এই এপ্রিলে গরমের আগের সব রেকর্ড ভেঙে যাবে বলে সতর্কবার্তা দিলেন আবহবিদেরা। দেশের কোনও কোনও প্রান্তে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোবে যা নিয়ে আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তাঁরা। আগামী কয়েক দিন গরমের তীব্রতা আরও বাড়বে। তাপমাত্রা কোথাও কোথাও ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে পৌঁছোতে পারে। ইতিমধ্যেই দেশের ১০ রাজ্যে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গও।
আবহবিদেরা জানাচ্ছেন, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছোবে। ফলে এই সময় সাধারণ মানুষের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং বাড়ির বাইরে যাঁরা কাজ করেন। তবে তাপপ্রবাহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এমনটা নয়। দিল্লি-সহ উত্তর ভারত তো বটেই, পূর্ব ভারতেও আগামী দিনে তাপমাত্রা ৪৩-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছোবে।
আরও পড়ুনঃ তেলঙ্গানায় হুলস্থুল! হায়দরাবাদ থেকে চেন্নাইগামী চারমিনার এক্সপ্রেসে আগুন
মৌসম ভবন জানিয়েছে, হরিয়ানা, পঞ্জাব, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগঢ়, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, গুজরাত এবং ওড়িশায় তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি জারি থাকবে। কোনও কোনও রাজ্যে এপ্রিলে গরমের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় এবং ঝাড়খণ্ড।
মৌসম ভবনের বুলেটিন অনুযায়ী, দেশের বেশির ভাগ অংশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে থাকবে। তবে পশ্চিম হিমালয় অঞ্চল, পূর্ব ভারত সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অংশ এবং দেশের পশ্চিম উপকূলে তাপমাত্রা খুব একটা বাড়বে না এই সময়ে। শুক্রবার উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছে।
তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি চলবে জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, পঞ্জাব, হরিয়ানা, ওড়িশায়। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত এই পরিস্থিতি থাকবে। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ত্রিপুরা, কোঙ্কণ, গোয়া, গুজরাত, উপকূলীয় কর্নাটক, কেরলে। ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত এই পরিস্থিতি থাকবে তামিলনাড়ু, পুদুচেরি, কারাইকলে।
আরও পড়ুনঃ গোসাবায় শোকজ বিএলও অসীম মণ্ডল; কিন্তু কেন?
বিশ্বের উষ্ণতম শহরের তালিকায় ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য। সোজা কথায় বর্তমান বিশ্বের আবহাওয়ার পরিসংখ্যানে চরম অস্বস্তিকর ছবি ভারতের। বিশ্বের ২০টি উষ্ণতম শহরের তালিকার মধ্যে ১৯টিই ভারতের। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) জানিয়েছে, বিহারের ভাগলপুর, ওড়িশার তালচের এবং পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল বর্তমানে বিশ্বের উষ্ণতম স্থানের তালিকায় শীর্ষে। এই প্রতিটি শহরেই তাপমাত্রাই ছুঁয়ে ফেলেছে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি। দিল্লির পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সেখানে পারদ রোজই ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে ৪২ ডিগ্রিে, নাগপুরেও তাই। অন্যদিকে ভোপাল ও ভুবনেশ্বরে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির ঘরে ঘোরাফেরা করছে। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেও এখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির নিচে নামছে না।
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের ঠান্ডা জলরাশি যখন অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় ‘এল নিনো’। ট্রিলিয়ন লিটার জল আচমকা গরম হয়ে যাওয়ার ফলে বায়ুমণ্ডলের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে, গোটা বিশ্বের আবহাওয়া বদলে যায়। সাধারণত এটি ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এবারের আশঙ্কা আরও বেশি কারণ প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার NOAA-র রিপোর্ট অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এই এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬১ শতাংশ।
সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হল, এই এল নিনো তখনই পূর্ণ শক্তি অর্জন করবে যখন ভারতে বর্ষাকাল। অর্থাৎ মৌসুমি বায়ুর পুরোদমে সক্রিয় থাকার কথা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫-১৬ সালে যখন সুপার এল নিনো এসেছিল, তখন ভারতে বৃষ্টির পরিমাণ ১৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। যার ফলে ভারত ও পাকিস্তানে তীব্র দাবদাহে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এদিকে ভারতের কৃষি ব্যবস্থার ৫০ শতাংশেরও বেশি অংশ সরাসরি বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। এবার যদি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের থেকে কম হয়, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীন অর্থনীতি বড়সড় সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে।
১৯০১ সাল থেকে ভারতে আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সাল ছিল উষ্ণতম বছর। সেই বছর দিল্লির সফদরজং ৪৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভয়ঙ্কর তাপমাত্রা দেখা গিয়েছিল এবং রাজস্থানের চুরুতে পারদ পৌঁছেছিল ৫০.৫ ডিগ্রিতে। কেবলমাত্র মে মাসেই তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা বেড়েছিল ১২৫ শতাংশ। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৪০ বছরের বিরলতম ‘মেগা এল নিনো’র প্রভাবে এবার ২০২৪ সালের সেই রেকর্ডও ভেঙে খান খান হয়ে যেতে পারে।



