১৯৯৩ সালের কলকাতার বউবাজার বিস্ফোরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত মহম্মদ রশিদ খানের মুক্তির নির্দেশে স্থগিতাদেশ জারি সুপ্রিম কোর্টের। দিল্লি হাইকোর্ট গত ৫ জুন রশিদের সাজা মকুব করে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিলেও, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে সেই নির্দেশে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। বিচারপতি পিকে মিশ্র এবং বিচারপতি সঞ্জীব সচদেবার ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, মামলাটি বিচারাধীন অবস্থায় রশিদ খানকে মুক্তি দিলে রাজ্য সরকারের আপিল কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে। তাই পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তিনি জেলেই থাকবেন। আগামী ২৮ জুলাই হবে এই মামলার পরবর্তী শুনানি।

কে এই রশিদ খান?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, রশিদ খান ছিলেন ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বউবাজার বিস্ফোরণের ‘মাস্টারমাইন্ড’। তদন্তে উঠে আসে, বাবরি মসজিদ ভাঙার পর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আবহে কলকাতায় হিন্দুদের লক্ষ্য করে বিস্ফোরক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, মুসলিম যুবকদের দিয়ে বোমা তৈরি করিয়ে কলকাতায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই বোমা তৈরির গোপন কারখানায় দুর্ঘটনাবশত বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ৬৯ জনের মৃত্যু হয় এবং জখম হন অন্তত ৪৬ জন। কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় মধ্য কলকাতার একাধিক বহুতল।
আরও পড়ুনঃ কলকাতা মেট্রোর বেনজির ঘটনা; মেট্রোর লাইনে নেমে প্লাটফর্ম বদলাচ্ছেন মহিলা
সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের যুক্তি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু আদালতে যুক্তি দেন, এত বড় মাপের বিস্ফোরণ এবং ব্যাপক প্রাণহানির মামলায় শুধুমাত্র ‘সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থা’র ভিত্তিতে মুক্তি দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও জানান, রাজ্যের সেনটেন্স রিভিউ বোর্ড শেষ পর্যন্ত রশিদ খানের অকালমুক্তির বিরোধিতা করেছিল। এদিকে, রশিদের আইনজীবী এমআর শামশাদ জানান, তার মক্কেল ৩৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি। বর্তমানে তাঁর বয়স প্রায় ৭৭। তিনি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং জেলে তাঁর আচরণও ছিল অত্যন্ত ভালো। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য মন্তব্য করে, রশিদ খান সাধারণ কোনও অভিযুক্ত নন, বরং গোটা ষড়যন্ত্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’। আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, তাঁর অপরাধের চরিত্র ছিল ‘প্রায় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সমতুল’।
কেন মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি হাইকোর্ট?
গত ৫ জুন বিচারপতি নীনা বনসল কৃষ্ণার একক বেঞ্চ রশিদের আবেদন মঞ্জুর করে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেয়। দিল্লি হাইকোর্ট স্বীকার করেছিল, বউবাজার বিস্ফোরণ সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, এবং এটি কোনও ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল না। আদালতের মতে, অবশ্য অপরাধের গুরুত্বই একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না যার কারণে কোনও বন্দিকে রিমিশন থেকে বঞ্চিত করা হবে।আদালত উল্লেখ করে, রশিদ খানের বিরুদ্ধে জেলের ভেতরে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার রেকর্ড নেই। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের সুপারিন্টেনডেন্টের দেওয়া চরিত্রগত শংসাপত্রে তাঁর আচরণকে ‘অত্যন্ত ভালো’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি ৯৩ দিন প্যারোলে বাইরে থেকেও নির্ধারিত সময়ে জেলে ফিরে এসেছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠেনি।
স্বাস্থ্যগত কারণও বিবেচনায়
দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়, রশিদ খান ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী বিপাকীয় রোগ, প্রস্টেটের সমস্যা, ছানি-সহ একাধিক বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত। আদালতের মতে, এত দীর্ঘ সময় কারাবাসের পর তাঁর পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাই ৩৩ বছরের বেশি সময় ধরে জেলে রাখার আর কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

