২০২৬ সালের গরমকে অনেক মানুষ প্রথমে শুধুই আরেকটা কঠিন গ্রীষ্ম বলে ভেবেছিল। এপ্রিলের শেষ থেকেই দেশের একাধিক শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে উঠতে শুরু করে। দিল্লি, নাগপুর, জয়পুর, ভুবনেশ্বর, পাটনা থেকে কলকাতা— প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই দিনের পর দিন অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হচ্ছিল। কিন্তু আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা তখন অন্য এক বিপদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেই বিপদ মাটির ওপরে নয়, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে তৈরি হচ্ছিল। সমুদ্রের পৃষ্ঠের নিচে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল এক বিশাল উষ্ণ জলের ঢেউ, যাকে বিজ্ঞানীরা “কেলভিন ওয়েভ” বলে চিহ্নিত করেছেন। প্রায় ৯,০০০ মাইল দীর্ঘ এই উষ্ণ স্রোতকে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা— পৃথিবী কি আবার এক “সুপার এল নিনো”-র দিকে এগোচ্ছে?
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা “ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন” বা NOAA-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে সমুদ্রের নিচের জল স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এই সংখ্যা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু সমুদ্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত বড় পরিবর্তন। কারণ সমুদ্রের তাপমাত্রা সামান্য বদলালেও তার প্রভাব বায়ুমণ্ডল, বাতাসের গতি, মেঘের অবস্থান এবং বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে দিতে পারে। আর যখন কয়েক হাজার কিলোমিটার জুড়ে সমুদ্রের গভীরে উষ্ণতা জমতে শুরু করে, তখন তার অভিঘাত গোটা পৃথিবীর আবহাওয়াকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
“এল নিনো” শব্দটি বহু মানুষের কাছে পরিচিত হলেও এর কাজের ধরন এখনও অনেকের অজানা। সাধারণ অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকের জল তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে এবং পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ এশিয়ার কাছাকাছি অঞ্চলে, গরম জল জমা হয়। এই ভারসাম্যের উপর নির্ভর করেই বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টির চক্র তৈরি হয়। কিন্তু কোনো কোনো বছরে সেই ভারসাম্য ভেঙে যায়। গরম জল পূর্ব দিকে সরে যেতে শুরু করে এবং সমুদ্রের বিশাল অংশ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। তখনই তৈরি হয় “এল নিনো” পরিস্থিতি।
এই পরিবর্তন শুধু সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব দেখা যায় ভারতীয় মৌসুমি বৃষ্টিতে, আফ্রিকার খরায়, অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে, দক্ষিণ আমেরিকার অতিবৃষ্টিতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনে। ১৯৯৭-৯৮ সালের ভয়াবহ এল নিনোকে এখনও আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলির মধ্যে ধরা হয়। সেই সময় বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৪,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে, পেরুতে বন্যা হয়, আফ্রিকার একাধিক দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
আরও পড়ুনঃ জারি হল হিট স্ট্রোক নিয়ে সতর্কতা; প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া বাড়ি থেকে না বেরোনোর পরামর্শ
এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সেই সময়ের সঙ্গে ভয়ঙ্কর মিল দেখাচ্ছে। ব্রিটিশ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম স্কেইফ সতর্ক করে বলেছেন, যদি ২০২৬ সালের শেষ দিকে একটি শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়, তাহলে ২০২৭ সালে নতুন বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড তৈরি হতে পারে। কারণ পৃথিবী এখন আর ১৯৯৭ সালের অবস্থায় নেই। গত কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগেই অনেকটা বেড়ে গেছে। তার উপর যদি একটি শক্তিশালী এল নিনো যোগ হয়, তাহলে গরম, আর্দ্রতা এবং চরম আবহাওয়ার মাত্রা আরও তীব্র হতে পারে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি এখনও সরাসরি বর্ষার জলের উপর নির্ভরশীল। ভারতীয় অর্থনীতির বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক হলেও গ্রামীণ বাজার, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ এখনও মৌসুমি বৃষ্টির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জুন থেকে সেপ্টেম্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টি দেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ এনে দেয়। এই বৃষ্টির উপর নির্ভর করে ধান, ডাল, আখ, তুলো, ভুট্টা এবং বহু খরিফ ফসলের চাষ হয়।
