Thursday, 16 July, 2026
16 July
HomeদেশRatha Yatra: আজও গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে! রথযাত্রা মানেই কি শুধু জগন্নাথদেবের রথ...

Ratha Yatra: আজও গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে! রথযাত্রা মানেই কি শুধু জগন্নাথদেবের রথ টানা?

ঔপনিবেশিক বিবরণ থেকেই ইংরেজি ভাষায় ‘জাগারনট’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। এটি ‘জগন্নাথ’ নামেরই ইংরেজি রূপান্তর।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

রথযাত্রা মানেই কি শুধু জগন্নাথদেবের রথ টানা? নাকি এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, আদিবাসী উপাসনার ছাপ, রাজাদের অবদান এবং এমন কিছু রহস্য, যা আজও গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে? নীলমাধব থেকে জগন্নাথ, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন থেকে বিশ্বকর্মার অসমাপ্ত মূর্তি, গুণ্ডিচা যাত্রা থেকে নবকলেবর—রথযাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অনন্য মেলবন্ধন।

কেন প্রতি বছর নতুন রথ তৈরি হয়? কেন জগন্নাথদেব মন্দির ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন? আর কীভাবেই বা পুরীর এই উৎসব বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল? এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে রথযাত্রার উৎপত্তি, ঐতিহাসিক তথ্য, প্রাচীন শাস্ত্রের উল্লেখ, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের তাৎপর্য এবং এমন অনেক অজানা তথ্য, যা এই উৎসবকে ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বিস্ময়কর ঐতিহ্যে পরিণত করেছে।

আরও পড়ুনঃ পুরীর রথযাত্রায় চরম বিশৃঙ্খলা, মহা অঘটন পুরীতে

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভারতীয় সভ্যতার এমন এক ঐতিহ্য যার শিকড় কয়েক হাজার বছরের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ওডিশার পুরীতে যে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, তাকে বিশ্বের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম জনসমাগমভিত্তিক ধর্মীয় উৎসবগুলির অন্যতম বলে মনে করা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই দিনে জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার রথ টানতে একত্রিত হন। তবে এই উৎসবের সূচনা ঠিক কবে, তার নির্দিষ্ট কোনও ঐতিহাসিক দলিল নেই। ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান রথযাত্রার রূপটি ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, যার ভিত তৈরি হয়েছে প্রাচীন আদিবাসী উপাসনা, পুরাণের কাহিনি এবং বৈষ্ণব দর্শনের সমন্বয়ে।

জগন্নাথ উপাসনার প্রাচীনতম সূত্র খুঁজতে গেলে পৌঁছে যেতে হয় নীলমাধবের কাহিনিতে। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, বিশেষ করে স্কন্দ পুরাণের পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য অংশে বর্ণিত রয়েছে, ওডিশার শবর বা সাওরা আদিবাসী সম্প্রদায় গভীর অরণ্যের মধ্যে নীলমাধব নামে বিষ্ণুর এক রূপের আরাধনা করতেন। সেই দেবতার পূজার দায়িত্বে ছিলেন শবর প্রধান বিশ্বাবসু। এই উপাসনা ছিল সম্পূর্ণ গোপনীয় এবং বাইরের কোনও মানুষের সেখানে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। এই কারণেই বহু গবেষক মনে করেন, জগন্নাথ উপাসনার মূল ভিত্তি ছিল আদিবাসী সংস্কৃতি, যা পরবর্তীকালে বৃহত্তর হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরার সঙ্গে একীভূত হয়।

নীলমাধবের অলৌকিক মাহাত্ম্যের কথা জানতে পারেন মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। তিনি দেবতার দর্শন লাভের জন্য তাঁর পুরোহিত বিদ্যাপতিকে অনুসন্ধানে পাঠান। নানা ঘটনার পর বিদ্যাপতি নীলমাধবের অবস্থান জানতে পারলেও রাজা সেখানে পৌঁছানোর আগেই দেবতা অন্তর্ধান করেন। পুরাণ অনুসারে, এরপর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদেশ পান যে সমুদ্রতটে ভেসে আসা এক অলৌকিক কাঠ থেকে নতুন মূর্তি নির্মাণ করতে হবে। এই কাঠকে পরবর্তীকালে ‘দারু ব্রহ্ম’ নামে অভিহিত করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই দারু ব্রহ্ম থেকেই জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা এবং সুদর্শনের মূর্তি নির্মিত হয়।

