মে মাসের শেষভাগে কলকাতার রাস্তায় দুপুরবেলা কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই এখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের হিসাবে তাপমাত্রা হয়তো ৩৬ কিংবা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু শরীর যেন বলছে সেটি ৫০-৫২ ডিগ্রির কাছাকাছি। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ থেকে শুরু করে ডেলিভারি কর্মী, ট্রাফিক পুলিশ কিংবা ফুটপাথের দোকানদার— প্রায় সকলের মুখে একই কথা, “এই গরম যেন সহ্যই হচ্ছে না।” আশ্চর্যের বিষয় হল, সেই একই সময়ে রাজস্থানের মরুভূমি অঞ্চলে বাস্তব তাপমাত্রা কলকাতার থেকেও বেশি থেকেছে। তবুও আবহাওয়াবিদরা বলছেন, অনুভূত গরমের দিক থেকে কলকাতা অনেক বেশি অসহ্য হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি একাধিক আবহাওয়া রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, কলকাতার বাস্তব তাপমাত্রা ৩৫.৯ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও “রিয়েল ফিল” বা অনুভূত তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৫২ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। অন্যদিকে রাজস্থানের জয়সলমের বা থর মরুভূমির বিস্তীর্ণ অংশে বাস্তব তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রি থাকলেও সেখানে অনুভূত তাপমাত্রা তুলনামূলক কম ছিল। সংখ্যার দিক থেকে বিষয়টি অবিশ্বাস্য শোনালেও এর পিছনে রয়েছে অত্যন্ত স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ।
কলকাতার বর্তমান আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আর্দ্রতা। গত কয়েকদিনে শহরের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বহু সময়েই ৬৫ শতাংশ থেকে ৮৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গিয়েছে। অর্থাৎ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। মানুষের শরীর সাধারণত ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। শরীর গরম হয়ে উঠলে ঘাম বেরোয়, তারপর সেই ঘাম বাতাসে শুকিয়ে যেতে যেতে শরীর থেকে তাপ টেনে নেয়। এই প্রক্রিয়াটিই মানুষের শরীরকে স্বাভাবিক রাখে। কিন্তু বাতাসে যদি আগেই অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প থাকে, তাহলে ঘাম সহজে শুকোতে পারে না। ফলে শরীরের ভিতরে জমে থাকা তাপ বেরোবার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুনঃ এখন তাপপ্রবাহ, এরপরই ১০০ কিমি বেগে ঝড়! ভয়ঙ্কর পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এই কারণেই কলকাতার ৩৭ ডিগ্রি অনেক সময় মরুভূমির ৪৩ ডিগ্রির থেকেও বেশি কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। থর মরুভূমিতে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হলেও বাতাস তুলনামূলক শুষ্ক থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আর্দ্রতা ১৫ থেকে ২০ শতাংশের আশেপাশে থাকে। ফলে সেখানে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং শরীর কিছুটা হলেও নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে। কলকাতায় ঠিক উল্টো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এখানে বাতাস ভারী, আর্দ্রতা বেশি, ঘাম শুকোতে সময় লাগে, আর সেই কারণেই শরীর ক্রমাগত উত্তপ্ত অনুভব করতে থাকে।
“রিয়েল ফিল” বা “হিট ইনডেক্স” আসলে এমন একটি হিসাব, যেখানে শুধুমাত্র তাপমাত্রা নয়, তার সঙ্গে আর্দ্রতাকেও ধরা হয়। ধরো, কোনও দিনে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি এবং আর্দ্রতা ৬৫ শতাংশ। সেই পরিস্থিতিতে মানুষের শরীর যে গরম অনুভব করবে, সেটি বাস্তবে প্রায় ৫০ ডিগ্রির সমান হতে পারে। আবার যদি একই ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আর্দ্রতা কমে ২০ শতাংশে নেমে আসে, তাহলে অনুভূত গরম অনেকটাই কমে যায়। অর্থাৎ থার্মোমিটারে দেখা সংখ্যাই সবকিছু নয়, শরীর আসলে কতটা চাপ অনুভব করছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে ক্রমাগত জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ও গাঙ্গেয় অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে। তার ফলে কলকাতা ও আশেপাশের এলাকায় আর্দ্রতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দিনে তীব্র রোদ মাটিকে গরম করছে, আর সেই উত্তপ্ত বাতাসের সঙ্গে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প মিশে তৈরি করছে ভয়ঙ্কর অস্বস্তিকর পরিবেশ। দুপুরের পর থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক জায়গায় রাতের তাপমাত্রাও খুব একটা নামছে না, ফলে শরীর বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না।
