Tuesday, 7 July, 2026
7 July
HomeদেশShyama Prasad Mukherjee: শ্যামাপ্রসাদের জনসংঘ; হিন্দু রাষ্ট্র নয় বরং তোষণহীন সার্বজনীন সাম্যতা...

Shyama Prasad Mukherjee: শ্যামাপ্রসাদের জনসংঘ; হিন্দু রাষ্ট্র নয় বরং তোষণহীন সার্বজনীন সাম্যতা আর নেতাজির লড়াকু প্রেরণা নিয়ে যাত্রা শুরু

১৯৪৮ সালের ৩০ শে জানুয়ারি নাথুরাম গডসে নামক এক হিন্দু মহাসভা ঘনিষ্ঠ ও আরএসএস ঘনিষ্ঠ হিন্দুর সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্তে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার ঘটনায় ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

দিল্লি চুক্তির প্রতিবাদে  ১৯৫০ সালের ছয় এপ্রিল  শ্যামাপ্রসাদ নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর বেশ কয়েকদিন সংসদে একের পর এক তথ্য ও যুক্তিপূর্ণ ভাষণে তিনি নেহেরু সরকারকে প্রবল ভাবে আক্রমণ করতে শুরু করেন. সেই সময়ে ১৯শে এপ্রিল  সংসদে এক জ্বালাময়ী ভাষণের পর সেদিনই বিকেলে  দিল্লিতে আরএসএসের এক মঞ্চে তাকে সম্বর্ধনা জানানো হয়। সেই সংবর্ধনা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির আর এস এস-এর প্রধান হংসরাজ গুপ্ত ,বিশিষ্ট আরএসএস নেতা বসন্ত কৃষ্ণ ওক্ ,পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর লালা  যোধরাজ সহ অসংখ্য আরএসএস-এর প্রধান নেতারা।

সেদিনই এটা ছবির মত পরিষ্কার হয়ে যায় যে ভারতের রাজনীতিতে এমন কিছু একটা ঘটতে চলেছে যেটা তখনও পর্যন্ত অভাবনীয়। অর্থাৎ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অথবা আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায় জওহরলাল নেহেরু ঘরানার রাজনীতির বিরুদ্ধে এবার সত্যি সত্যি একটি দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী দল কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।

এই সময়টা অবশ্য অন্য দিক থেকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারতের হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তা বাদী সংগঠন গুলোর জন্য। রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভা এবং অরাজনৈতিক হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে এই দুটি সংগঠনই তখন চরমতম দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৪৮ সালের ৩০ শে জানুয়ারি নাথুরাম গডসে নামক এক হিন্দু মহাসভা ঘনিষ্ঠ ও আরএসএস ঘনিষ্ঠ হিন্দুর সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্তে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার ঘটনায় ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান এক ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় বিনায়ক সাভারকারকে. নিষিদ্ধ করা হয় হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস কে. কিছুদিন পরে গ্রেপ্তার হন আরএসএস-এর প্রধান সঙ্গ চালক মাধব  সদাশিব গোলওয়ালকার।

সরদার প্যাটেলকে অতি কষ্টে রাজি করিয়ে এবং “ভবিষ্যতে আরএসএস কোনো রাজনীতিতে অংশ নেবেনা ” এরকম নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গোলওয়ালকার  কোনরকমে জেল থেকে নিজেকে মুক্ত করেন এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক সুযোগ উপস্থিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।

হিন্দু মহাসভার নেতা সাভারকারের মতো আধুনিক মনস্ক, কুসংস্কারহীন, প্রবল যুক্তিবাদী মানুষের সাথে কোনদিন কোন  এই আর এসের সংগঠনটির কোনরকম আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না। যে সাভারকর অস্পৃশ্যতার বিরোধী, কুসংস্কারের বিরোধী ,গরুকে মা বলে পূজো করার বিরোধী এবং হিন্দুর নিরামিষ  আহারের অভ্যাসকে বিদ্রুপ করতে অভ্যস্ত সেই সাভারকরের সঙ্গে আর এস এস এর গোল ওয়ালকারের যে কোন  রাজনৈতিক মিলন হতে পারে না সেটা ১৯৪০ সাল থেকেই থেকেই স্পষ্ট ছিল। 