মূর্তি নির্মাণকে ঘিরেও রয়েছে এক সুপরিচিত কাহিনি। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা একজন সাধারণ কারিগরের রূপ ধারণ করে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে শর্ত দেন যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেউ যেন তাঁকে কাজ করতে না দেখে। তিনি একটি বন্ধ কক্ষে মূর্তি নির্মাণ শুরু করেন। বহু দিন কেটে যাওয়ার পরও ভিতর থেকে কোনও শব্দ না পেয়ে রানি গুণ্ডিচা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত রাজা দরজা খুলে দিলে বিশ্বকর্মা অদৃশ্য হয়ে যান। তখন দেখা যায়, মূর্তিগুলির হাত ও পা সম্পূর্ণরূপে নির্মিত হয়নি। সেই অসমাপ্ত রূপই আজও জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বৈশিষ্ট্য হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে। ইতিহাসবিদেরা অবশ্য এই ঘটনাকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করেন; এর কোনও স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

জগন্নাথের বর্তমান রূপ কেবল একটি ধর্মীয় ধারার প্রতিনিধিত্ব করে না। বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন বিশ্বাস এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির সমন্বয়ে এই উপাসনা গড়ে উঠেছে। গবেষকদের একাংশের মতে, আদিবাসী উপাসনার পাশাপাশি বৈষ্ণব, শৈব এবং শাক্ত পরম্পরার প্রভাবও জগন্নাথ সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। এমনকি কয়েকজন গবেষক বৌদ্ধ ধর্মের কিছু প্রতীকী প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন, যদিও সেই মত সর্বসম্মত নয়। এই কারণেই জগন্নাথকে অনেক সময় ভারতীয় ধর্মীয় সমন্বয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলা হয়।

বর্তমান জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব দ্বাদশ শতকে, আনুমানিক ১১৩৫ থেকে ১১৫০ সালের মধ্যে, পুরীতে বর্তমান বিশাল মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তাঁর উত্তরসূরিরা সেই নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। তবে জগন্নাথ উপাসনা যে এই মন্দিরেরও বহু শতাব্দী আগে থেকেই প্রচলিত ছিল, সে বিষয়ে অধিকাংশ গবেষকের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে। অর্থাৎ মন্দিরের ইতিহাস এবং দেবতার উপাসনার ইতিহাস এক নয়; উপাসনা আরও প্রাচীন।

মধ্যযুগে রথযাত্রা ধীরে ধীরে সমগ্র পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়। ত্রয়োদশ শতক থেকেই এই উৎসবের উল্লেখ বিভিন্ন শিলালিপি, সংস্কৃত গ্রন্থ এবং ওডিয়া সাহিত্যেও পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকের ইতালীয় ভ্রমণকারী ওডোরিক অব পর্দেনোন এবং পরবর্তীকালে আরও কয়েকজন বিদেশি পর্যটক পুরীর রথযাত্রার বিশাল জনসমাগম, আকাশছোঁয়া রথ এবং রাজকীয় আয়োজনের বিবরণ লিখে গিয়েছেন। সেই বিবরণ থেকেই ইউরোপে প্রথমবারের মতো পুরীর রথযাত্রার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।

রথযাত্রার উল্লেখ শুধু ঐতিহাসিক দলিলেই নয়, একাধিক ধর্মগ্রন্থেও রয়েছে। ব্রহ্ম পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ এবং কপিল সংহিতায় এই উৎসবের বিভিন্ন দিকের বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও এই গ্রন্থগুলি ধর্মীয় সাহিত্য, তবুও জগন্নাথ সংস্কৃতির বিকাশ এবং রথযাত্রার প্রাচীনত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, রাজবংশীয় শিলালিপি এবং মধ্যযুগীয় ভ্রমণবৃত্তান্ত ইতিহাসবিদদের কাছে এই উৎসবের বিকাশের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত।