সাধারণত এল নিনোর বছরে ভারতের বর্ষা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। প্রতিটি এল নিনো একই রকম নয়, কিন্তু ইতিহাস বলছে শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে কম বৃষ্টির সম্পর্ক বহুবার দেখা গেছে। ২০০২ সালে ভারত বড় ধরনের খরার মুখে পড়েছিল। সেই বছর মৌসুমি বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম হয়েছিল। কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগে। ২০০৯ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। অনেক রাজ্যে জলাধারের স্তর দ্রুত নেমে গিয়েছিল।
এবারের আশঙ্কা শুধু কম বৃষ্টি নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতের এল নিনো আরও অনিয়মিত আচরণ করতে পারে। কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে হঠাৎ কয়েক দিনে অতিবৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ একদিকে খরা, অন্যদিকে বন্যা— দুই বিপরীত পরিস্থিতি একই মৌসুমে দেখা যেতে পারে। এর ফলে কৃষকদের পরিকল্পনা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও সতর্কতার সুর শোনা যাচ্ছে। যদিও বর্ষার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস নিয়মিত বদলাতে পারে, তবুও একাধিক আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেল ইতিমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতার দিকে নজর রাখছে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, সমুদ্রের গভীরে জমে থাকা তাপ অনেক সময় কয়েক মাস পরে উপরের স্তরে উঠে আসে। ফলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়তে পারে কৃষিক্ষেত্রে। ধান চাষের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বৃষ্টি প্রয়োজন। যদি বর্ষা দেরিতে আসে বা মাঝপথে দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে বীজ নষ্ট হতে পারে। অনেক কৃষককে আবার নতুন করে বপন করতে হতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। একইসঙ্গে সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ব্যবহারও বাড়বে। ইতিমধ্যেই ভারতের বহু রাজ্যে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত কমছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলঙ্গানা— বহু জায়গায় জলসংকট আগামী কয়েক বছরে আরও বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গ্রামীণ অর্থনীতির উপর এর প্রভাব আরও গভীর। একটি খারাপ বর্ষা শুধু কৃষকের ক্ষতি করে না। তার প্রভাব পড়ে কৃষিশ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, স্থানীয় পরিবহণ, বাজার এবং গ্রামীণ ক্রয়ক্ষমতার উপর। একটি গ্রামের ফসল ভালো হলে সেই গ্রামের দোকান, পোশাক ব্যবসা, নির্মাণকাজ— সব ক্ষেত্রেই অর্থের চলাচল বাড়ে। কিন্তু ফসল খারাপ হলে পুরো অর্থনৈতিক চক্র ধীরে যেতে শুরু করে।
খাদ্যদ্রব্যের দামও এই পরিস্থিতিতে বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ভারতে খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। যদি ধান, ডাল বা সবজির উৎপাদন কমে যায়, তাহলে বাজারদর দ্রুত বাড়তে পারে। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, দুর্বল বর্ষার পরে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি শহর ও গ্রামের মানুষের উপর সমান চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক খরচে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
আরও পড়ুনঃ ‘অরাজকতা সৃষ্টি করে…,’ ‘সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র’! রাহুলকে তোপ BJP-র
