না, এরা সমাজের কলঙ্ক।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এই ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। অমরাবতীর গ্রামীণ পুলিশ ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তদন্তে একটি শক্তিশালী এসআইটি গঠন করেছে। এছাড়া, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র যৌন হেনস্থা বা ধর্ষণের মামলা নয়, পকসো (POCSO) আইন এবং আইটি আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
পুলিশি তৎপরতার মধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন অভিযুক্তের অবৈধ নির্মাণের ওপর বুলডোজার চালিয়েছে। যদিও অপরাধের তুলনায় এই শাস্তি কিছুই নয়, তবুও সাধারণ মানুষের মনে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, আইন ভাঙলে এবং এই ধরণের জঘন্য অপরাধ করলে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়।
কখনো ভেবে দেখেছেন, আমাদের চারপাশের শিশুরা কতটা নিরাপদ? এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আমাদের সন্তানদের ওপর নজরদারি কতটা জরুরি।
প্রেমের নাম করে বা মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে যেভাবে ছোট ছোট মেয়েদের জীবন নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, তা রুখতে শুধু পুলিশ বা প্রশাসন যথেষ্ট নয়। অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। স্মার্টফোনের যুগে কিশোর-কিশোরীরা কার সাথে কথা বলছে, কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে, সেই বিষয়ে নজর রাখা এবং তাদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা আজ সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ডিকাপারায় ২৩ বছরের যুবককে পিটিয়ে খুন, গ্রেফতার ২
১৮০ জন নাবালিকার জীবন যারা অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে, তাদের বিচার যাতে দ্রুত হয় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা। বিচারপ্রক্রিয়ায় যাতে কোনও ফাঁক না থাকে এবং নির্যাতিতা মেয়েদের পরিচয় গোপন রেখে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়, সেদিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে।
শৈশব যাতে নিরাপদ থাকে এবং কোনও মেয়ের চোখে যেন এই ধরণের আতঙ্কের জল না আসে, সেই প্রতিজ্ঞা আমাদের আজ নিতেই হবে। সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো এই ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা এবং নিজেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সতর্ক করা। নতুবা কাল হয়তো অন্য কোনও নাম, অন্য কোনও শহরে এমন আরও এক বিভীষিকার জন্ম হবে।