এইভাবে রথযাত্রার ইতিহাসকে একক কোনও ঘটনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। আদিবাসী বিশ্বাস, পুরাণের কাহিনি, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই আজকের রথযাত্রা তার বর্তমান রূপ লাভ করেছে।

রথযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, জগন্নাথদেব প্রতি বছর কেন মন্দির ছেড়ে রথে চড়ে বের হন? এই প্রশ্নের উত্তর একাধিক ধর্মীয় পরম্পরায় ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পুরীর জগন্নাথ সংস্কৃতিতে সবচেয়ে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা প্রতি বছর মূল মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গুণ্ডিচা মন্দিরে যান। এই যাত্রাকে বলা হয় ‘গুণ্ডিচা যাত্রা’। জনশ্রুতি অনুসারে, গুণ্ডিচা ছিলেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রানি। আবার অন্য একটি বিশ্বাসে এই মন্দিরকে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি বলা হয়। যদিও ‘মাসির বাড়ি’ ধারণাটি মূলত লোকবিশ্বাসের অংশ, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিন দেবতা সেখানে সাত দিন অবস্থান করার পর পুনরায় মূল মন্দিরে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তনকে বলা হয় ‘বাহুড়া যাত্রা’।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে রথযাত্রার ব্যাখ্যা আরও গভীর। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর অনুসারীরা জগন্নাথকে শ্রীকৃষ্ণের রূপ হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে, গুণ্ডিচা মন্দির আসলে বৃন্দাবনের প্রতীক, আর মূল জগন্নাথ মন্দির দ্বারকার প্রতীক। অর্থাৎ রথযাত্রা হল শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী প্রকাশ। ভক্তরা যখন রথের দড়ি টানেন, তখন তাঁরা প্রতীকী অর্থে কৃষ্ণকে নিজের হৃদয়ের দিকে আহ্বান করেন। এই ভাবধারা পরবর্তীকালে বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

রথযাত্রার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হল, এই কয়েকটি দিনের জন্য জগন্নাথ নিজেই মন্দিরের গর্ভগৃহ ছেড়ে মানুষের মধ্যে চলে আসেন। সাধারণত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সকলের প্রবেশের অনুমতি নেই। কিন্তু রথযাত্রার সময় মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়েও লক্ষ লক্ষ মানুষ দেবদর্শনের সুযোগ পান। এই কারণেই বহু গবেষক রথযাত্রাকে এমন একটি উৎসব হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে দেবতা নিজেই মানুষের কাছে আসেন। সামাজিক সমতা এবং সর্বজনীন ভক্তিভাবের এই ধারণাই রথযাত্রাকে অন্য অনেক ধর্মীয় উৎসব থেকে আলাদা করে।

রথযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আচার পালিত হয়। আষাঢ় মাসের আগে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয় ‘স্নান পূর্ণিমা’। এই দিনে জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা এবং সুদর্শনকে মন্দিরের স্নানবেদীতে এনে একশো আটটি কলসের পবিত্র জল দিয়ে স্নান করানো হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ স্নানের পর দেবতারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই কারণেই তাঁরা প্রায় পনেরো দিন জনসমক্ষে আসেন না। এই সময়কে বলা হয় ‘অনবসর’ বা ‘অনাসর’। এই সময়ে মন্দিরে মূল বিগ্রহের পরিবর্তে অন্য রূপে পূজা হয়।

