শুভজিৎ মিত্র, কলকাতা
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শেষ হবার পরেও,একটা প্রশ্ন আজকের দিনে দাঁড়িয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে যে,বিগত সরকারের আমলে কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক গভীর সংকট ও উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠছে? বিগত সাড়ে দশ বছরের সময়কাল ধরে, রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে যে প্রশ্নগুলো জনমানসে দানা বেঁধেছিল, তা নির্বাচনী প্রচারণার মূল কেন্দ্রে চলে এসেছিল।
আরও পড়ুনঃ ‘আই অ্যাম দ্য লাস্ট পার্সন টু টলারেট’, ফুল দিতে আসা তৃণমূল কর্মীকে ‘দরজা’ দেখালেন কৌস্তভ
বিশ্ব বাংলা লোগো
সমালোচকদের মতে, রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের লোগো হিসেবে জাতীয় প্রতীক ‘অশোক স্তম্ভ’-এর স্থানে বা তাঁকে লঘু করে পূর্বতন রাজ্য সরকারের ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোকে প্রাধান্য দেওয়া কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়। এটি রাজ্যের পরিচয়কে জাতীয় মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে, একটি স্বতন্ত্র ও আলাদা ভাবমূর্তি গড়ে তোলার সুপরিকল্পিত প্রয়াস। এই প্রতীকী রাজনীতি নির্বাচনী ইশতেহারে এক বড় তর্কের খোরাক জুগিয়েছিল।

পরিবর্তিত জনবিন্যাস
বিগত কিছু বছর ধরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, রাজ্যের পরিবর্তিত জনতাত্ত্বিক কাঠামো। এখানে উদাহরণস্বরূপ, বিগত দশকে গৃহীত বিশেষ রাজনৈতিক নীতি এবং তোষণমূলক শাসনব্যবস্থার কারণে, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ডেমোগ্রাফিক ভারসাম্য যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছিল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল যে, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি কেবল নির্বাচনী ভোটব্যাংকের সমীকরণ বদলায়নি, বরং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক পরিকাঠামোর ওপরও গভীর সংকট তৈরি করেছে। যা ভোটারদের একটি বড় অংশ ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে রাজ্যের এই জনতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতাকে পুনরুদ্ধারের দাবিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।

ভাষা ও সংস্কৃতিগত পরিবর্তন
বিগত কয়েক বছরে, পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর ভাষাগত এবং ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয় সংস্কৃতির মূলধারাকে পাশ কাটিয়ে একটি বিশেষ ভাষাগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায়, রাজ্যের অসাম্প্রদায়িক কাঠামোটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে, মুসলিম সমাজের একাংশের বিপথগামী শিবিরের দ্বারা বারংবার অশান্তি সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক দপ্তরের নীরবতাকে সাধারণ নাগরিকরা ‘তোষণ ও অস্থিরতা’র বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছিলেন। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাজ্যে আইনি শাসনের চেয়ে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। যা বৃহত্তর ভারতের সাথে পশ্চিমবঙ্গের অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছিল।
আরও পড়ুনঃ রাস্তা আটকে নমাজ বন্ধ কলকাতায়, স্বস্তিতে আমজনতা
২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, এটি ছিল বাংলার আত্মপরিচয় রক্ষার পরীক্ষা। বিগত সাড়ে দশ দশকে পশ্চিমবঙ্গ যে পথে পরিচালিত হয়েছে। তাতে রাজ্যটি জাতীয় মূলস্রোত থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে কি না? -এই প্রশ্নটাই প্রতিটি সচেতন ভোটারের মনে ঘুরপাক খেয়েছিল।

উন্নয়নের দাবির আড়ালে, লুকানো এই বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা, জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং আইনি অরাজকতা—এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলায় এবারের নির্বাচনে মানুষকে কোন পথে পা বাড়াতে হবে, তা ঠিক করে দিয়েছিল



