পশ্চিমবাংলায় আরাধিতা দেব-দেবীর মধ্যে শীতলা দেবী অন্যতমা।
আবালবৃদ্ধবনিতা শীতলাদেবীর নাম ও মাহাত্ম্য জানেন। প্রায় প্রতিগ্রামেই প্রতিবৎসর অন্ততঃ একবার করে ‘বারোয়ারী পূজা’ নামে আড়ম্বরের সঙ্গে শীতলাদেবীর পূজা হয়ে থাকে। পশ্চিমবাংলার অনেকজায়গায় সুরম্য মন্দিরে দেবীর প্রতিষ্ঠিত মূর্তি আছে এবং নিত্য পূজা হয়ে থাকে। তথাপি অনেকেই বলে থাকেন শীতলা বৈদিক দেবতা নন, পৌরাণিকও নন, ইনি লৌকিক দেবতা। কিন্তু অবৈদিক কথাটা অর্ধসত্য। কারণ বেদে শীতলার নাম নাই কিন্তু বেদে বহু চর্চিত লক্ষ্মী, সরস্বতীর মিশ্রণে পুরাণে শীতলার রূপ বর্ণিত হয়েছে। স্কন্দপুরাণে বর্ণিত দেবীর ধ্যান-
আরও পড়ুনঃ ‘সাহস দেখবেন না!’ সুপ্রিম ধাক্কা তৃণমূলের
শ্বেতাঙ্গীং রাসভস্থাং করযুগলবিলসম্মার্জনী পূর্ণ কুম্ভাং মার্জন্যা পূর্ণকুম্ভাদমৃতময়ং জলং তাপশান্ত্যৈ ক্ষিপন্তীম্। দিগ্ধস্ত্রাং মূর্রিসূর্পাং কনকমণিগণৈভূষিতাঙ্গীং ত্রিনেত্রাং বিস্ফোটাদুগ্রতাপ প্রশমনকরীং শীতলাং তাং ভজামি।।
প্রাচীন পদ্ধতিতে আর একটি ধ্যান মন্ত্র পাওয়া যায়-
শূর্পালঙ্কৃত মস্তকাং সুরগণৈঃ সংস্কৃয়মানাং মুদা। বামে কুম্ভধরাং পয়োদবদনাং বন্দে খরস্থাং সদা।।
দিগ্বাসামুরহাস সুন্দরমুখীং সম্মার্জনীং দক্ষিণে। পাণৌ তাং দধতীং ভবার্তিশমনীং সংসারবিদ্রাবিণীম্।।
বাহন গর্দভ, কুলা ও ঝাঁটা বাদ দিলে শীতলার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা, দুর্গা, ষষ্ঠী প্রভৃতির সাদৃশ্য মেলে। মনে হয়, এই দেবীদের রূপগুণের সংমিশ্রণে শীতলার সৃষ্টি হয়েছে।
স্কন্দপুরাণে শীতলার স্তোত্রে শীতলার রূপ ও কর্মের বিবরণ আছে। তার অর্থ বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, শীতলানামে শীতলামৃতবাহিনী গঙ্গার শৈত্যের ইঙ্গিত বহন করে। সরস্বতী, গঙ্গা ও ষষ্ঠী শ্বেতবর্ণা; শীতলাও শ্বেতবর্ণা, লক্ষ্মীর হাতে আছে রত্নঘট, শীতলার হাতে অমৃতকুম্ভ। আবার ঐ স্তোত্রেই জলমধ্যে শীতলার পূজার বিশেষ মাহাত্ম্যের উল্লেখ আছে। অতএব গঙ্গা ও সরস্বতীর মত শীতলার জলরূপতার দ্বারা গঙ্গা ও সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্নতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ষষ্ঠীর আর এক নামই শীতলা।
অনেক পণ্ডিত মনে করেন বৌদ্ধতন্ত্রের হারীতীদেবী শীতলায় রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু তাঁদের সিদ্ধান্তকে ভ্রান্তই বলতে হয়। বরং বলা যায় ষষ্ঠী-শীতলা-মনসা প্রভৃতির প্রভাবেই হারীতীর সৃষ্টি। এটা অনুমান করা সমীচীন যে, বৈদিক দেবতা সরস্বতী থেকে বিভিন্ন নারী দেবতার বিবর্তন ধারায় শীতলার আবির্ভাব। সরস্বতী হলেন জাড্যাপহারিণী, গঙ্গা সর্বপাপহারিণী, ষষ্ঠী শিশুরোগাপহারিণী, মনসা বিষহারিণী আর শীতলাও বালরোগনাশিনী, পরে বিস্ফোটকনাশিনী অর্থাৎ বসন্তরোগনাশিনী-সর্বরোগবিনাশিনী।