চিকিৎসকদের মতে, এই ধরণের আবহাওয়ায় শরীরের উপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ঘাম, জলের ঘাটতি, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, পেশিতে টান ধরা কিংবা হিট এক্সহস্টনের মতো সমস্যা দ্রুত দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বৃদ্ধ মানুষ, শিশু, হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা মানুষের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। শরীর যখন নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন হিট স্ট্রোকের আশঙ্কাও তৈরি হয়। এই অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
কলকাতার বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে শহরের কংক্রিট পরিবেশ। অসংখ্য বহুতল, গাড়ির তাপ, এসির গরম বাতাস, কমে যাওয়া খোলা সবুজ জায়গা— সব মিলিয়ে শহরের ভিতরে “আরবান হিট আইল্যান্ড” প্রভাব তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চল আশেপাশের তুলনায় আরও বেশি গরম হয়ে উঠছে। দিনের বেলা সূর্যের তাপ কংক্রিট শুষে নিচ্ছে, তারপর সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে সেই তাপ আবার বাতাসে ছাড়ছে। ফলে রাতেও গরম কমছে না।
এই কারণেই বর্তমানে কলকাতার গরমকে শুধুমাত্র “৩৭ ডিগ্রি” বলে বোঝানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বাস্তবে মানুষের শরীর যে তাপমাত্রা অনুভব করছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।
উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। আর দক্ষিণে প্রবল অস্বস্তিকর গরম। আবহাওয়া অফিস বলছে,আগামী রবিবার পর্যন্ত গরম এবং অস্বস্তি থাকবে দক্ষিণবঙ্গে। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা বৃষ্টি হলেও স্বস্তি মিলবে না। উত্তরবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা। উপরের পাঁচ জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বৃষ্টি চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। আবহাওয়া অফিস বলছে, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপর একটি ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিম বিহারে রয়েছে আরও একটি ঘূর্ণাবর্ত। জোড়া ঘূর্ণাবর্তে উত্তরবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হবে।
আবহাওয়া অফিস বলছে,গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া বজায়। বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি হলেও স্বস্তি মিলবে না। গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া সব থেকে বেশি থাকবে বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-পশ্চিম মেদিনীপুর পশ্চিম বর্ধমান-বীরভূমে। কলকাতা সহ উপকূলের জেলাগুলিতে আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তি আরও বেশি হবে। উপকূলের জেলাগুলিতে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় এই সমস্যা অনেক বেশি অনুভূত হবে। কলকাতায় ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি এবং পশ্চিমের জেলায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পৌঁছে যাবে পারদ।
বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা মাঝারি বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া থাকতে পারে। বজ্রগর্ভ মেঘ থেকে স্থানীয়ভাবে এই ঝড় বৃষ্টির সম্ভাবনা সামান্য সময়ের জন্য। বীরভূম-মুর্শিদাবাদ-নদিয়া-পূর্ব পশ্চিম বর্ধমান এবং পুরুলিয়া-বাঁকুড়াতে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি থাকবে।
আজ সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে ০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। গতকাল বিকেলে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৪ থেকে ৯৫ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার থেকে আগামী সপ্তাহের মঙ্গলবার পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বৃষ্টি উত্তরবঙ্গে। শুক্র-শনি-রবি এই তিন দিন অতি ভারী বৃষ্টি হবে জলপাইগুড়ি,আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারের কিছু অংশে।
মঙ্গলবার পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে ভারী বৃষ্টি চলবে দার্জিলিং,কালিম্পং,আলিপুরদুয়ার কোচবিহার এবং জলপাইগুড়ি জেলায়। বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়-বৃষ্টি বিক্ষিপ্তভাবে উত্তরবঙ্গের সব জেলায়। মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে বজ্রবিদ্যুৎ সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে।



