রাত বাড়লেই যে রিসর্ট হয়ে উঠত আরও জাঁকজমকপূর্ণ, যেখানে গাড়ির লাইন পড়ে যেত, সোমবার পুণ্ডিবাড়ির সেই রিসর্টে আলোই জ্বলল না। কালো কারবারের কমান্ড সেন্টারে তালা লাগিয়ে কোথায় গেল কুশীলবরা? একের পর এক ফোন করলেও সেন্টারের অন্যতম কমান্ডার তৃণমূল নেতা বা তাদের ভাইদের মোবাইল বন্ধই পাওয়া গেল। আর বন্ধ হবে নাই বা কেন, তাদের গডফাদার প্রভাবশালী আমলা যে পড়েছে মহাবিপাকে। পাছে তদন্তকারীদের জেরার মুখে পড়তে হয়, তাই আপাতত আড়ালে যাওয়া ছাড়া হয়তো রাস্তা খোলা নেই শাসক নেতার কাছেও। এবার কি ধরা পড়বে চোরাকারবারিদের হাতসাফাই; নাকি শাসকের ম্যাজিকে সবকিছুই ভ্যানিশ হয়ে যাবে? সেই প্রশ্ন এখন ঘুরছে কোচবিহার থেকে কলকাতা সর্বত্রই।
আরও পড়ুনঃ ‘হাম দিল দে চুকে সনম’; বন্ধুর সঙ্গে স্ত্রীর বিয়ে দিলেন সাঁইথিয়ার বাপি
চওড়া টাক, উসকোখুসকো চুল, উদ্ধত চালচলন- শেষ কয়েক বছর ধরে মাঝারি গড়নের ব্যক্তিটির ক্ষমতার বিষদাঁত দেখছে রাজ্যবাসী। ব্লক স্তরের আমলা হয়েও রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ মহলে তার অবাধ যাতায়াত। রাজ্যের শাসকদলের শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যখন-তখন ফোন করার ছাড়পত্রও পেয়েছে সে। কতটা ক্ষমতাবান তার প্রমাণ দিতে মাঝেমধ্যেই লাউডস্পিকারে সহকর্মীদের শোনায় শাসক নেতাদের সঙ্গে তার কথপোকথন। শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের মদত এবং প্রশ্রয়েই উত্তরবঙ্গের অন্ধকার জগতের অলিখিত বাদশা হয়ে উঠেছে ওই আমলা। সোনা থেকে কয়লা, বালি থেকে কাঠ, পর্দার আড়াল থেকে পাচার কারবারের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে সে। তবে নিজের কুকর্ম প্রকাশ্যে এলেই কেন বারেবারে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখার কথা বলে গুণধর ওই আমলা তা আজও রহস্যময়।
চাকরি চুরি কাণ্ডে তৃণমূলের প্রাক্তন মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের শাগরেদ ছিলেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সেই সুবীরেশ সিবিআইয়ের জেরার মুখে পরার পর ছুটে গিয়েছিলেন ওই আমলার কাছে। যে সুবীরেশের কথায় যে কেউ চাকরি পেয়ে যেতেন, সেই সুবীরেশ নিজেকে বাঁচাতে যার কাছে ছুটে যান সে যে কতটা ক্ষমতাবান তা কয়েক বছর আগেই টের পেয়েছিলেন এনবিইউ-এর কর্মীরা। সুবীরেশের মতোই আরও অনেকেরই মুশকিল আসান হয়ে উঠেছে কীর্তিমান আমলা।
নীলবাতির গাড়ি চরে মস্তানি ওই আমলার পুরোনো অভ্যাস। কোচবিহার-২ ব্লকে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দলের কথা সকলেরই জানা। কিছুদিন আগে সেই কোন্দলে এক গোষ্ঠীর হয়ে আমলার মাসলম্যানরা বাণেশ্বর এলাকায় এক তৃণমূল নেতার বাড়িতে হুমকি দিতে যায়। তাদের সঙ্গেও ছিল নীলবাতি গাড়ি। সে খবর ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। স্বপন কামিল্যা হত্যাকাণ্ডের সেদিনের মাসলম্যানরা জড়িত কি না তাও খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ১৪ নভেম্বর বিহার ভোটের ফল; সমীক্ষায় এগিয়ে NDA, NDA-র ঘারে নিঃশ্বাস ফেলবে মহাগঠবন্ধন!
