মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার ধর্নায় বসেছেন। কখনও বিরোধী নেত্রী হিসেবে, কখনও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেন্দ্রের বিরোধিতায় পথে নেমেছেন। কখনও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতায়, কখনও ‘বাঙালি অস্মিতা’ বাঁচাতে মঞ্চ বেঁধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এবার রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যে ফের তাঁকে দেখা গেল ধর্নায়। তবে ছবিটা এবার একেবারেই অন্যরকম।
এর আগে যখনই দলনেত্রী ধর্নায় বসেছেন, তখনই ছুটে এসেছেন দলের বিধায়ক-সাংসদরা। ভোটের মাস কয়েক আগেই এসআইআর-এর বিরোধিতায় যখন প্রতিবাদ মঞ্চ তৈরি করেছিল তৃণমূল, তখনও সব নেতা-নেত্রীদের দেখা যায় সেখানে। ক্ষমতা চলে গিয়েছে ঠিকই। তবে এখনও তৃণমূলের হাতে ৭৮ জন (দুজনকে সদ্য বহিষ্কার কর হয়েছে) বিধায়ক রয়েছেন। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে রয়েছেন ৪১ জন সাংসদ। অথচ ধর্না মঞ্চে, মমতার পাশে দেখা যাচ্ছে মাত্র ৫ সাংসদ আর গুটিকয়েক বিধায়ককে।
মঙ্গলবার দুপুর ২টোয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওয়াই চ্যানেলের ধর্নামঞ্চে পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাংসদ দোলা সেন ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা মঞ্চে পৌঁছনোর পর ভিড় দেখা গেল ঠিকই, তবে আগের ভিড়ের ছবির সঙ্গে কোনও মিলই নেই। ভিড়ের মাঝে মাথা উঁচু করে সবাইকে শান্ত করলেন মমতা।
আরও পড়ুনঃ উত্তর ২৪ পরগনায় উদ্ধার তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধানের ঝুলন্ত দেহএলাকায় চাঞ্চল্য!
মমতার ধর্নামঞ্চে উপস্থিত রয়েছেন বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, ববি হাকিম, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোক দেব, শোভনদেব চট্টোপাধ্য়ায়। রয়েছেন সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন, সামিরুল ইসলাম, দোলা সেন, মালা রায় ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংসদ ও বিধায়ক মিলিয়ে এই চিত্রই দেখা গেল এদিন।
পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে মমতার পাশে বসে থাকতে গেল চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও তন্ময় ঘোষকে। এছাড়া পুরসভার প্রতিনিধিদের মধ্য়ে হাজির ছিলেন বৈশ্বনর চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণা চক্রবর্তী, স্বপন সমাদ্দার সহ অন্যান্য মুখকে।
বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর রাজ্যে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন রাজনৈতিক ডামাডোলের আবহে প্রথমবার রাজপথে নামলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ের অনুমতি বাতিল হওয়ার পর, মঙ্গলবার পুলিশের কড়া শর্তে ধর্মতলার ওয়াই (Y) চ্যানেলে মাত্র ২ ঘণ্টার জন্য ধর্নায় বসে জোড়াফুল শিবির। সেখানে দাঁড়িয়ে একদিকে যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র হুঙ্কার দিলেন মমতা, তেমনই দলের অন্দরের নজিরবিহীন ফাটল ঢাকার মরিয়া চেষ্টাও দেখা গেল।
দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মাঝেই চেনা আগ্রাসী মেজাজে বক্তব্য রাখেন মমতা। বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “আমাকে আটকাতে পারবেন না। বাংলায় ১৭৭টি আসনে ভোটলুট হয়েছে। আমি সংবিধান রক্ষা করব এবং বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।” দিল্লি থেকে কলকাঠি নেড়ে তৃণমূলকে ভেঙে দেওয়ার ‘চক্রান্ত’ হচ্ছে দাবি করে তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, “জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হাটাকে যায়েঙ্গে।” এদিন মঞ্চে তাঁর পাশে মদন মিত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ডেরেক ও’ব্রায়েনদের দেখা যায়।
আরও পড়ুনঃ ফুটপাথ মানুষের জন্য, উদ্বেগের মধ্যে বার্তা পুরসভার; কলেজ স্ট্রিটেও বুলডোজার চলবে নাকি?
তবে ধর্মতলার মঞ্চে যতই আত্মবিশ্বাসের সুর থাকুক না কেন, তৃণমূলের ঘরের ছবিটা বেশ উদ্বেগজনক। ধর্নায় যোগ দেওয়ার আগে ভাঙন রুখতে কালীঘাটে জরুরি বৈঠক করেন মমতা। পরিসংখ্যান বলছে, ফল প্রকাশের পর ৬ মে নেত্রীর বৈঠকে ৭১ জন বিধায়ক এলেও, ৩১ মে-র বৈঠকে হাজিরা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২০-তে! সূত্রের খবর, দলের অন্তত ৫০ জন বিধায়ক বর্তমানে বিক্ষুব্ধ।
তৃণমূলের এই অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সদ্য বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দল থেকে বের হতেই নাম না করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে তাঁর বিস্ফোরক দাবি, “তৃণমূল পুরোপুরি হাইজ্যাক করে নিয়েছে একটা কর্পোরেট সংস্থা। এখানে পার্টি মানেই তো আইপ্যাক।” সব মিলিয়ে, ঘরের ভেতরের এই তীব্র কোন্দল ও বিদ্রোহ সামলে মমতা দলের রাশ নিজের হাতে রাখতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার।