তাছাড়া সেই সময় সাভারকার ক্রমশ অতি অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ছেন এবং নানা রাজনৈতিক হতাশায় ক্রমশ নিজেকে গণসংগঠন থেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন। যে সময় সাভারকর গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রে গ্রেপ্তার হন সেই সময়ে হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ স্বয়ং নেহেরু মন্ত্রিসভায় এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সেই প্রবল অস্বস্তিজনক অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য শ্যামাপ্রসাদ সুযোগ খুঁজছিলেন।

আরও পড়ুনঃ PM-কে আকাশ থেকে স্বাগত জানাল একাধিক যুদ্ধবিমান; ইন্দোনেশিয়া পৌঁছলেন মোদী

এরই মধ্যে হিন্দু মহাসভা কে সকল ভারতীয়দের জন্য উন্মুক্ত একটি রাজনৈতিক দল তৈরির প্রস্তাবে তার সঙ্গে সাভারকার পন্থীদের পার্টির মধ্যেই বিরোধ শুরু হয়ে গেছে। শ্যামাপ্রসাদ চেয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী মুসলমানরা হিন্দু মহাসভায় যোগদান করুক। বলাই বাহুল্য এইসব প্রস্তাবে পার্টির মধ্যেই শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে নানা  নেতৃত্বের বিবাদ আগেই শুরু হয়ে গেছিল. সুযোগ বুঝে শ্যামাপ্রসাদ খুব নীরবে হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করেন। 

৬ এপ্রিল ১৯৫০ সালে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে এবার শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার বাইরে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করবেন যেটি স্বাধীন ভারতের প্রথম রাজনৈতিক দল হবে যা চ্যালেঞ্জ করবে কংগ্রেসকে। অন্যদিকে আরএসএসের আশা ছিল যে প্যাটেলের নেতৃত্বে কংগ্রেসে ভাঙ্গন হবেই এবং সেটাই হবে ভারতে প্রথম কংগ্রেস বিরোধী একটি বিরাট রাজনৈতিক শক্তি। 

সুতরাং ১৯৫০ সালের এপ্রিলে শ্যামাপ্রসাদের পদত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে আরএসএস তার সর্ব শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর  এস এস সংগঠনটির সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের যোগাযোগ ১৯৪০ সালে যখন তিনি কলকাতার দিনেন্দ্র স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত বাংলার আরএসএসের একটি শাখায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। ওই একই বছরে হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে তিনি লাহোরে একটি আরএসএস এর অনুষ্ঠানে গিয়ে সংগঠনটির শৃঙ্খলা পরায়নতা এবং দেশপ্রেম ইত্যাদি দেখে যথেষ্ট অভিভূত হয়েছিলেন।

এর মধ্যে কলকাতায় ফিরে এসে শ্যামাপ্রসাদ বিপুল সংবর্ধনা পান যদিও তখনও তিনি নিজে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করার ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন। ১৯৫০ সালের বাকি সময়ে দুটো বড় ঘটনা ঘটলো। একটি ঘটলো ১৫ ই ডিসেম্বর যেদিন আকস্মিকভাবে মারা গেলেন সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল কিন্তু তার আগেই কলকাতার কর্নওয়ালিস  স্ট্রিটের একটি বাড়ির তিন তলার ঘরে শ্যামাপ্রসাদ এবং গোলওয়ালকারের একটি বৈঠক হয় এবং সেই বৈঠকে গোলওয়ালকার সরাসরি শ্যামাপ্রসাদ কে একটি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার প্রস্তাব দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় আছে হিন্দিতে অপটু শ্যামাপ্রসাদ সেদিন প্রথমে গোল ওয়ালকারের সাথে হিন্দিতেই কথা বলা শুরু করেছিলেন কিন্তু বাংলায় অতি দক্ষ গোল ওয়ালকার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে ঝরঝরে বাংলাতেই কথা চালিয়েছিলেন। একটি নতুন কংগ্রেস বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন তৈরীর স্বার্থে সেদিনই গোলওয়ালকার পরিষ্কার করে দেন যে শ্যামাপ্রসাদকে শুধু নেতৃত্ব এবং উন্নত মানের মানুষকে সংগঠনে টেনে আনতে হবে। সংগঠন তৈরি করার জন্য কর্মী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান পিছন থেকে দেবে আরএসএস।

