রান্নার গ্যাস নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে কেন্দ্রের সাম্প্রতিক নির্দেশ। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে অন্তত ৩০ দিনের এলপিজি মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের মতো সংস্থাগুলিকে এই মজুত বজায় রাখতে বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে। সরকারি সূত্রের দাবি, দেশে এই মুহূর্তে রান্নার গ্যাসের কোনও ঘাটতি নেই। কিন্তু সেই দাবির মাঝেই কেন অতিরিক্ত মজুতের নির্দেশ দেওয়া হল, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ।
আরও পড়ুনঃ আবার নাটক! ১ মাস পর পথে মমতা; ধরনায় বসছেন রানি রাসমনিতে
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলপিজি ব্যবহারকারী দেশ। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দেশের ভেতরে যত গ্যাস ব্যবহার হয়, তার বড় অংশ বিদেশ থেকে জাহাজে করে আসে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি করে ভারত। ফলে আন্তর্জাতিক সংঘাত, সমুদ্রপথে বাধা, বীমা খরচ বৃদ্ধি বা জাহাজ চলাচলে সমস্যা তৈরি হলে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের রান্নার গ্যাস সরবরাহে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ার পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হতে শুরু করে। সরকারি মহলের বক্তব্য, ভবিষ্যতে কোনও রকম আন্তর্জাতিক অস্থিরতা তৈরি হলে যাতে গৃহস্থের রান্নার গ্যাস সরবরাহে প্রভাব না পড়ে, সেই কারণেই অতিরিক্ত মজুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখন কোনও ঘাটতি না থাকলেও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমস্যার জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের বড় অংশের উদ্বেগ অন্য জায়গায়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও রান্নার গ্যাসের দাম একাধিকবার বেড়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভর্তুকিহীন গৃহস্থালির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। তখনও সরকার বা তেল সংস্থাগুলি কোথাও গ্যাস ঘাটতির কথা বলেনি। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং তেল সংস্থাগুলির ক্ষতি কমানোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ বরখাস্ত বিরূপাক্ষ, ফাইন ২০ লাখ, থ্রেট কালচারে পেরেক পুঁতল সরকার
এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু দেশের মজুত নয়, আরও একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি সিপি নামে পরিচিত এলপিজির নির্ধারিত দর, ডলার তুলনায় টাকার মূল্য, জাহাজ ভাড়া, বীমা খরচ এবং কেন্দ্রীয় ভর্তুকি নীতি সরাসরি প্রভাব ফেলে গ্যাসের দামের উপর। ফলে দেশের গুদামে পর্যাপ্ত গ্যাস থাকলেও ভবিষ্যতে বেশি দামে আমদানি করতে হবে বলে আশঙ্কা তৈরি হলে আগাম দাম বাড়ানো হতে পারে।
বর্তমানে কলকাতায় ১৪.২ কেজির গৃহস্থালির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৮০০ টাকারও বেশি। গত কয়েক বছরে এই দাম একাধিকবার ওঠানামা করেছে। একসময় যে সিলিন্ডারের দাম ৫০০ টাকার আশেপাশে ছিল, তা কয়েক বছরের মধ্যে ১১০০ টাকার কাছাকাছিও পৌঁছেছিল। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কিছুটা মূল্যহ্রাস এবং উজ্জ্বলা প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের জন্য ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু মধ্যবিত্তের বড় অংশ এখনও সম্পূর্ণ বাজারদরেই গ্যাস কিনছে।
আরও পড়ুনঃ অসমেও শুকোল ঘাসফুল! দল থেকে পদত্যাগ অভিজিৎ মজুমদারের
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কয়েক কোটি পরিবার এলপিজি ব্যবহার করে। উজ্জ্বলা প্রকল্প চালুর পর গ্রামাঞ্চলেও রান্নার গ্যাসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই কারণে সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্রতিদিনের রান্না প্রায় সম্পূর্ণভাবে এলপিজি নির্ভর হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহ ও দামের পরিবর্তন এখন সরাসরি সংসারের মাসিক খরচের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের ৩০ দিনের মজুত নির্দেশকে একাংশ নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। আবার অন্য অংশের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে ভবিষ্যতে আরও একবার রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানো হতে পারে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে, দেশে মজুত স্বাভাবিক থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা দেখিয়ে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একাধিকবার।



