পুরো তছনছ তৃণমূল। ভোটের রেজাল্ট বেরনোর দু’মাসও কাটেনি তার আগেই ছাড়খার হয়ে গেল তৃণমূল কংগ্রেস। হয়ে গেল দু’টুকরো। একটি আদি তৃণমূল, অন্যটি হল ‘নব তৃণমূল ব্লক’। আজ থেকে ৬৫/৬৬ বছর আগের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। যদিও তৃণমূল দলটাও একই ভাবে তৈরী হয়েছিল এটা সকলেরই জানা।তবুও আজ বেশি পুরানো একটা স্মৃতি একবার নাড়াচাড়া করা যাক।
আরও পড়ুনঃ পুরো তছনছ তৃণমূল; গঠিত হল ‘নব তৃণমূল ব্লক’, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলা কংগ্রেস (Bangla Congress) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক নাম। এটি মূলত ১৯৬৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ছিল, যা পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা থেকে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র কংগ্রেসী রাজত্বের অবসান ঘটাতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের নীতি, বিশেষ করে খাদ্য আন্দোলনের (Food Movement) সময় প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সরকারের খাদ্যনীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়।এই সময় মেদিনীপুরের অবিসংবাদিত এবং বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অজয় মুখোপাধ্যায় এই অসন্তোষের নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাথে ছিলেন সুশীল কুমার ধারা, প্রণব মুখোপাধ্যায় (যিনি পরে ভারতের রাষ্ট্রপতি হন), সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় এবং এবিএ গণিখান চৌধুরীর মতো তরুণ ও প্রভাবশালী নেতারা। কংগ্রেসের তৎকালীন রাজ্য স্তরের প্রভাবশালী ও রক্ষণশীল গোষ্ঠী (যাদের ‘সিন্ডিকেট’ বলা হতো, বিশেষ করে অতুল্ল্য ঘোষ ও প্রফুল্ল চন্দ্র সেন) এর একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ।১৯৬৬ সালে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস ভেঙে ‘বাংলা কংগ্রেস’ গঠিত হয়। সুশীল কুমার ধারা ছিলেন এই নতুন দলের রাজ্য সম্পাদক। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে মেদিনীপুর, হুগলি, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জোতদার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই দলের গভীর প্রভাব তৈরি হয়। এদের মূল লক্ষ্য ছিল কলকাতার বাইরে মফস্বল ও গ্রামীণ বাংলার উন্নয়ন।
আরও পড়ুনঃ ঋতব্রতের ‘নব তৃণমূল’; মমতাই নেত্রী, তবু ভাঙল দল
যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন ও স্বর্ণযুগ (১৯৬৭ – ১৯৭০)
বাংলা কংগ্রেসের আসল ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিহিত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম অ-কংগ্রেসী জোট বা যুক্তফ্রন্ট সরকার (United Front Government) গঠনে।১৯৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে বাংলা কংগ্রেস কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোর সাথে হাত মেলায়।অজয় মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন।যদিও এই সরকার বেশিদিন টেকেনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের কারণে ১৯৬৭ সালের ২ নভেম্বর এই সরকারের পতন ঘটে।
১৯৬৯ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল আসনে জয়ী হয় এবং আবারও অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই সময়েই তরুণ বাম নেতা জ্যোতি বসু উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বামপন্থীদের সাথে জোট বেঁধে সরকার চালালেও আদর্শগত দিক থেকে বাংলা কংগ্রেস ছিল মূলত কেন্দ্রপন্থী বা নরমপন্থী। ফলে জমি সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বামপন্থীদের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। কমিউনিস্ট নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙার ও বিনয় চৌধুরীদের নেতৃত্বে গ্রামীণ এলাকায় যে তীব্র জমি দখল ও ভূমি সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তা বাংলা কংগ্রেসের সমর্থক গ্রামীণ জোতদার শ্রেণীর স্বার্থে আঘাত হানে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় নিজেই তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে অনশনে বসেন। অবশেষে ১৯৭০ সালের ১৯ মার্চ অজয় মুখোপাধ্যায়ের পদত্যাগের মাধ্যমে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটে।
যুক্তফ্রন্ট ভাঙার পর বাংলা কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে থাকে। ১৯৭১ সালের নির্বাচনে দলটির আসন সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় (মাত্র ১টি লোকসভা ও ৫টি বিধানসভা আসন)।
অবশেষে ১৯৭১ সালের শেষের দিকে, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল বাংলা কংগ্রেস দলটিকে আবার মূল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেরসাথে একীভূত (Merge) করে দেওয়া হয়। তবে সুকুমার রায়ের মতো কিছু অসন্তুষ্ট নেতা এই সংযুক্তিকরণ মেনে না নিয়ে ‘বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেস নামে একটি ছোট দল গঠন করেছিলেন, যা দীর্ঘদিন বামফ্রন্টের অংশ ছিল।
অজয় মুখোপাধ্যায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের এমন একজন মুখ্যমন্ত্রী, যাঁর স্থায়ী বাসস্থান কলকাতার কোনো পোস্টাল অ্যাড্রেসের অধীনে ছিল না। তিনি অবিভক্ত মেদিনীপুরের (তমলুক) মাটির নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।