অনবসর শেষ হওয়ার পরে অনুষ্ঠিত হয় ‘নেত্রোৎসব’ বা ‘নবযৌবন দর্শন’। এই আচার অনুযায়ী দেবমূর্তির চোখ নতুন করে অঙ্কন করা হয় এবং তাঁরা আবার ভক্তদের দর্শন দেন। এরপর শুরু হয় রথযাত্রার প্রধান প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট শুভক্ষণে দেবমূর্তিগুলিকে গর্ভগৃহ থেকে বিশেষ ভঙ্গিতে দুলতে দুলতে রথের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অনন্য শোভাযাত্রাকে বলা হয় ‘পাহান্ডি’। হাজার হাজার সেবায়েত, বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি এবং ভক্তদের জয়ধ্বনির মধ্যে এই আচার সম্পন্ন হয়। পুরীর বাইরে এমন রীতি প্রায় কোথাও দেখা যায় না।

রথযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হল ‘ছেড়া পাহাড়া’। এই অনুষ্ঠানে পুরীর গজপতি মহারাজ রাজকীয় পোশাকে রথের সামনে এসে সোনার হাতলযুক্ত ঝাঁটা দিয়ে তিনটি রথ পরিষ্কার করেন এবং চন্দনজল ছিটিয়ে দেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই আচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—দেবতার সামনে রাজা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। রাজাও জগন্নাথের প্রথম সেবক মাত্র।

রথযাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ নিঃসন্দেহে তিনটি বিশাল কাঠের রথ। প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে এগুলি তৈরি করা হয় এবং কোনও রথই পরের বছর ব্যবহার করা হয় না। জগন্নাথদেবের রথের নাম ‘নন্দিঘোষ’। এর উচ্চতা প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট এবং এতে থাকে ষোলোটি চাকা। বলভদ্রের রথের নাম ‘তালধ্বজ’। এর উচ্চতা প্রায় চুয়াল্লিশ ফুট এবং এতে থাকে চৌদ্দটি চাকা। সুভদ্রার রথের নাম ‘দর্পদলন’ বা ‘দেবদলন’। এর উচ্চতা প্রায় তেতাল্লিশ ফুট এবং এতে থাকে বারোটি চাকা। প্রতিটি রথের নিজস্ব পতাকা, রং, সারথি, রক্ষাকর্তা দেবতা এবং ঘোড়ার নাম রয়েছে, যা শতাব্দীপ্রাচীন শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে নির্ধারিত।

রথ নির্মাণের কাজও নিজেই একটি বিশাল আচার। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে নির্মাণ শুরু হয়। নির্দিষ্ট প্রজাতির কাঠ ব্যবহার করা হয় এবং শতাধিক বংশপরম্পরায় কর্মরত কারিগর এই কাজে অংশ নেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নির্দিষ্ট পরিমাপ অনুসরণ করে প্রতিটি অংশ তৈরি করা হয়। আধুনিক নকশা বা যন্ত্রের পরিবর্তে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিই এখানে অনুসরণ করা হয়।

গুণ্ডিচা মন্দিরে সাত দিন অবস্থানের পর শুরু হয় ‘বাহুড়া যাত্রা’। ফেরার পথে দেবতারা ‘মাসি মা মন্দির’-এ অল্প সময়ের জন্য থামেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেখানে তাঁদের বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এরপর মূল মন্দিরের সামনে রথে অবস্থান করেই অনুষ্ঠিত হয় ‘সোনা বেশ’। এই দিনে জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে বহু কিলোগ্রাম সোনার অলংকারে সজ্জিত করা হয়। অসংখ্য ভক্ত এই বিরল দর্শনের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।

রথযাত্রার শেষ গুরুত্বপূর্ণ আচার হল ‘নীলাদ্রি বিজে’। এই দিন তিন দেবতা পুনরায় জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করেন। একটি জনপ্রিয় কাহিনি অনুসারে, মন্দিরে প্রবেশের আগে লক্ষ্মীদেবী অভিমান ভাঙার প্রতীক হিসেবে জগন্নাথের কাছ থেকে রসগোল্লা গ্রহণ করেন। যদিও এই কাহিনির ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই এবং এটি মূলত লোকবিশ্বাসের অংশ, তবুও নীলাদ্রি বিজের সঙ্গে এই আচার আজ গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এইভাবেই স্নান পূর্ণিমা থেকে নীলাদ্রি বিজে পর্যন্ত প্রায় এক মাসব্যাপী ধর্মীয় আচার, শাস্ত্রীয় বিধান এবং লোকপরম্পরার সমন্বয়ে সম্পূর্ণ হয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম রথযাত্রা।

