ইংরেজেরা বাংলায় পা রাখতেই বুঝে গিয়েছিল—এই অচেনা দেশে বাণিজ্য বিস্তার সম্ভব হবে কেবল দেশি লোকদের সহায়তায়। তাই তারা স্থির করল একজন বিশ্বাসযোগ্য দালাল নিয়োগের। প্রথমে উমিচাঁদের বড় ভাই দীপচাঁদকে ধরেছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত খুব লাভ হল না। তারপর নজর গেল শেঠদের গৃহের কর্তা জনার্দন শেঠের দিকে। তাঁকে ডেকে এনে, আতর-গোলাপ, পান-সুপারি দিয়ে মুসলমানি রীতিতে অভিষেক করিয়ে ইংরেজরা ‘বড় দালাল’-এর আসনে প্রতিষ্ঠিত করল। সেই থেকেই বহুদিন ধরে শেঠ পরিবার পুরুষানুক্রমে এই দায়িত্ব পালন করে আসল।
আরও পড়ুনঃ সৌভাগ্য যোগে-স্বাতী নক্ষত্র, কৃষ্ণা চতুর্দশীতে ব্যবসায় বাজিমাত করবে এই চার রাশি
বড় দালালের কাজ ছিল বণিক ও সাহেবদের মাঝের সেতুবন্ধন—আজকের সওদাগরি হাউসের ব্যানিয়ানের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইংরেজরা বিদেশ থেকে যে সব মাল আনত, সেগুলোর দেশীয় বাজার তৈরি করা, আর এদেশের পণ্য সুবিধাজনক দামে সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠানো—সবই এই বড় দালালের তত্ত্বাবধানে।
তাঁতি ও কারিগররা যে দাদন পেতেন, তাও তাঁর হাত দিয়েই যেত; তারা যেন টাকা নিয়ে উধাও না হয়, সেই জামিনদারিও নিতে হতো তাঁকেই।
আরও পড়ুনঃ ২০২৫ সালের International Men’s Day থিম প্রকাশ—বার্তা দিচ্ছে বিশ্ব?
শুরুর দিকে ইংরেজ আমদানি করা বিদেশি মালমসলা এদেশে তেমন জমত না। তাই জনার্দন শেঠকে বিশেষ কৌশল করে সেগুলোর বাজার খুলতে হতো। ধীরে ধীরে তাঁর চেষ্টাতেই দেশীয় ধনাঢ্যদের মধ্যে বিলিতি পণ্যের প্রতি অনুরাগ জন্মাতে থাকে। বনাত কাপড়, গরম পোশাক, লোহা-লক্কড়, তামা-সিসার সামগ্রী, মনিহারি জিনিস—সবই কলকাতার বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এমনকি নিলামে ওঠা মৃত সাহেবদের ফার্নিচার, বাক্স-প্যাঁটরা, ছুরি-কাঁচি পর্যন্ত কিনে আনতেন দিশি বাসিন্দারা। জনার্দনের ভাই বারাণসী শেঠ তো একদিন অকশন থেকে ছ’–সাতখানা চীনের ছবি একসঙ্গে কিনে ফেলেছিলেন।
বড় দালাল কোনো মাসিক বেতন পেতেন না; তাঁর আয় আসত বেচাকেনার মোট দামে যুক্ত কমিশন থেকে। শুনতে কম মনে হলেও, হিসেব কষলে সেই কমিশনই ছিল বড় অঙ্কের উপার্জন। উপরন্তু, তাঁকে প্রায়ই মোগলাই আঙিকে কাবা-জোব্বা পরে ইংরেজদের প্রতিনিধি হয়ে হুগলির ফৌজদারের দরবারে হাজিরা দিতে হতো। এমন নথিও পাওয়া যায় যেখানে দেখা যাচ্ছে—জনার্দন শেঠ ইংরেজদের হয়ে আইনি ওকালতি করছেন। ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকায় বড় দালালের অধীনে ধীরে ধীরে অনেক ছোট দালালও নিয়োগ করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি হিন্দু; কিছু পশ্চিমা হিন্দু ও ও কিছু মুসলমানও ছিলেন।









