কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
আদিবাসী সমাজের অন্যতম প্রধান ও সর্ববৃহৎ উৎসব ‘করম পুজো’কে কেন্দ্র করে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে সমগ্র ডুয়ার্স। গতকাল সন্ধ্যা থেকেই ডুয়ার্সের চা বাগান ও শহরাঞ্চলের সর্বত্র প্রথাগত পুজো ও করম মেলার সূচনা হয়েছে। মূলত প্রকৃতি বন্দনা কেন্দ্রিক এই পুজোর মূল লক্ষ্য হলো ধান, চা বাগান সহ যাবতীয় ফসলের সমৃদ্ধি কামনা করা। মালবাজার শহরে এবার দুটি মূল স্থান—বিডিও অফিস সংলগ্ন ময়দান এবং রেলওয়ে ময়দানে আড়ম্বরপূর্ণ পুজো ও মেলা আয়োজিত হয়েছে।
সারারাত ব্যাপী পুজো ও প্রার্থনার পর আজ দিনভর বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই পুজোকে কেন্দ্র করে ডুয়ার্সের প্রতিটি চা বাগানেই এখন ছুটির মেজাজ।
আরও পড়ুনঃ পুজোর আগে দ্রুত ‘স্লিম’ হওয়ার দৌড়; ক্র্যাশ ডায়েট ও অতিরিক্ত জিম ডেকে আনছে বড় বিপদ
পৌরাণিক কথা ও করম পুজোর ইতিহাস
আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী:
-
অগ্নিপ্রলয় ও আত্মরক্ষা: পুরাকালে ধরণীতে একবার ভয়াবহ অগ্নিপ্রলয় ঘটেছিল, চারদিক থেকে জ্বলন্ত লাভার মত আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। সেই সময় নায়েক ও সারেন নামের দুই ভাইবোন ঈশ্বরের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলে ভগবান তাঁদের একটি করম গাছের কোটরে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেন।
-
করম গাছের অলৌকিকতা: আগুনে বিশ্বচরাচর ভস্মীভূত হলেও করম গাছের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং সুস্থভাবে রক্ষা পান দুই ভাইবোন।
-
রাজার সম্মান: সেই থেকে আদিবাসী সমাজে প্রকৃতিকে পূজার মূল কেন্দ্রে রাখা হয় এবং করম গাছকে রাজার সম্মান দেওয়া হয়। পাহান (আদিবাসী সমাজের পুরোহিত) নির্দিষ্ট প্রথা মেনে করম ডালের পুজো করেন, যার পর উৎসবের সূচনা হয়।
উৎসবে এক শুভ দিন হিসেবে গণ্য করে মেলা প্রাঙ্গণেই অনেক আদিবাসী যুবক-যুবতীর বিবাহ সম্পন্ন করার রীতিও দেখা যায়।
আরও পড়ুনঃ ফণা তুলছে নিম্নচাপ! দক্ষিণবঙ্গের ৪ জেলায় অতি ভারী বৃষ্টির চরম সতর্কবার্তা
বিলুপ্তির পথে করম গাছ: উদ্বেগে উদ্যোক্তারা
উৎসবের আবহ থাকলেও পুজোর মূল উপাদান করম গাছের বিলুপ্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আয়োজকরা।
| কর্মকর্তা ও সংগঠক | প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য |
|
তেজকুমার টোপ্পো (রাজ্য সহ-সভাপতি, আদিবাসী বিকাশ পরিষদ) |
“করম গাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। সরকারি উদ্যোগে নার্সারির মাধ্যমে এর সংরক্ষণ জরুরি। আমি তিন বছর আগে রাজগঞ্জ ব্লক থেকে একটি চারা এনে বাড়িতে লাগিয়েছিলাম, সেই গাছের ডাল এনেই এবার পুজো হচ্ছে।” |
|
চন্দন লোহার (উদ্যোক্তা, রেলওয়ে ময়দান পুজো) |
“মালবাজার ব্লকে করম গাছ এখন হাতেগোনা। এই গাছের ডাল ছাড়া পুজো সম্ভব নয়। উৎসব মেটার পর গাছ সংরক্ষণের বিষয়ে বন দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।” |
চা বাগান ও শারদীয় উৎসবের আবহ
মালবাজার শহরের এই পুজো ও মেলায় ডুয়ার্সের প্রায় ৩০টিরও বেশি চা বাগানের শ্রমিকদের ঢল নামবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। শ্রমিকদের শহরে যাতায়াতের সুবিধার্থে বিভিন্ন বাগান কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে গাড়ির সুব্যবস্থা করা হয়েছে। ডুয়ার্সের অধিবাসীদের মতে, প্রকৃতিপ্রেমী এই করম পুজোর হাত ধরেই কার্যত অঞ্চলে শারদীয় উৎসবের শুভ সূচনা হয়ে গেল।