ওই আমলা তৃণমূলের অন্দরমহলে গুপ্তচরের কাজ করেন। উত্তরবঙ্গে শাসকদলে কে কখন কোণঠাসা হবেন, কে কখন ওপরমহলের সুনজরে পড়বেন তা ঠিক হয় আমলার সুপারিশেই। তাই আমলাকে সমীহ করে চলেন শাসক নেতা, মন্ত্রী সকলেই। বাইরে যা-ই বলুন না কেন তলে তলে অনেকেই আমলার সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখেই কাজ করেন। ঘাসফুল সূত্রের খবর, কোচবিহার জেলার এক পুরসভার চেয়ারম্যানের টলমল গদি টিকে রয়েছে ওই আমলার দৌলতেই।
এসএসসি থেকে পিএসসি- সর্বত্রই আমলার অবাধ বিচরণ। সূত্রের খবর, পিএসসি’র মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতার জাদুবলে নিজের প্রেমিকাকে কোচবিহারের একটি কলেজে চাকরিও পাইয়ে দিয়েছে আমলা। সেই প্রেমিকার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও উঠেছে বহু প্রশ্ন। ছুটি না নিয়েই রেগুলার কোর্সে আইনের ডিগ্রিও পেয়ে গিয়েছে আমলা। একইসঙ্গে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি’র কোর্সওয়ার্কেও প্রথম হয়ে রেকর্ড করে ফেলেছে সে।
রেগুলার কোর্সে ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তাহলে ছুটি না নিয়েও আমলা কি একই সঙ্গে দপ্তরের কাজ এবং আইন কলেজে ক্লাস করেছে? সূত্রের খবর, শিলিগুড়ির একটি আইন কলেজ থেকে ডিগ্রি পেয়েছে আমলা। কোন আইনে এবং কেন রেগুলার কোর্সে ওই আমলাকে পড়ার সুযোগ দিল কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। মন্ত্রী থাকাকালীন একদিনও ক্যাম্পাসে না এসেই উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছ’মাসের পিএইচডি’র কোর্সওয়ার্ক করার রেকর্ড এতদিন পর্যন্ত একমাত্র ছিল পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দখলেই। সেই তালিকায় নাম উঠেছে প্রভাবশালী আমলার। ছুটি না নিয়েই পার্থর ধাঁচে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোর্সওয়ার্ক করেছে আমলা। সুবীরেশের সঙ্গে যার সুসম্পর্ক ছিল তার পক্ষে যে ওইসময় আইন ভেঙে কোর্সওয়ার্ক করা খুব একটা মুশকিল ছিল না তা এখন স্পষ্ট। সূত্রের খবর, সম্প্রতি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক শিক্ষকের অধীনে পিএইচডি করার তোড়জোড় শুরু করেছে আমলা। সেই শিক্ষকের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেও দেখা গিয়েছে আমলাকে।
গজলডোবায় এক তৃণমূল বিধায়কের স্ত্রীর নামে থাকা জমির গড়মিল মেটাতেও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছে আমলা। সম্প্রতি এক মন্ত্রীর সঙ্গে এক নেতার ঝামেলা মেটাতেও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা গিয়েছে তাকে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া এলাকায় থাকা আমলার গোপন ঘাঁটিতে প্রায়ই চলে নাইট পার্টি। সেখানে আনাগোনা রয়েছে অনেক বড় মাথাদেরও। আমলার বিরুদ্ধে জেলায় জেলায় যেভাবে ক্ষোভ বাড়ছে তা ২০২৬-এর নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছে তৃণমূল নেতাদেরই একাংশ।









