বিশেষ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রতিবেদন:
একদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যার করাল গ্রাস, আর অন্যদিকে খাবার ও সেচের জন্য তীব্র মিঠা জলের অভাব—এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক ‘জলবায়ু প্যারাডক্স’ (Climate Paradox)-এর মুখোমুখি হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা। আইআইটি খড়গপুর (IIT Kharagpur) এবং সিএসটিইপি (CSTEP)-র সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। বায়ুমণ্ডলে চরম আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং উষ্ণায়নের প্রভাবে ২১০০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র, কৃষি এবং নগর জীবন মারাত্মক সংকটে পড়তে চলেছে।
আরও পড়ুনঃ এসএফআই-সিপিএম চক্ষুশূল! বিজেপি সরকারের প্রতি ‘আস্থাশীল’ বুদ্ধদেবপুত্র সুচেতন
১. ২১০০ সালের পূর্বাভাস: জলীয় বাষ্প ও চরম আর্দ্রতার বৃদ্ধি
আইআইটি খড়গপুরের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকারক গ্যাসের নির্গমন না কমলে আবহাওয়ায় জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়বে।
-
জলীয় বাষ্পের পরিসংখ্যান: ২১০০ সালের মধ্যে মাঝারি নির্গমনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ এবং উচ্চ নির্গমনের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প।
-
অসম বৃষ্টিপাত ও অনিশ্চয়তা: বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন, এই বৃদ্ধি সরাসরি সুষম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নয়। বায়ুমণ্ডল অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প ধরে রাখার ফলে কোথাও মেঘভাঙা অতিবৃষ্টি ও প্লাবন দেখা দেবে, আবার কোথাও দীর্ঘ খরা ও তীব্র জলসংকট তৈরি হবে।
২. কলকাতার ওপর মারাত্মক প্রভাব: ভারী বৃষ্টির দিন বৃদ্ধির শঙ্কা
ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি কলকাতার ওপর এই জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা হতে চলেছে সবচেয়ে ভয়াবহ।
-
উচ্চ-তীব্রতার বৃষ্টির পুনরাবৃত্তি: CSTEP-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে কলকাতায় প্রতি বছর অন্তত ৩টি অতিরিক্ত উচ্চ-তীব্রতার বৃষ্টির ঘটনা (Extreme Rainfall Events) ঘটতে পারে।
-
বৃষ্টির দিনের সংখ্যা বৃদ্ধি: রাজ্য জুড়ে বছরে অতিরিক্ত ১৫টি পর্যন্ত বৃষ্টির দিন বাড়তে পারে। ফলে কলকাতার দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে এবং জলজট ও বন্যার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
-
উষ্ণতা বৃদ্ধি: ২০৩০-এর দশকে পূর্ব ভারতের জেলাগুলিতে গড় তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা শহরের বুক থেকে শুরু করে গ্রামে জল সংকটকে আরও জটিল করবে।
৩. সুন্দরবন ও রাজ্যের কৃষি ক্ষেত্রে তীব্র সংকট
শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রাম বাংলা ও উপকূলীয় অঞ্চলের ওপরও নামতে চলেছে অমাবস্যার কালো ছায়া।
-
কৃষি ও সেচের ওপর চাপ: তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অসম বৃষ্টিপাতের কারণে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিপ্রধান এলাকাগুলিতে সেচের জলের চাহিদা বাড়বে। বিশেষত পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত সেচের জল না পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
-
সুন্দরবনের লবণাক্ততা ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি: মেদিনীপুর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষত সুন্দরবনে মিঠা জলের আকাল চরমে পৌঁছাবে। নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাটির বাঁধ ভাঙন এবং ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হওয়ার ফলে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, পানীয় জল ও স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব পড়বে।
আরও পড়ুনঃ জলপাইগুড়ির মোহিত নগর সংলগ্ন এলাকায় উদ্ধার বিরল ‘রেড কোরাল কুকরি’, এলাকায় জারি কড়া নজরদারি
৪. সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ
বিজ্ঞানীদের মতে, এই অনিশ্চিত জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত ও কাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যিক:
-
নগর পরিকাঠামো পরিবর্তন: কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করা, শহরের বাকি থাকা জলাধারগুলি সংরক্ষণ এবং বেশি করে সবুজ পরিকাঠামো (Green Infrastructure) গড়ে তোলা।
-
কৃষিতে বিকল্প প্রযুক্তি: কম জলে চাষযোগ্য বিকল্প ফসল এবং জল-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত প্রসার ঘটানো।
-
উপকূল সুরক্ষা: সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও নদীবাঁধ সংস্কারের মাধ্যমে লবণাক্ত জল প্রবেশ রদ করা।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বাড়া মানেই সুষম বৃষ্টি নয়। অতিবৃষ্টি ও খরার এই জোড়া ফলার বিরুদ্ধে লড়াই করতে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ নাগরিক সমাজকে এখনই একযোগে প্রস্তুত হতে হবে।


