বর্তমানে ভারতের সাধারণ মানুষ যখন পেট্রোল পাম্পে গিয়ে স্থিতিশীল দামে জ্বালানি তেল কিনছেন, তখন পর্দার আড়ালে এক ভয়াবহ আর্থিক সংকটের চিত্র তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো (OMCs) দীর্ঘ সময় ধরে পেট্রল ডিজেলের স্থির রেখেছে।
তবে এই স্থিরতা কোনো জাদুবলে আসেনি, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রতিদিনের বিপুল অঙ্কের আর্থিক রক্তক্ষরণ। সূত্র অনুযায়ী, ইন্ডিয়ান অয়েল (IOCL), ভারত পেট্রোলিয়াম (BPCL) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম (HPCL)-এর মতো সংস্থাগুলো বর্তমানে সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকা লোকসান করছে।
গত মাসে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখন অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং এই ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক ২,৪০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
আরও পড়ুনঃ নিউটাউনে খালের ধার থেকে উদ্ধার কয়েকশো আধার কার্ড
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ভারতের ঘরোয়া বাজারের মূল্যের পার্থক্য এখন আকাশছোঁয়া। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রিতে প্রায় ১৮ টাকা এবং প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৩৫ টাকা লোকসান বহন করছে।
যদি বর্তমানে বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে ভারতের পাম্পের দামকে সরাসরি যুক্ত করা হতো, তবে দেশের বাজারে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ১১৩ টাকা এবং ডিজেলের দাম ১২৩ টাকা ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু সাধারণ মানুষকে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে বাঁচাতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকার ও তেল সংস্থাগুলো এই ঘাটতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
যদিও ২০২২ সালের এপ্রিল মাস থেকে তেলের দাম কার্যত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিশাল আর্থিক বোঝা আর কতদিন বহন করা সম্ভব, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দামের পেছনে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক অস্থিরতা। ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮-৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো দিয়ে তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
যদিও রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সস্তায় তেল আমদানির চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলে ৯০ থেকে ১০০ ডলারের নিচে না নামলে ভারতের তেল সংস্থাগুলোর পক্ষে লাভজনক অবস্থায় ফেরা অসম্ভব। ম্যাককুয়ারি গ্রুপের (Macquarie Group) একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি ১০ ডলার তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভারতের তেল সংস্থাগুলোর বিপণন ক্ষতি লিটার প্রতি ৬ টাকা করে বেড়ে যায়। সংস্থাগুলোর ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট বা লাভ-ক্ষতিহীন অবস্থা হলো ব্যারেল প্রতি ৮০-৮৫ ডলার, যা বর্তমান মূল্যের চেয়ে অনেক নিচে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কবে বাড়বে? বাজার বিশ্লেষক ও আর্থিক সংস্থাগুলোর মতে, এই উত্তরটি সরাসরি ভারতের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে নির্বাচন আছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, ভারতে নির্বাচনের সময় সরকার তেলের দাম বৃদ্ধিতে লাগাম টেনে ধরে। যদিও তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা তাত্ত্বিকভাবে তেল সংস্থাগুলোর হাতে এবং এটি ‘ডিরেগুলেটেড’ বা বাজার-নির্ভর, তবুও নির্বাচনের আগে জনরোষ এড়াতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার পরোক্ষভাবে দাম স্থির রাখার নির্দেশ দেয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি এপ্রিল মাসের শেষে এই রাজ্যগুলোতে ভোটগ্রহণ পর্ব মিটে গেলেই জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকার অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। গত মার্চ মাসে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর লিটার প্রতি ১০ টাকা আবগারি শুল্ক (Excise Duty) কমানো হয়েছিল। তবে মজার বিষয় হলো, এই শুল্ক হ্রাসের সুবিধা সরাসরি সাধারণ গ্রাহকদের দেওয়া হয়নি। পরিবর্তে, এই টাকাটি তেল সংস্থাগুলোর লোকসান মেটাতে বা ‘ক্যাপচার’ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, সরকার কর কমিয়ে সংস্থাগুলোকে কিছুটা অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করছে যাতে তারা পাম্পে দাম না বাড়িয়েও টিকে থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে সম্পূর্ণ আবগারি শুল্ক তুলে নিলেও তেল সংস্থাগুলোর লোকসান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এর ফলে সরকারের রাজস্বও ব্যাপক হারে কমছে, যা দেশের রাজকোষ ঘাটতি (Fiscal Deficit) বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে চেপে রাখা দেশের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। প্রথমত, তেল সংস্থাগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য এতটাই খারাপ হচ্ছে যে তারা নতুন কোনো রিফাইনারি বা শক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারছে না।
আরও পড়ুনঃ হারছে তৃণমূল! তাই কী মমতা-সঙ্গ ছাড়ল আইপ্যাক?
দ্বিতীয়ত, ডিজেলের দাম না বাড়ালে সাময়িকভাবে পরিবহণ খরচ স্থির থাকছে ঠিকই, কিন্তু একবারে যখন দাম বাড়বে তখন তা বাজারে বড় ধরণের মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা (Inflationary Shock) দেবে। বর্তমান ধারায় যদি লোকসান চলতে থাকে, তবে মাসে তেল সংস্থাগুলোর ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ কোটি টাকা। এটি কেবল ওই সংস্থাগুলোর জন্য নয়, বরং ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও আশঙ্কাজনক কারণ এই সংস্থাগুলো বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে কাজ করে।
সব শেষে বলা যায়, ভারতের সাধারণ মানুষ বর্তমানে যে স্থিতিশীল তেলের দাম উপভোগ করছেন, তা মূলত একটি ‘অস্থায়ী স্বস্তি’। নির্বাচনের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং সরকারের রাজস্ব বিসর্জনের বিনিময়ে এই দাম ধরে রাখা হয়েছে।
তবে এপ্রিলের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। তেল সংস্থাগুলো হয়তো একবারে ১০-১৫ টাকা না বাড়িয়ে প্রতিদিন কয়েক পয়সা করে দাম বাড়ানোর কৌশল নিতে পারে, যাতে মানুষের ওপর এককালীন বোঝা কম পড়ে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের নিচে স্থায়ীভাবে না নামে, তবে সাধারণ মানুষকে ভবিষ্যতে লিটার প্রতি ১০০ টাকার অনেক বেশি দামে জ্বালানি কেনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।



