“পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি“— নিছক কবিতা, নাকি খিদের জ্বালায় লেখা এক চরম বাস্তব?
ছোটবেলায় বাংলা বইয়ের পাতায় আমরা অনেকেই পড়েছি— “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।” লাইনটা পড়ার সময় হয়তো আমরা বাহবা দিয়েছি কবির উপমা ব্যবহারের ক্ষমতাকে। কিন্তু জানেন কি? এই কালজয়ী লাইনটি লেখার সময় কবির নিজের পেটে ছিল একটানা কয়েক দিনের মারাত্মক খিদে! এটা কোনো রোমান্টিক কবিতা ছিল না, ছিল এক অভুক্ত তরুণের নাড়ির টান, পেটের চরম জ্বালা।
ইনি কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। যার কলম দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরোত, কিন্তু নিজের পকেটে একটা ফুটো পয়সা পর্যন্ত থাকত না।
আরও পড়ুনঃ “নিজের মনটাকে অন্ধকার হতে দিও না ফেলু”; বলেছিলেন বামপন্থী সরোজিনী নাইডুর ভাই
জন্ম ও বেড়ে ওঠা: এক লড়াইয়ের গল্প
সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈতৃক নিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ায়। কিন্তু তাঁর জন্ম হয় ১৫ই আগস্ট, ১৯২৬ সালে, কলকাতার কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটে, তাঁর মামাবাড়িতে। বাবা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মা সুনীতি দেবীর এই সন্তান ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন শুধুই অভাব আর মৃত্যু। খুব অল্প বয়সেই তিনি মাকে হারান।
তিনি বড় হচ্ছিলেন এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আর বাংলায় আছড়ে পড়েছে ১৯৪৩ সালের ভয়ংকর ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা কঙ্কালসার মৃতদেহ আর ডাস্টবিনের এঁটো খাবার নিয়ে কুকুর আর মানুষের লড়াই সুকান্তের কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র আন্দোলনে। নিজের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য— সব কিছু শিকেয় তুলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে।
আত্মসম্মান আর খিদের এক অদ্ভুত লড়াই
সুকান্তের পকেটে টাকা ছিল না, পেটে অন্ন ছিল না, কিন্তু আত্মসম্মান ছিল পাহাড়ের মতো অটুট।
দিনের পর দিন না খেয়ে কাটাতেন, কিন্তু বন্ধুদের কাছে হাত পাততে তাঁর চরম লজ্জা করত। তাই খিদে পেলে এই কিশোর কবি বেছে নিয়েছিলেন এক ভয়ংকর আত্মঘাতী পথ।
খিদে যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যেত, তিনি সস্তা বিড়ি বা সিগারেট কিনে একের পর এক ফুঁকতেন। কারণ তাঁর মনে হতো, নিকোটিন পেটে গেলে খিদের জ্বালাটা হয়তো কিছুটা মরে যাবে। মাসের পর মাস আধপেটা খেয়ে বা না খেয়ে, কেবল বিড়ির ধোঁয়া গিলে আর রোদে পুড়ে পার্টির কাজ করে তাঁর শরীরে নিঃশব্দে বাসা বাঁধল এক মারণ রোগ— যক্ষ্মা বা টিবি (Tuberculosis)।
আরও পড়ুনঃ চুপি চুপি ১০-৩০% দাম বাড়ছে মোবাইল, এসি এবং ওয়াশিং মেশিনের! জেনেও চুপ সরকার
করুণ পরিণতি
অপুষ্টি, ক্লান্তি আর অতিরিক্ত ধূমপান তাঁকে ভেতর থেকে শেষ করে দিয়েছিল। অবশেষে তাঁকে ভর্তি করা হয় কলকাতার যাদবপুর টিবি হাসপাতালে (বর্তমান K. S. Roy T.B. Hospital)।
১৩ই মে, ১৯৪৭। ভারতের স্বাধীনতার ঠিক কয়েক মাস আগে, মাত্র ২০ বছর ৯ মাস (প্রায় ২১ বছর) বয়সে এই হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিদ্রোহী কিশোর কবি। শোনা যায়, মৃত্যুর সময়ও তাঁর পকেটে পাওয়া গিয়েছিল এক মুঠো সস্তা বিড়ি আর কয়েকটা খুচরো পয়সা।
ডাক্তাররা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, টিবি নয়, মূলত অপুষ্টি আর অবহেলাই তাঁকে এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দিল। ভাবলে চোখে জল আসে— আমরা রাতের আকাশে সুন্দর চাঁদ দেখি, আর তিনি খিদের তীব্র যন্ত্রণায় সেই চাঁদের মধ্যেও শুধু এক টুকরো পোড়া রুটি খুঁজেছিলেন।
স্কুলের বইতে পড়া সুকান্ত আর বাস্তবের এই অভুক্ত, আত্মসম্মানী সুকান্তের এই তফাৎটা কি আপনি আগে জানতেন?
তথ্যসূত্র (Sources):
সুকান্ত সমগ্র (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি)
কবির জন্ম ও মৃত্যু তারিখ: ১৫ আগস্ট ১৯২৬ – ১৩ মে ১৯৪৭ (যাদবপুর টিবি হাসপাতাল)।
তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতাদের স্মৃতিচারণ এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনীমূলক বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রবন্ধ।
১৯৪৩-এর বাংলার মন্বন্তর (Bengal Famine of 1943) এবং তার ঐতিহাসিক প্রভাব।