নিঃসংশয়ে স্বীকার্য যে শীতলা পৌরাণিক দেবী। বরং তন্ত্রেও শীতলার কথা নানাভাবে পাওয়া যায়। যেমন স্কন্দপুরাণোক্ত ধ্যানমন্ত্রটি পিচ্ছিলাতন্ত্রেও পাওয়া যায়। সেখানেও শীতলা শ্বেতবর্ণা, গর্দভবাহিনী, কালীদুঃখবিমোচিনী তন্ত্রে এবং মুণ্ডমালা তন্ত্রে শীতলাদেবীর উল্লেখ আছে। ‘কালীদুঃখবিমোচিনী তন্ত্রে’ কালীর বর্ণনা-
কলৌ দেবী দ্বিভুজাং কালিকাং যজেৎ।
দিগম্বরীং খরস্থাঞ্চ তৎক্ষণাৎ সিদ্ধিমাপুয়াৎ।। অতঃ কলৌ ভাগ্যবন্তো বদন্তি কালিকাং পরাম্।
সুখদাং শীতলাঞ্চৈব তদংশং খরবাহিনীম্।।
এখানে শীতলাকে দ্বিভুজা কালীরূপে দেখান হয়েছে। এমনকি এই তন্ত্রে শীতলার গায়ত্রী মন্ত্র বলা হয়েছে-
‘শ্রী শীতলায়ৈ বিদ্মহে খরবাহিন্যৈ ধীমহি তন্নঃ কালী প্রচোদয়াৎ।’
অতএব শীতলা দেবী কালীরই অংশসম্ভূতা বা ভিন্নরূপা কালিকা। আবার তন্ত্রে দশমহাবিদ্যার মধ্যে ধূমাবতী দেবীর হাতে কুলা শীতলার মাথাতেও চাপান হয়েছে। শীতলার হাতে ঝাঁটা ও মাথায় কুলা দেওয়া রোগ দূর করার ইঙ্গিত বহন করে। ঝাঁটা দিয়ে তিনি রোগ অপসারণ করেন আর কুলার বাতাসে অবাঞ্ছিত ও অমঙ্গল দূরীভূত হয়।
আরও পড়ুনঃ আগুন মধ্যবিত্তদের হেঁসেলে; তুঙ্গে ইন্ডাকশনের চাহিদা
শীতলার পূজা আমাদের দেশে অত্যন্ত আধুনিককালে প্রচলিত হয়নি, কমপক্ষে খৃষ্টীয় একাদশ শতকের পূর্ব থেকে প্রচলিত। সেই সঙ্গে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিমবাংলার বহুস্থানে মৃন্ময় বা প্রস্তরের মূর্তি বহুমন্দিরে প্রতিষ্ঠিতা হয়ে নিত্যপূজা গ্রহণ করেন। কিন্তু সচরাচর লৌকিক দেবতা রূপে আমাদের দেশে যাঁদের পূজা করা হয় তাঁদের এরূপ প্রাচীনতা ও মন্দির মূর্তি বলতে প্রায় কিছু নাই। সচরাচর কোনো গাছের তলায় পাথরের নুড়ি বা শিলাখণ্ডে পূজা হয়ে থাকে। সুতরাং শীতলাকে পৌরাণিক দেবতা রূপে মান্যতা দিয়ে বৈদিকপূজাবিধি অনুসারে পূজা করাই বিধেয়। তবে তন্ত্রেও দেবীর নাম আছে বলে এবং যাঁরা তান্ত্রিক তাঁরাও তন্ত্রোক্ত বিধানে পূজা করতে পারেন।
মাহাত্ম্য-শীতলাপূজার দ্বারা যেমন ব্যাধিনাশ হয় তেমন আবার নারীদের অবৈধব্য প্রাপ্তি ঘটে। শীতলামাতার চরণামৃত পানে নির্মাল্য মস্তকে ধারণে শিশুদের সকল ব্যাধি আশু প্রশমিত হয়।
তবে দুঃখের বিষয় এপর্যন্ত প্রাচীন থেকে ইদানীন্তনকালে প্রকাশিত কোনও পদ্ধতিতেই সঠিক ক্রম ও বিধি লক্ষিত হয়নি। এমনকি তন্ত্রোক্তবিধানে পদ্ধতি রচনা করছি বলেও ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে দিয়েছেন। প্রচলিত সমস্ত পদ্ধতি গুলির ক্রম বিন্যাস, বিধি ও মন্ত্রপ্রয়োগ দেখলে একটি চলিত প্রবাদ মনে পড়ে যায়- ‘ভাজছে উচ্ছে, বলছে পটল, পাতে পড়ছে কাঁচকলা।’
এ পদ্ধতিটিতে উভয় বিধান থাকছে, এবং স্থানে স্থানে তন্ত্রোক্ত বিশেষগুলি বিশেষভাবে দেওয়া থাকছে। সেগুলি দেখে নির্দেশমত পূজা করলে ‘জগাখিচুড়ি’ হবে না।