সেদিনই গোলওয়ালকার  তার চারজন অতি বিশ্বস্ত এবং দক্ষ আরএসএস কর্মীকে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য নির্বাচিত করেন। এদের মধ্যে তিন জন হলেন দীনদয়াল উপাধ্যায়, নানাজি দেশমুখ এবং সুন্দর সিং ভান্ডারী। চতুর্থ ব্যক্তিকে শ্যামাপ্রসাদের সেক্রেটারি হিসাবে নিয়োজিত করা হয়। সেই ব্যক্তিটির নাম অটল বিহারী বাজপেয়ী।

শ্যামাপ্রসাদ প্রথমে ঠিক করেছিলেন দলটির নাম হবে অল ইন্ডিয়া পিপলস পার্টি অথবা ইয়ং ইন্ডিয়া পার্টি তবে আরএসএসের দাবি ছিল দলটির নাম হতে হবে ভারতীয় ভাষায় বিশেষ করে উত্তর ভারতের সহজে উচ্চারিত হতে পারে এমন একটি নামে। প্রথমে ভারতীয় লোক সংঘ নামটি নির্বাচিত হলেও পরে নামটি পরিবর্তন করে ভারতীয় জনসংঘ রাখা হয়।

এর পরের কয়েক মাস নানা প্রদেশে প্রাদেশিক ভারতীয় জনসংঘ গঠিত হওয়ার পর অবশেষে ১৯৫১ সালের একুশে অক্টোবর পুরনো দিল্লির রাঘোমল আর্যকন্যা বিদ্যালয়ে জাতীয় স্তরে স্বাধীন ভারতের প্রথম দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রীয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভারতীয় জন সংঘ।

স্বাধীন ভারতে সেই প্রথম একজন বাঙালির হাতে জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল। এখন প্রশ্ন হল হিন্দু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সংকল্পে নিবেদিত আরএসএসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তৈরি এই দলটি কি শ্যামাপ্রসাদের হাতে একটি হিন্দু রাষ্ট্রবাদী দল হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ?

এটা বুঝতে গেলে দুটো জিনিস পর্যালোচনা করা ভীষণ প্রয়োজন –  একটি হলো সেদিন সভাপতি ভাষনে শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য এবং এই ঘটনার মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনসংঘের ম্যানিফেস্টো।

সত্যিই কি শ্যামাপ্রসাদ এবং তার সহযোগীরা সেদিন অন্ধভাবে গ্রহণ করেছিলেন নাগপুরের নির্দেশ নাকি নাগপুর থেকে যাবতীয় সংগঠনিক সাহায্য নেওয়ার পরেও শ্যামাপ্রসাদের মত বিরাট মাপের রাজনৈতিক নেতা ভারতীয় জন সংঘকে ভারতীয় সংস্কৃতির আত্মার কাছাকাছি এনেই তৈরি করেছিলেন ?

সেদিন উপস্থিত প্রায় তিন হাজার সর্বভারতীয় সদস্যের সামনে জনসংঘের প্রথম সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তার ভাষণ দিয়েছিলেন হিন্দিতে। তিনি প্রথমেই পরিষ্কার করে দেন যে রাজনৈতিক দলটি আজ আত্মপ্রকাশ করল সেই দলটির ধর্ম, বর্ণ ,জাতি নির্বিশেষে প্রত্যেকটি ভারতীয় নাগরিকের রাজনৈতিক আশ্রয় এবং একই সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ পরিষ্কার করে দিলেন যে এই দলটি কংগ্রেসের দেশবিরোধী নীতিকেই আক্রমণ করবে।

