বিশ্বকর্মা পুজো। বৈদিক এবং পৌরাণিক এই দেবতা কে নিয়ে রয়েছে চমকপ্রদ না না কাহিনী। আসুন আজকের বিশেষ দিনে জেনে নেওয়া যাক দেবশিল্পীর আখ্যান :-
প্রথমেই উল্লেখ্য যে, রাঢ়বঙ্গে ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মাপূজা এখন একটা বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। আজ থেকে পঁচিশ ত্রিশ বৎসর পূর্বেও কলকারখানায় আর ছুতোর-কোমরদের ঘরেই এই পূজানুষ্ঠানে হতো, কিন্তু বর্তমানে প্রায় প্রতিঘরেই কোনও গাড়ী বা যন্ত্রপাতিকে কেন্দ্র করে বিশ্বকর্মা পূজা হয়ে থাকে।
বিশ্বকর্মার মাহাত্ম্য আমাদের মধ্যে প্রায় অনেকেরই অজানা। তিনি বৈদিক তথা পৌরাণিক দেবতা। যে ত্বষ্টাকে বেদে সূর্য ও প্রজাপতি বলে চিহ্নিত করেছেন, তাঁকেই আবার বিশ্বকর্মার সঙ্গে অভিন্ন বলে নির্ধারণ করেছেন। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় লিখেছেন, “দক্ষিণায়ন আরম্ভ দিনে দিবা ১৪ ঘণ্টা রাত্রি ১০ ঘণ্টা। মধ্যাহ্নকালে রবি খ-মধ্য হইতে মাত্র ৮ অংশ দক্ষিণে থাকেন। তখনও প্রাণী ও উদ্ভিদকুল গ্রীষ্মতাপে অবসন্ন হইয়া পড়ে। বৃষ্টি হইলে তাহারা আবার জাগিয়া ওঠে। বৃক্ষলতাদিতে নূতন পল্লব উদ্দ্গত হয়। তৃণশূন্য ভূমি তৃণাচ্ছাদিত হয়। অশ্ব, গবাদি পশু তৃণ খাইয়া পুষ্ট হয়। কৃষিক্ষেত্রে শস্য জন্মিতে থাকে। ত্বষ্টা এই সকল লক্ষণের কর্তা বলে বিবেচিত হইয়াছেন। এই হেতু তিনি বিশ্বকর্মা।”
ঋগ্ মন্ত্রে বলা হয়েছে বিশ্বকর্মা বিশ্বভুবনে যজ্ঞ করেন। তিনি হোতা তিনি ঋষি তিনি আমাদের পিতা। আরও বলা হয়েছে যে তিনি বাচস্পতি, তিনি নিজে বৃহৎ তাঁর মন বৃহৎ তিনি সবকিছু নির্মাণ করেন, ধারণ করেন এবং সবকিছু অবলোকন করেন। বিশ্বকর্মা সর্বস্রষ্টা এবং সর্ব নিয়ন্তা। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে সূর্যের যেমন সপ্তরশ্মি, বিশ্বকর্মারও সপ্তরশ্মি।
বৃহদ্দেবতার মতে বিশ্বকর্মা বর্ষাকালীন সূর্য। গ্রীষ্মকাল শেষ হলে যিনি ছাড়া পৃথিবী রক্ষিত হয় না যিনি বিশ্বের কর্ম (কৃষি কর্ম) সৃষ্টি করেন, তিনিই বিশ্বকর্মা। এইজন্যই সম্ভবতঃ বর্ষার শেষ মুহূর্তে ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পূজা প্রবর্তিত হয়েছে। লক্ষণীয়, ইন্দ্রপূজা বা ইন্দ্রধ্বজপূজাও ভাদ্র মাসেই বিহিত। বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্র। বিশ্বকর্মাও বর্ষার দেবতা। সেকারণেই সম্ভবতঃ ইন্দ্রের বাহন হস্তী ঐরাবত, বিশ্বকর্মারও বহনরূপে হস্তীই কল্পিত হয়েছে।