জগন্নাথদেবের উপাসনার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল, এখানে দেবমূর্তি পাথর বা ধাতুর নয়, কাঠের। ভারতের অধিকাংশ প্রাচীন মন্দিরে স্থায়ী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার রীতি থাকলেও পুরীতে তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা এবং সুদর্শনের বিগ্রহ বিশেষ নিমগাছের কাঠ, অর্থাৎ ‘দারু ব্রহ্ম’ থেকে নির্মিত হয়। এই কাঠ নির্বাচনও সাধারণ নিয়মে হয় না। নির্দিষ্ট লক্ষণযুক্ত গাছ খুঁজে বের করার জন্য বিশেষ অনুসন্ধান অভিযান পরিচালিত হয়, যাকে ‘বনযাগ যাত্রা’ বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সেবায়েতরা শাস্ত্রবিধি মেনে এই অনুসন্ধান করেন। গাছের গায়ে শঙ্খ, চক্র, গদা বা পদ্মের মতো চিহ্ন, নির্দিষ্ট পরিবেশ এবং আরও একাধিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হয়। সব নিয়ম পূরণ না হলে সেই গাছ নির্বাচন করা হয় না।

এই কাঠের বিগ্রহের কারণেই জগন্নাথ মন্দিরে পালিত হয় ‘নবকলেবর’ নামে এক বিরল আচার। সাধারণভাবে প্রতি বারো থেকে উনিশ বছরের মধ্যে, যখন আষাঢ় মাসে অতিরিক্ত চন্দ্রমাস বা ‘অধিক আষাঢ়’ পড়ে, তখন এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ‘নবকলেবর’ শব্দের অর্থ নতুন দেহ ধারণ। এই সময় পুরনো কাঠের বিগ্রহের পরিবর্তে নতুন বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়। তবে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবতার চেতনা বা ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ পুরনো বিগ্রহ থেকে নতুন বিগ্রহে স্থানান্তরিত করা হয়। এই আচার গভীর রাতে, কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে সম্পন্ন হয়। এর সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। ইতিহাসবিদদের কাছে এটি একটি জীবন্ত ধর্মীয় ঐতিহ্য, আর ভক্তদের কাছে এটি দেবত্বের পুনরাবির্ভাবের প্রতীক।

জগন্নাথদেবের মূর্তির আকৃতিও বহুদিন ধরে গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। বড় গোলাকার চোখ, স্পষ্ট পাতা না থাকা, অসম্পূর্ণ হাত-পা এবং অনন্য কাঠামো ভারতের অন্য কোনও প্রধান দেবমূর্তির সঙ্গে মেলে না। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই রূপের মাধ্যমে জগন্নাথ সর্বক্ষণ বিশ্বজগতের দিকে দৃষ্টি রাখছেন। আবার অনেক গবেষক মনে করেন, এই আকৃতির মধ্যে প্রাচীন আদিবাসী শিল্পরীতির প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ একই মূর্তিকে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্প-ইতিহাস—দুই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ব্যাখ্যা করা হয়।

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘরও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় রান্নাঘর হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্তের জন্য এখানে মহাপ্রসাদ প্রস্তুত করা হয়। শত শত রাঁধুনি এবং সেবায়েত এই কাজে অংশ নেন। রান্নার জন্য ব্যবহার করা হয় মাটির হাঁড়ি এবং কাঠের জ্বালানি। একটির উপর আরেকটি হাঁড়ি বসিয়ে রান্না করার এই প্রথা বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে। উপরের হাঁড়ির রান্না আগে সম্পূর্ণ হয়—এমন একটি বিশ্বাস বহুদিন ধরে প্রচলিত। ভক্তরা একে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখলেও, তাপ ও বাষ্পের প্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। তবে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়।