তবে পুরো ছবিটা শুধু অন্ধকার নয়। গত দুই দশকে ভারত কৃষি ও জল ব্যবস্থাপনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি করেছে। বহু এলাকায় মাইক্রো ইরিগেশন বা কম জলে সেচের ব্যবস্থা বেড়েছে। খরা সহনশীল বীজের ব্যবহারও আগের তুলনায় বেশি। বিভিন্ন রাজ্যে জল সংরক্ষণ প্রকল্প চালু হয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় বিপদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ এখন বেশি।
তবুও বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এই সম্ভাব্য “সুপার এল নিনো” এমন এক সময়ে তৈরি হচ্ছে, যখন পৃথিবী আগেই রেকর্ড উষ্ণতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালকে বিশ্বের উষ্ণতম বছরের তালিকায় রাখা হয়েছে। সমুদ্রের গড় তাপমাত্রাও বহু জায়গায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ আগেই তৈরি হয়ে রয়েছে।
এই অতিরিক্ত চাপের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব এখন শহরের সাধারণ জীবনেও চোখে পড়ছে। কয়েক বছর আগেও গরম মানে ছিল অস্বস্তি। এখন গরম মানে বহু জায়গায় স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিদ্যুতের অতিরিক্ত ব্যবহার, জলের সংকট এবং কাজের সময় কমে যাওয়া। ভারতের একাধিক রাজ্যে গত কয়েক বছরে তাপপ্রবাহের সময় বাইরের কাজ সীমিত করতে হয়েছে। নির্মাণ শ্রমিক, রাস্তার বিক্রেতা, ডেলিভারি কর্মী, কৃষিশ্রমিক— যাঁরা দিনের বড় অংশ খোলা আকাশের নিচে কাটান, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, শিল্পযুগের আগের সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই প্রায় ১.৩ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেছে। শুনতে সংখ্যাটা ছোট লাগলেও এর বাস্তব প্রভাব বিশাল। কারণ এই সামান্য গড় বৃদ্ধির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর তাপপ্রবাহ, দীর্ঘ খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টি এবং সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি। ভারত টুডের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের কিছু অংশে গরমের তীব্রতা ইতিমধ্যেই আগের দশকের তুলনায় অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। অনেক শহরে রাতের তাপমাত্রাও আর আগের মতো কমছে না। ফলে মানুষ দিনের পাশাপাশি রাতেও আরাম পাচ্ছে না।
সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টিও এখন বড় উদ্বেগের জায়গা। সাধারণভাবে সমুদ্র পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপের একটি বড় অংশ শোষণ করে নেয়। কিন্তু যখন সেই সমুদ্রই অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হতে শুরু করে, তখন বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি আর্দ্রতা জমা হয়। তার ফলেই কোথাও হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি, কোথাও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, আবার কোথাও দীর্ঘ গরমের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিও এখন বিজ্ঞানীদের নজরে রয়েছে। কারণ বঙ্গোপসাগর উষ্ণ হলে পূর্ব ভারতের আর্দ্রতা এবং অস্বস্তিকর গরম আরও বাড়তে পারে।
কলকাতা, হাওড়া, দুর্গাপুর, আসানসোলের মতো শহরে গত কয়েক বছরে “রিয়েল ফিল” তাপমাত্রা প্রায়ই প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে। অর্থাৎ থার্মোমিটারে ৩৮ ডিগ্রি দেখা গেলেও আর্দ্রতার কারণে শরীরে তা ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি অনুভূত হতে পারে। যদি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে গরমের এই চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদদের একাংশ মনে করছেন।
শুধু আবহাওয়া নয়, বিদ্যুতের চাহিদার উপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। ভারতে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, কুলার এবং পাম্পের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের একাধিক রেকর্ড তৈরি হয়েছিল। যদি আগামী বছরগুলোতে গরম আরও বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহের উপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও ছোট শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