শ্যামাপ্রসাদের ভাষণে উল্লেখিত হল যে কোন জনসংঘের সদস্য যেন কখনো জহরলাল নেহেরুকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে –  শুধু তাই নয় তিনি রাষ্ট্র গঠনে জওহরলাল নেহেরুর অবদানকে স্মরণ করার কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুনঃ অমানবিক নিষ্ঠুরতা ও জলে ডুবিয়ে মারার প্রমাণ, ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকা; বারুইপুর কান্ডে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে

নতুন প্রতিষ্ঠিত দলটি যে কংগ্রেসের ব্যর্থ রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন করবে এবং একটি বিকল্প রাষ্ট্রনীতির প্রয়োগে এই দেশ চালাবে একথা বারবার শ্যামাপ্রসাদ তার ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন। পরের দিন ২২ শে অক্টোবর ১৯৫১ The Times of India পত্রিকায় শ্যামাপ্রসাদকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছিল, ”  Nehru Government was seeking to gag all those who sought to ventilate the prople’s grievances. The Congress had lost the support of the people and was therefore attempting to perpetuate its rule by stifling all oppositions”.

তার পুরো ভাষণে কোথাও একটি বারের জন্য হিন্দু রাষ্ট্র শব্দটির উল্লেখ না করে শ্যামাপ্রসাদ পরিষ্কার করে দেন যে এই নতুন দল একটি কোন বিশেষ শ্রেণীর হাতে সম্পদের একত্রীকরণের বিরোধী এবং এই দল বিশ্বাস করে শিল্পায়নের সঙ্গে দেশীয় গ্রামীন শিল্পের একই গতির প্রগতিতে।

একইসঙ্গে এই কথা উল্লেখ করতে শ্যামাপ্রসাদ বিস্মৃত হননি যে এই নতুন দল নেহেরু সরকারের কাশ্মীর নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী এবং কাশ্মীর রাজ্যটির সম্পূর্ণরূপে বাকি ভারতের সঙ্গে একাত্মকরণ এই দলটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

শ্যামাপ্রসাদ তার ভাষণে বারবার “ভারতীয় সংস্কৃতি” এবং “ভারতীয় মর্যাদা” কথাটির উল্লেখ করেছিলেন –  তিনি দেশের প্রতিটি হিন্দু, মুসলমান ,খ্রিস্টান, শিখ ও বৌদ্ধ ভাই বোনদের এদেশের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের  উত্তরাধিকার বহনের জন্য গর্বিত হওয়ার আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে এটিও মনে করিয়ে দেন যে সময়ের সঙ্গে আধুনিক এবং উপযুক্ত হওয়ার স্বার্থে প্রয়োজনে সেই ঐতিহ্য ভাবনারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

শ্যামাপ্রসাদ উল্লেখ করেন যে এই দেশ যদিও বহু বর্ণ ,ধর্ম ,ভাষা ও নানা বিধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবধারায় বিভক্ত তবুও  একক দেশপ্রেমের  আনুগত্য ,অনুভূতি  এই মাতৃভূমি তাদের থেকে দাবি করে।

মনে রাখা দরকার জাতীয় মঞ্চে ভারতীয় জন সংঘ আত্মপ্রকাশ করবার আগেই নেহেরু একাধিক স্থানে এই রাজনৈতিক সংগঠনটিকে চরম সাম্প্রদায়িক বলে অভিহিত করতে শুরু করেছিলেন। 

শ্যামাপ্রসাদ তার ভাষণে এবার সেই রাজনৈতিক জহরলাল নেহেরুকে আক্রমণ করে বলেন যে কোন সংগঠন সাম্প্রদায়িক সেটা জহরলাল নেহেরুর কথায় নির্ধারিত হবে না। শ্যামাপ্রসাদের মতে এদেশে সব থেকে বড় সাম্প্রদায়িকতা হলো জহরলাল নেহেরুর ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মুসলমান তোষণ এবং নানা বিষয়ে পাকিস্তানের সামনে নতজানু হওয়া. এসবের পেছনেই যে মুসলমান ভোটের লোভ সে কথা উল্লিখিত হয় শ্যামাপ্রসাদের ভাষণে। “The great task of revitalizing and restructuring Bharat awaits us ‘ – এটাই যে তার নতুন রাজনৈতিক দলের প্রধান কর্তব্য সেটা উল্লেখ করেন শ্যামাপ্রসাদ।