মৎস্য পুরাণের মতে বিশ্বকর্মা অষ্টবসুর অন্যতম প্রভাসের পুত্র।
বিষ্ণুপুরাণের মতে তিনি বৃহস্পতি ভগিনীরগর্ভে প্রভাসের ঔরসে জাত। বিশ্বকর্মার পাঁচটি পুত্র-(১) নল (বানর), (২) অজৈকপাদ, (৩) অহিবুল্ল্য, (৪) ত্বষ্টা ও (৫) রুদ্র। এবং চারকন্যা-(১) সংজ্ঞা, (২) চিত্রঙ্গদা, (৩) সুরূপা ও (৪) বর্হিম্মতী।
বিশ্বকর্মাকে মুখ্যতঃ ভাস্কর ও যন্ত্রের দেবতা বলে চিহ্নিত করা হয়। তিনি লঙ্কানগরী, দ্বারকা নগরী, ইন্দ্রপ্রস্থ প্রভৃতির নির্মাতা, আবার সমস্ত ভূষণ এবং দিব্য বিমানেরও নির্মাতা।
স্বর্গ, যমের ও বরুণের প্রাসাদ, পুষ্পকরথ, ইন্দ্রের বজ্র ও বহুবিধ অস্ত্র নির্মাণ করে তিলোত্তমাকে সৃষ্টি করেন। সূর্যের তেজ কমিয়ে দিয়েছিলেন।
অন্য এক মতে ময় বিশ্বকর্মার ছেলে। পুরাণে বলা হয়েছে বিশ্বকর্মার কৃপায় মানুষ শিল্পকলায় ও যন্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়।
পুরাণমতেই বিশ্বকর্মা ত্বষ্টার কর্মশক্তি আত্মসাৎ করেছিলেন বলেই তাঁর অপর নাম ত্বষ্টা। তারও আরও অনেক নাম আছে। যেমন-১) ধাতা, ২) বিশ্বস্রষ্টা, ৩) প্রজাপতি, ৪) পিতা, ৫) সর্বজ্ঞ, ৬) বাচস্পতি, ৭) মনোজব, ৮) বদান্য, ৯) কল্যাণকর্মা, ১০) অর্ক ও ১১) সুরশিল্পী।
বিশ্বকর্মা ‘স্থাপত্যবেদ’ নামে একটি উপবেদেরও রচয়িতা।
বিশ্ব শব্দের অর্থই সমগ্র। তাই এই ভগবান সবকিছুরই কর্তা, ধর্তা। তাই প্রতিটি মানুষেরই তিনি পূজ্য, আরাধ্য তথা সেব্য।
বিশ্বকর্মার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র :
দেবশিল্পীন্ মহাভাগ দেবানাং কার্য্যসাধকঃ।
পূজাং গৃহাণ বিধিবৎ কল্যাণং কুরু মে সদা ৷৷ ১
শিল্পচার্য্যং নমস্তুভ্যং নানালঙ্কার ভূষিতম্।
আয়ুর্যশঃ বলং দেহি শিল্পে দেহি শুভাং মতি।। ২
ধনং দেহি, যশো দেহি, বিশ্বকর্মণ প্রসীদ মে৷৷
মম বিঘ্নবিনাশায় কল্যাণং কুরু মে সদা ।। ৩
বিশ্বকর্মার প্রণাম মন্ত্র :
দেবশিল্পিন্ মহাভাগ দেবানাং কার্য্যসধকঃ।
বিশ্বকর্মণ নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্ট প্রদায়ক।।
[ পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণাম মন্ত্র প্রদানে সহায়তাকারী পুস্তক শ্যামাচরণ ভট্টাচার্য ও শক্তিপদ চক্রবর্তী কর্তৃক লিখিত]