জলসংকটের প্রশ্নটাও এখন ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। নীতি আয়োগের আগের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ভারতের বহু শহর আগামী কয়েক দশকে ভয়াবহ জলের চাপে পড়তে পারে। এল নিনোর বছরে যদি বৃষ্টি কম হয়, তাহলে জলাধার, বাঁধ এবং ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ আরও বাড়বে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং রাজস্থানের বহু এলাকায় আগেও গ্রীষ্মে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে জল সরবরাহ করতে হয়েছে। খারাপ বর্ষা হলে সেই পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রে এর প্রভাব সংখ্যার দিক থেকেও বিশাল। ভারতের প্রায় ৪৫ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। দেশের কোটি কোটি মানুষ মৌসুমি বৃষ্টির উপর নির্ভর করে জীবিকা চালান। যদি বর্ষা দুর্বল হয়, তাহলে শুধু উৎপাদন নয়, গ্রামীণ চাহিদাও কমে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ বাজার দুর্বল হলে তার প্রভাব মোটরবাইক বিক্রি থেকে শুরু করে ছোট গৃহস্থালি পণ্যের বিক্রিতেও দেখা যায়।
আবার একই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেও চাপে ফেলতে পারে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, সবজি— এই মৌলিক জিনিসগুলির দাম সামান্য বাড়লেও মাসিক খরচ দ্রুত বদলে যায়। অতীতে দুর্বল বর্ষার সময় পেঁয়াজ, ডাল এবং টমেটোর দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপরও পড়ে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিজ্ঞানীরা এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারছেন। উপগ্রহ, সমুদ্রের ভাসমান সেন্সর, আবহাওয়া মডেল এবং সুপারকম্পিউটারের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। NOAA, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর এবং বিশ্বের একাধিক গবেষণা কেন্দ্র এখন সমুদ্রের উষ্ণতা, বাতাসের গতি এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণ করছে।
“কেলভিন ওয়েভ” নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার কারণও সেটাই। এই উষ্ণ স্রোত অনেক সময় ভবিষ্যতের এল নিনোর একটি প্রাথমিক সংকেত হিসেবে কাজ করে। সমুদ্রের গভীরে জমে থাকা গরম জল যখন ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে এগিয়ে যায়, তখন কয়েক মাস পরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বাড়তে শুরু করতে পারে। যদিও প্রতিটি কেলভিন ওয়েভ বড় এল নিনো তৈরি করে না, তবুও বর্তমান উষ্ণতার মাত্রা বিজ্ঞানীদের সতর্ক করেছে।
কিছু গবেষক মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতের এল নিনো ঘটনাগুলি আরও অনিয়মিত এবং শক্তিশালী হতে পারে। কারণ পৃথিবীর সমুদ্র ইতিমধ্যেই আগের তুলনায় বেশি উষ্ণ। ফলে এল নিনো তৈরি হলে তার সঙ্গে অতিরিক্ত বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব যুক্ত হয়ে চরম পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ডও সেই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়েছে।
আবার অন্য একদল বিজ্ঞানী সতর্ক করে বলছেন, এখনও নিশ্চিতভাবে “সুপার এল নিনো” ঘোষণা করার সময় আসেনি। আবহাওয়া ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাসের প্রবাহ এবং মৌসুমি পরিবর্তন— সবকিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই আতঙ্ক নয়, বরং প্রস্তুতি এবং সতর্ক পর্যবেক্ষণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দেশজুড়ে জল সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, খরা সহনশীল বীজ, স্থানীয় আবহাওয়া সতর্কতা এবং কৃষকদের আগাম তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বহু রাজ্যে ইতিমধ্যেই জলাধার সংস্কার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং কম জলে চাষের উদ্যোগ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের আবহাওয়া আরও অনিশ্চিত হলে এই ধরনের অভিযোজনই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
কারণ এল নিনো শুধু একটি আবহাওয়ার ঘটনা নয়। এটি এমন একটি পরিবর্তন, যার প্রভাব একই সঙ্গে রান্নাঘরের বাজার, কৃষকের জমি, শহরের বিদ্যুৎ, গ্রামের কাজ, গরমের রাত, জলের লাইন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অনুভূত হতে পারে। আর সেই কারণেই প্রশান্ত মহাসাগরের হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের উষ্ণ জল এখন ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।