রশিদের মুক্তির সুপারিশ করেছিল মমতার সরকার!
রশিদের মুক্তি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০০৭ সালেই তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁর অকালমুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। ২০১৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ স্টেট সেনটেন্স রিভিউ বোর্ডও তাঁর মুক্তির সুপারিশ করে। সেই সময় বোর্ড বন্দির বয়স, স্বাস্থ্য, জেলের আচরণ, পুনর্বাসনের সম্ভাবনা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পুনরায় অপরাধ করার ঝুঁকি-সহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করেছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টে চলা ভি শ্রীহরণ মামলার কারণে রাজ্য সরকার সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেনি। কারণ তখন কেন্দ্রীয় আইনে দণ্ডিত বন্দিদের রিমিশন (সাজা মকুব) দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
কেন বদলে গেল মমতা সরকারের অবস্থান?
২০১৭ এবং ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ স্টেট সেনটেন্স রিভিউ বোর্ড ফের রশিদের রিমিশনের আবেদন খারিজ করে দেয়। কলকাতা পুলিশের আপত্তির ভিত্তিতে বোর্ড জানায়, অপরাধের গুরুত্ব, সামাজিক প্রভাব এবং বিস্ফোরণে রশিদের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে নেতিবাচক সুপারিশ পাঠায়। কেন্দ্রও জাতীয় নিরাপত্তা এবং টাডা আইনে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর মুক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তবে দিল্লি হাইকোর্ট পরে পর্যবেক্ষণে জানায়, ২০১৫ সালে মুক্তির সুপারিশ করার পর রশিদের বিরুদ্ধে নতুন কোনও নেতিবাচক তথ্য বা অসদাচরণের অভিযোগ ওঠেনি। ফলে পরবর্তী সিদ্ধান্তকে আদালত ‘পরিবর্তিত অবস্থান’ বলে উল্লেখ করে।
বউবাজার বিস্ফোরণ
১৯৯৩ সালের ১৬ মার্চের রাত। মধ্য কলকাতার বউবাজার এলাকার বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের একটি ভবনে আচমকা ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রথমে একে দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও, পরে তদন্তে জানা যায়, বিস্ফোরক তৈরির একটি গোপন কারখানার অস্তিত্ব।তদন্তকারীদের দাবি, রশিদের নির্দেশেই তাঁর সহযোগী মহম্মদ খালিদ নাইট্রোগ্লিসারিন-সহ বিভিন্ন রাসায়নিক সংগ্রহ করতেন। সেই উপকরণ দিয়ে বোমা ও গ্রেনেড তৈরি করা হচ্ছিল। রশিদ পরিচালিত অবৈধ সাট্টার আড্ডাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হত। গভীর রাত পর্যন্ত চলা কার্যকলাপের সুযোগে বিস্ফোরক আনা-নেওয়া এবং বোমা তৈরির কাজ চলত। অভিযোগ, এগুলি ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসমূলক হামলায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল। কিন্তু বিস্ফোরক মজুত এবং বোমা তৈরির সময় অসাবধানতাবশত পুরো কারখানাটিই উড়ে যায়।
হতাহত, ধ্বংস একাধিক ভবন
বিস্ফোরণের অভিঘাতে কেঁপে ওঠে গোটা তল্লাট। দুটি বহুতল ভবন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আশপাশের আরও বেশ কয়েকটি বাড়ি। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ঘটনায় ৬৯ জনের মৃত্যু হয়, জখম হন অন্তত ৪৬ জন। উদ্ধারকাজে নেমেছিল পুলিশ, দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। সরু রাস্তা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধার অভিযান হয়ে পড়েছিল অত্যন্ত কঠিন।
আরও পড়ুনঃ আসিম মুনিরকে হত্যার ছক? বিস্ফোরক দাবি
বোমা কারখানা
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ, তার, রাসায়নিক উপাদান এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো করে। পরে মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা, বিস্ফোরক আইন এবং টাডা (TADA)-এর একাধিক ধারা যুক্ত করা হয়।প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, রশিদ খান প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তিনি মুসলিম সহযোগীদের মাধ্যমে কলকাতার হিন্দুদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে চান। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে তুলে ধরা হয়। শেষমেশ ২০০১ সালে বিশেষ টাডা আদালত রশিদ ও তাঁর সহযোগীদের দোষী সাব্যস্ত করে। পরবর্তী কালে সুপ্রিম কোর্টও সেই সাজাই বহাল রাখে।

অতঃকিম?
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূল প্রশ্ন হল, ৬৯ জনের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে বিবেচিত এবং বিস্ফোরণ চক্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত একজন টাডা দণ্ডিতকে ৩৩ বছরের কারাবাসের পর রিমিশন দেওয়া কতটা আইনসঙ্গত এবং যুক্তিযুক্ত। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কারাগারেই থাকবেন রশিদ। আগামী ২৮ জুলাইয়ের শুনানির দিকে নজর থাকবে আইনজ্ঞ, রাজনৈতিক মহল এবং বউবাজার বিস্ফোরণের নিহতদের পরিবারগুলির।