সেদিন সন্ধ্যায় পুরনো দিল্লির শিবগঞ্জ গুরুদ্বারের কাছে গান্ধী ময়দানে একটি বিশাল জনসভায় আবার বক্তৃতা করেন শ্যামাপ্রসাদ। সেদিনের তারিখ অর্থাৎ একুশে অক্টোবর দিনটি মনে করিয়ে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদ জনগণকে বলেন যে এই একই দিনে ১৯৪৩ সালে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আজাদ হিন্দ সরকার। শ্যামাপ্রসাদ আশা প্রকাশ করেন ভারতীয় জনসংঘের কর্মীরা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির লড়াকু ঐতিহ্যকে বহন করে চলবে. এর কয়েক  মাস পরেই প্রথম ভারতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে শ্যামাপ্রসাদের ভারতীয় জনসংঘ দিল্লির লালকেল্লার নাম সুভাষচন্দ্র বসুর নামে রাখার দাবি করেছিলেন। যদিও নেহেরু সরকার সেই দাবীতে কর্ণপাত করেননি।

ওই একই দিনে প্রকাশিত হয়েছিল ভারতীয় জনসংঘের আগামী নির্বাচনের ম্যানুফেস্ট। এই ম্যানুফেস্ট প্রস্তুত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে একটা বিশেষ দল। শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত আহবানে সারা ভারতবর্ষের  শিক্ষা জগতের অনেক  মানুষ জনসংঘের এই প্রথম ম্যানিফেস্টোতে তাদের মতামত জানিয়েছিলেন।

এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলার বিখ্যাত সাংবাদিক হেমেন্দ্রকুমার ঘোষ এবং পুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর এম আর জয়াকার। ডক্টর জয়াকারের  পরামর্শ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ এই ম্যানুফেস্টকে এমন ভাবে প্রস্তুত করেছিলেন যে সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই তার নতুন রাজনৈতিক দলটিকে হিন্দু মহাসভারই আরেকটি সংস্করণ মনে না করেন।

এই ম্যানুফেস্টও কোথাও হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা কোনোভাবে উল্লেখিত ছিল না। বরং একথা পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল যে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রভাবনা ভারতের চরিত্র বিরোধী, একইসঙ্গে বলা ছিল যে জনসংঘের মূলনীতি হল এক দেশ ,এক জাতি ,এক সংস্কৃতি এবং অবশ্যই সারাদেশে একই আইনের শাসন।

নেহেরুর কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিকে “মুসলিম তোষণ নীতি ঘোষণা করে” এই ম্যানুফেস্ট ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের বাইরে এমন একটি তৃতীয় বিকল্পের কথা বলেছিল যেখানে বিভিন্ন ,ধর্মের বিভিন্ন ভাষা ভাষী প্রতিটি স্ত্রী ও পুরুষ  ঐক্য ,স্বাধীনতা ও সম্ভাবনার পরিমণ্ডলে আইনের শাসনে বসবাস করতে পারবেন।

জনসংঘ তৈরি করার মাত্র  দু বছরেরও কম সময়ের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মারা যান। এরপর কীভাবে তার দল সারা ভারতে বিবর্তিত হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত নাম পরিবর্তন করে পাল্টে দিয়েছিল স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক গতিধারা সেটা তিনি আর দেখে যেতে পারেননি। তাই তার ধারণার ভারতীয়  জনসংঘ শেষ পর্যন্ত তার ধারণাতেই আবদ্ধ ছিল কিনা সেটা তার পক্ষে আর মূল্যায়ন করাও সম্ভব হয়নি।

 

 

 

 

 

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন