চলতি মাসের শেষে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণ। নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের। অর্থাৎ আগামী ৪ মে এই বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগণনা হবে না। গত ২৯ এপ্রিল ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ ঘিরে একাধিক গুরুতর অনিয়ম ও অভিযোগ সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট ভোট বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
সূত্রে খবর, আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে নতুন করে ভোটগ্রহণ হবে। ভোট গণনা আগামী ২৪ মে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হল, কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে ‘রিপোল’ নয়, ‘ফ্রেশ পোল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ জাহাঙ্গীরের ফলতায় মধুর ভাণ্ড তৈরি করেছিল সিপিএম!
কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থীর মৃত্যুতে পুনর্নির্বাচন আগেও হয়েছে। অন্যদিকে, অশান্তি বা হিংসার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বুথগুলিতে রিপোল হয়েছে, তবে স্বাধীনতার পর অশান্তির কারণে সমগ্র বিধানসভা কেন্দ্রে নতুন করে ভোটগ্রহণ আগে কখনও দেখা যায়নি। সেক্ষেত্রে কমিশনের এই ফ্রেশ পোলের সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম।
ভোটের দিন একাধিক বুথে ইভিএমের ব্যালট ইউনিটের বোতামে আঠা বা আঁতর লাগানোর অভিযোগ ওঠে, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাব ফেলতে পারে বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি ভোটারদের ভয় দেখানো, বুথ দখল, এবং বুথে অবৈধভাবে রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতির অভিযোগও উঠে আসে।
ভোটের পর ৩০ এপ্রিল ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন সংক্রান্ত নথিপত্রের স্ক্রুটিনি করা হয়। যদিও প্রাথমিকভাবে রিটার্নিং অফিসার ও জেনারেল অবজার্ভার রিপোর্টে ভোট প্রক্রিয়ায় বড় কোনও ব্যাঘাতের কথা উল্লেখ করেননি, পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র।

বিশেষ পর্যবেক্ষক ও জেলা নির্বাচন আধিকারিকের তদন্তে দেখা যায়—
- একাধিক বুথের ভিডিও ফুটেজ অসম্পূর্ণ বা অনুপস্থিত
- কিছু ক্ষেত্রে ভিডিও রেকর্ডিং ইচ্ছাকৃতভাবে গায়েব করা হয়েছে
- ১৩টি বুথের ফুটেজ বিশ্লেষণে বড়সড় অনিয়ম ধরা পড়েছে
- ভোটকক্ষে বারবার অননুমোদিত প্রবেশ
- ভোটারদের উপর চাপ সৃষ্টি ও ভয় দেখানো
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, স্ক্রুটিনির নোটিশ যথাযথভাবে প্রার্থীদের দেওয়া হয়নি এবং শুধুমাত্র ইমেল বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে।
পুলিশ পর্যবেক্ষকের রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু এলাকায় ভয়ের পরিবেশ ছিল এবং অন্তত একটি বুথে ব্যালট ইউনিটে টেপ লাগানোর প্রমাণ মিলেছে, যার ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয়েছে।
সব তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এই কেন্দ্রে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে সম্পূর্ণ ভোট প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন করে ভোটগ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার সকালেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় হাশিমনগর ও সংলগ্ন এলাকায়। অভিযোগ, এলাকায় বিজেপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত পরিবারগুলির বাড়িতে চড়াও হচ্ছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। তাঁদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি মারধরও করা হচ্ছে বলে খবর। এই ঘটনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জাহাঙ্গির-ঘনিষ্ঠ দুই নেতা ইস্রাফুল চোকদার এবং সুজাদ্দিন শেখের নাম। গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, ইস্রাফুলের নেতৃত্বেই একদল যুবক বাইক বাহিনী নিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস চালাচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ফলতা রহস্য! সবচেয়ে বেশি অভিযোগ; তবু নীরব কমিশন
এই অভিযোগ খতিয়ে দেখার পরেই ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত দুই নেতার বিরুদ্ধে অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেয় কমিশন। শুধু তাই নয়, পুলিশ যদি পদক্ষেপ করতে গড়িমসি করে, তবে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সাফ জানিয়ে দেয় কমিশন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিন তৃণমূল কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর সূত্রের।
ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণ নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনকে কটাক্ষ বেলেঘাটার তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষের। তাঁর কথায়, ‘কমিশনের এত বজ্রআঁটুনি নিরাপত্তা ব্যর্থ। ভোটলুট হয়েছে অথচ তাঁরা ধরতে পারলেন না।’ একইসঙ্গে নিশানায় আনেন ডায়মন্ড হারবারের পুলিশ পর্যবেক্ষক ‘সিংঘম’ অজয় পাল শর্মা। তাঁকে সাসপেন্ড করার দাবিও জানালেন কুণাল ঘোষ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুরোটাই নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক উদ্দেশে করেছেন। একই সঙ্গে দাবি করেন, “যতক্ষণে ফলতায় নির্বাচন হবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৩০টি আসন নিয়ে সরকার গড়ে ফেলবেন এবং ফলতাতেও তৃণমূলের প্রার্থীই জয়ী হবেন।”


