বিশেষ রাজ্য ও ক্রাইম রিপোর্টিং সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন:
দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর (UNESCO) নাম-লোগো ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার পাস কেলেঙ্কারি মামলায় ফের বড়সড় সাফল্য পেল কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT)। প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন গ্রেফতার হওয়ার পর, এবার লালবাজারের জালে ধরা পড়লেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শাগরেদ তথা টালা প্রত্যয়ের প্রাক্তন পুজো-কর্তা ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে শুভ। বৃহস্পতিবার পোদ্দার কোর্ট এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
আরও পড়ুনঃ ‘৫ মিনিটে প্রমাণ করে দেব মোদী দেশদ্রোহী’! রাহুলের বিস্ফোরক মন্তব্যে দেশ জুড়ে তোলপাড়
১. কে এই ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং কী তাঁর ভূমিকা?
-
প্রতারণা চক্রের মূল কাণ্ডারী: তদন্তকারীদের দাবি, প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে ইউনেস্কো ও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে সুবিশাল অর্থ প্রতারণার চক্র চলছিল, তাতে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন এই ধ্রুবজ্যোতি বসু।
-
‘মাস আর্ট’-এর শীর্ষ পদ: প্রতারণার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত ‘মাস আর্ট’ (Mass Art) নামক সংস্থার সেক্রেটারি ছিলেন এই ধ্রুবজ্যোতি। সংস্থাটির শীর্ষে ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুছন্দা সেন।
২. যেভাবে চলত ইউনেস্কো ও পুজো পাসের রমরমা কারবার
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল:
-
২৪টি পুজো নির্বাচন ও অনলাইন আবেদন: প্রথমে কলকাতার ২৪টি প্রথম সারির মেগা পুজো কমিটিকে বেছে নিত ‘মাস আর্ট’ সংস্থা। প্রিভিউ শো-তে অংশগ্রহণের নামে সেই পুজো কমিটিগুলির থেকে অনলাইনে আবেদন জমা নেওয়া হতো।
-
কড়া নজরদারি ও চড়া দামে পাস বিক্রি: আন্তর্জাতিক দর্শনার্থী ও ভিআইপি প্রিভিউয়ের নামে আমজনতার কাছে বিপুল টাকায় পাস বিক্রি করা হতো। ওই নির্দিষ্ট সময় ‘মাস আর্ট’-এর নির্বাচন করা ২৪টি মণ্ডপে সাধারণ দর্শনার্থীদের ঢুকতে দেওয়া হতো না। মণ্ডপের বাইরে মোতায়েন থাকত সংস্থার নিজস্ব টিম। কিউআর বা বারকোডযুক্ত পাস স্ক্যান করিয়ে তবেই দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো। এই পাসের কারবার থেকে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা চলে যেত চক্রের হাতে।
আরও পড়ুনঃ পথ কুকুরদের জন্য ‘ফিডিং জোন’ ও ইলেকট্রিক চুল্লি সহ শ্মশান; একগুচ্ছ ঘোষণা অগ্নিমিত্রার
৩. তদন্তের অগ্রগতি ও আর্থিক তছরুপের গতিপ্রকৃতি
-
এফআইআর ও তদন্ত শুরু: গত ৮ জুন বউবাজার থানায় এই মারাত্মক প্রতারণার বিষয়ে প্রথম লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি। মামলা শুরু হতেই লালবাজারের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) তল্লাশি জোরদার করে।
-
টেন্ডার দুর্নীতি ও ১.২৮ কোটি টাকা লেনদেন: শুধু পাসের কারবারই নয়, ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল কাটমানি নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, সরাসরি প্রায় ১ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা ঢুকেছে ইন্দ্রনীল সেনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে।
-
স্বজনপোষণ ও ঘুরপথে টাকা স্থানান্তর: লেনদেন সংক্রান্ত বাজেয়াপ্ত নথি খতিয়ে দেখে গোয়েন্দাদের অনুমান, ঘুরপথে এবং একাধিক ভুয়ো কোম্পানির মাধ্যমে ধৃত ইন্দ্রনীল সেনের বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে।
ইতোমধ্যেই প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন গ্রেফতার হয়ে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। এই ঘটনায় লালবাজারের গোয়েন্দারা প্রাক্তন মন্ত্রীর স্ত্রী মধুছন্দা সেনকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং তাঁর মেয়েকেও তলব করা হয়েছে। এবার সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ধ্রুবজ্যোতি বসু গ্রেফতার হওয়ায় এই কোটি টাকার দুর্নীতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা আরও একাধিক প্রভাবশালী নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।


