দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ আনল কেন্দ্রীয় সরকার। দিল্লি হাইকোর্টে জমা দেওয়া এক হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, টেলিগ্রাম বর্তমানে ‘নতুন ডার্ক ওয়েব’-এ পরিণত হয়েছে। নিয়মবিরুদ্ধ যাবতীয় চক্রান্ত করতে দুষ্কৃতীরা এই অ্যাপকেই বেছে নিচ্ছে বারবার। এমনকী, বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, সাইবার ক্রাইম, জঙ্গি গোষ্ঠী ও অন্যান্য ক্ষতিকর চক্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নজর এড়াতে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলের ‘বাঁ কান’ ‘বিশ্বাস’ পিঠ বাঁচাতেই ‘বিশ্বাস’ ভাঙলেন মমতার?
জানা গিয়েছে, টেলিগ্রামের বেশ কয়েকটি চ্যানেল ও কনটেন্টের বিরুদ্ধে সরকারি পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলায় এই হলফনামা জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায় সরকার দাবি করেছে, গোপনীয়তা ও পরিচয় গোপনের সুবিধার কারণে টেলিগ্রাম অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রের অভিযোগ, টেলিগ্রাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের বেআইনি কাজ চলছে। নিটের মতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, সাইবার ক্রাইম, সন্ত্রাসবাদী প্রচার, যৌন নির্যাতনমূলক অপরাধ ছড়ানো, মাদক পাচার, আর্থিক অপরাধ এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য টেলিগ্রাম একটি অন্যতম প্ল্যাটফর্মে পরিণতি হয়েছে। হলফনামায় কেন্দ্র বলেছে, ‘টেলিগ্রাম নতুন ডার্ক ওয়েবের মতো হয়ে উঠেছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সমাজবিরোধী গোষ্ঠী একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। অপরাধীরা দ্রুত টেলিগ্রাম ব্যবহার করে এমন লিঙ্ক ছড়াচ্ছে, যা ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েব ফোরামের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাদের পরিচয় যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
হলফনামায় কেন্দ্র দাবি করেছে, টেলিগ্রামে পরিচয় গোপন রাখার সুবিধাই একে অপরাধী চক্রের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কেন্দ্রের মতে, ইউজাররা প্রাইভেসি সেটিংসের মাধ্যমে ফোন নম্বর ও টেলিগ্রাম আইডির মতো তথ্য গোপন রাখতে পারেন। ফলে তদন্তকারীদের পক্ষে অ্যাকাউন্টগুলোর নেপথ্যে থাকা প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। হলফনামায় বলা হয়েছে, ‘দেখা গেছে যে, প্রধানত গোপনীয়তা সুবিধার কারণে টেলিগ্রামকে মাদক পাচার, সাইবার ক্রাইম, সন্ত্রাসবাদ, শিশু নির্যাতন এবং সাইবার কেলেঙ্কারি ও প্রতারণা-সহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য অপব্যবহার করা হচ্ছে।’ কেন্দ্র আরও যুক্তি দিয়েছে যে টেলিগ্রামের গঠনপ্রণালীই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির জন্য উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা দিল্লি হাইকোর্টকে জানান যে, টেলিগ্রামের ক্লাউড-ভিত্তিক কাঠামো এবং প্রাইভেসি সেটিংসের কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপের সন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি টেলিগ্রামের গোপনীয়তা নীতির দিকেও ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে কোনও অ্যাকাউন্ট মুছে ফেললে তার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বার্তা, মিডিয়া এবং সংরক্ষিত ডেটাও মুছে যায়। কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, টেলিগ্রাম চ্যানেল ও গ্রুপে দুষ্কৃতী ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রচারমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। সরকারের বক্তব্য, এই ধরনের কনটেন্ট ভুয়ো তথ্য ছড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগ।
আরও পড়ুনঃ সরগরম শিলিগুড়ি; মেয়র পদ ছাড়ছেন গৌতম দেব!
হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির উপর নজরদারি চালানো সংস্থাগুলির কাছে এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। হলফনামায় আরও বলা হয়েছে, টেলিগ্রাম সাইবার ক্রাইমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ভুয়ো পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করে প্রতারকরা আর্থিক জালিয়াতি, তথ্য চুরি করছে বলে অভিযোগ করেছে কেন্দ্র। সরকার জানিয়েছে, টেলিগ্রামকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে সাইবার প্রতারণার অভিযোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে সাম্প্রতিক কালে। কেন্দ্র আরও অভিযোগ করেছে, টেলিগ্রাম চ্যানেলে মিউল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কেনাবেচা চলছে। যেগুলি অনেক সময় বেআইনি ভাবে অর্থ পাচারে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হলফনামায় বলা হয়েছে, কিছু ক্ষতিকর অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ টেলিগ্রামকে ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের তথ্য ও ডিভাইস সংক্রান্ত তথ্য চুরি করছে। পাশাপাশি, কিছু চ্যানেলে ম্যালওয়্যার পরিষেবা, গুগল প্লে প্রোটেক্ট এড়ানোর টুল এবং আর্থিক অ্যাপের ছদ্মবেশে তৈরি ক্ষতিকর অ্যাপের প্রচারের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, কিছু টেলিগ্রাম বটের মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য-যেমন মোবাইল নম্বর, আধার তথ্য এবং বিভিন্ন ফাঁস হওয়া ডেটাবেসের তথ্য অবৈধভাবে অ্যাক্সেস করার অভিযোগ রয়েছে। সাইবার অপরাধ ছাড়াও টেলিগ্রাম চ্যানেলে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ ও অন্যান্য কপিরাইটযুক্ত কনটেন্ট পাইরেসির মাধ্যমে ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে কেন্দ্র। এর ফলে নির্মাতা ও কনটেন্ট সৃষ্টিকারীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।