রথ নির্মাণও নিজেই এক অসাধারণ ঐতিহ্য। প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়া থেকে নতুন করে তিনটি রথ তৈরির কাজ শুরু হয়। পূর্ববর্তী বছরের কোনও রথ পুনরায় ব্যবহার করা হয় না। শতাধিক বংশানুক্রমিক কারিগর নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় পরিমাপ অনুসারে এই কাজ সম্পন্ন করেন। জগন্নাথের নন্দিঘোষ রথে ষোলোটি, বলভদ্রের তালধ্বজ রথে চৌদ্দটি এবং সুভদ্রার দর্পদলন রথে বারোটি চাকা থাকে। প্রতিটি রথের জন্য আলাদা পতাকা, ঘোড়া, সারথি এবং রক্ষাকর্তা দেবতার বিধান রয়েছে। কয়েকশো কাঠের অংশ জুড়ে এই বিশাল রথগুলি নির্মিত হয়, যা ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ।

ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগমনের পর রথযাত্রা নতুন এক ভক্তিমূলক ব্যাখ্যা লাভ করে। তিনি দীর্ঘ সময় পুরীতে অবস্থান করেন এবং রথযাত্রার সময় জগন্নাথদেবের সামনে কীর্তন ও নৃত্যে অংশ নিতেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরায় এই ঘটনাগুলি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলায় রথযাত্রার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

আরও পড়ুনঃ সোনার ঝাড়ু দিয়ে ঝাঁট! ইসকনের রথযাত্রার শুভ সূচনা মুখ্যমন্ত্রীর

রথযাত্রা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উৎসবের আয়োজন শুরু হয়। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বহু শহরে আজ রথযাত্রা পালিত হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের উদ্যোগে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, মেলবোর্ন, জোহানেসবার্গসহ অসংখ্য শহরে প্রতিবছর জনসমাগমের মধ্য দিয়ে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে রথযাত্রা আজ একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ও লাভ করেছে।

রথযাত্রার খ্যাতি ইউরোপে পৌঁছায় মধ্যযুগেই। চতুর্দশ শতকের ইতালীয় পর্যটক ওডোরিক অব পর্দেনোন পুরীর বিশাল রথ, মানুষের ঢল এবং উৎসবের আয়োজন সম্পর্কে বিবরণ লিখে গিয়েছিলেন। পরে ঔপনিবেশিক যুগে আরও বহু ইউরোপীয় লেখক এই উৎসবের কথা উল্লেখ করেন। তবে তাঁদের অনেকেই ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে সীমিত ধারণা নিয়ে লিখেছিলেন। বিশেষ করে রথের চাকার নিচে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ প্রাণ দিত—এমন দাবি বহু লেখায় করা হলেও আধুনিক গবেষকেরা মনে করেন, এই বিবরণগুলির বড় অংশই অতিরঞ্জিত বা ভুল ব্যাখ্যার ফল। বিশাল জনসমাগমে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে চিত্র বিদেশে প্রচারিত হয়েছিল, তা বাস্তবতার সম্পূর্ণ প্রতিফলন ছিল না।

এই ঔপনিবেশিক বিবরণ থেকেই ইংরেজি ভাষায় ‘জাগারনট’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। এটি ‘জগন্নাথ’ নামেরই ইংরেজি রূপান্তর। প্রথমদিকে শব্দটি সরাসরি পুরীর জগন্নাথদেবকে বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও পরে ইংরেজি ভাষায় এর অর্থ পরিবর্তিত হয়ে এমন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি বা প্রবল গতিশীল শক্তিকে বোঝাতে শুরু করে, যার সামনে সবকিছু সরে যায়। ভাষাবিদদের মতে, এটি ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করা সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলির একটি।

আজ রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি ভারতীয় ইতিহাস, স্থাপত্য, লোকবিশ্বাস, শিল্প, সঙ্গীত, কারিগরি দক্ষতা এবং সামাজিক ঐক্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। আদিবাসী উপাসনা থেকে শুরু করে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলন থেকে আধুনিক আন্তর্জাতিক উদ্‌যাপন—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রথযাত্রা নিজেকে পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েও তার মূল ঐতিহ্য অটুট রেখেছে।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন