Friday, 30 October, 2026
30 October
Homeদক্ষিণবঙ্গShibpur: চুন-সুরকির নীলচে বিগ্রহ ও শতবর্ষের অনন্য তান্ত্রিক ইতিহাসের রূপরেখা; শিবপুরের ঐতিহ্যবাহী...

Shibpur: চুন-সুরকির নীলচে বিগ্রহ ও শতবর্ষের অনন্য তান্ত্রিক ইতিহাসের রূপরেখা; শিবপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘হাজার হাত কালীবাড়ি’

আশুতোষবাবুর একটি পোষা হনুমান ছিল। তার মৃত্যুর পর মন্দিরের ভেতরেই হনুমানটির সমাধির ওপর একটি ‘মহাবীর মন্দির’ গড়ে তোলা হয়।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য প্রতিবেদন:

মধ্য হাওড়ার শিবপুর অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তে গড়ে ওঠা ‘হাজারহাত কালীতলা’ এলাকার নামকরণ যার নামানুসারে, সেই হাজার হাতের কালীমাতার মন্দির কেবল হাওড়া নয়, সমগ্র ভারতের এক দুর্লভ ও অনন্য পুণ্যতীর্থ। দেবী দুর্গা বা মহামায়ার সহস্রভূজা রূপের কথা বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে পাওয়া গেলেও, মা কালীর বিগ্রহে হাজার হাতের সহস্র রূপের উপস্থিতি সমগ্র ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

আরও পড়ুনঃ  ৪০০ বছরের পুরোনো জাগ্রত দেবী দক্ষিণাকালী; বাগনানের ঐতিহ্যবাহী খালোড় কালীবাড়ি

তর্কচূড়ামণি আশুতোষের স্বপ্নাদেশ ও মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর পৌরাণিক সংযোগ

শিবপুরের ঐতিহ্যবাহী মুখোপাধ্যায় পরিবারের সন্তান, সাধক ও তান্ত্রিক আশুতোষ (তর্করত্ন) মুখোপাধ্যায়ের সাধনার সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই মন্দিরের আদি ইতিহাস।

  • শ্রীশ্রী চণ্ডীর অনুধাবন: মূল বাড়ি মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে হলেও, আশুতোষবাবুর সাধনা চলত কলকাতার নিমতলা শ্মশানঘাটে। নিশীথ রাতে ঘোর তন্ত্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধনায় মগ্ন অবস্থায় তিনি দেবী চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পান।

  • পৌরাণিক ভিত্তি: মার্কণ্ডেয় চণ্ডীপুরাণের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৭, ৩৮ ও ৩৯ নম্বর শ্লোক অনুযায়ী—মহিষাসুর বধের সময় মহামায়া যে সহস্রভূজা বিশ্বরূপ ধারণ করেছিলেন, আশুতোষবাবু মায়ের সেই অলৌকিক রূপেরই প্রত্যক্ষ দর্শন লাভ করেন।

হোগলা পাতার চালা থেকে ১৯০৪ সালের পুনর্প্রতিষ্ঠা

স্বপ্নাদেশ পেলেও প্রথম দিকে বিশাল মন্দির গড়ে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার মতো আর্থিক সঙ্গতি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছিল না।

  • আদি মূর্তি ও বিপর্যয়: তিনি প্রথমে হোগলা পাতার ছাওয়া একটি মাটির কুঁড়েঘরে মায়ের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় মূল মূর্তির দুই হাতের বাইরে বাকি ৯৯৮টি হাত মন্দিরের কাঁচা দেওয়ালে একে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে (মতান্তরে ডাকাত দলের হামলায়) সেই প্রথম মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।

  • কামাখ্যা যাত্রা ও প্রত্যাবর্তন: ব্যথিত হৃদয়ে আশুতোষবাবু কামাখ্যা চলে যান। কিন্তু সেখানেও মায়ের পুনর্প্রতিষ্ঠার স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি পুনরায় হাওড়ায় ফিরে আসেন। অবশেষে ১৯০৪ সালে বর্তমান স্থানে দ্বিতীয়বার মহাসমারোহে দেবী বিগ্রহের পুনর্প্রতিষ্ঠা করা হয়।

আরও পড়ুনঃ  তন্ত্র ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন; হুগলির ঐতিহাসিক রাজবলহাট ও জাগ্রত দেবী শ্রীশ্রী রাজবল্লভী মায়ের মহিমা

শিল্পী প্রিয়নাথ পালের অনন্য সৃষ্টি: চুন-সুরকির সহস্রভূজা বিগ্রহ

বর্তমান মন্দিরের দেবী বিগ্রহের গঠনশৈলী অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ও অভূতপূর্ব। কুমোরটুলির প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী প্রিয়নাথ পাল মায়ের এই বিগ্রহের রূপদান করেন।

  • নীলাভ সবুজ বিগ্রহ ও পদবিন্যাস: দেবীর গাত্রবর্ণ নীলাভ সবুজ। রক্তবীজ বা অশুভ দমনে মগ্ন হলেও মায়ের জিভ বাইরে বেরিয়ে নেই, এবং তাঁর বাহন সিংহ। দেবীর বাম পা অবস্থান করছে হিংস্র সিংহের পিঠে এবং ডান পা রাখা রয়েছে পদ্মফুলের ওপর।

  • চুন-সুরকি ও রূপোর অলংকার: শুরুতে কাঁচা মাটি দিয়ে ৯৯৮টি হাত তৈরি করা হলেও তা ফেটে ভেঙে যেতে শুরু করে। পরবর্তীতে প্রিয়নাথ পাল মাটি, খড় ও তুষের সঙ্গে চুন-সুরকি মিশিয়ে পুরো বিগ্রহ ও সহস্র হাতকে স্থায়ী রূপ দেন। দেবীর ডান হাতে পঞ্চশূল এবং বাম হাতে খড়ি ও বাসুকী নাগ শোভা পাচ্ছে।

  • রুপোর ছত্র ও অলংকার: মায়ের মাথার ওপর থাকা রাজকীয় ছাতা, সুদৃশ্য মুকুট এবং হাজার হাতে থাকা সমস্ত অস্ত্র তৈরি করতে প্রায় ১১ থেকে ১২ কেজি বিশুদ্ধ রুপো ব্যবহার করা হয়েছে।

নিত্যসেবা, বৈচিত্র্যময় প্রথা ও মহাবীর মন্দির

তন্ত্র মতে পুজো হলেও এই শতবর্ষ প্রাচীন মন্দিরে কোনো প্রাণী বলি দেওয়া হয় না; পরিবর্তে আদা ও কাঁচাকলা বলি দিয়ে বলিদানের প্রথা ও নিয়ম রক্ষা করা হয়।

  • বংশানুক্রমিক সেবায়েত: বর্তমানে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে মায়ের নিত্যসেবা ও রাজভোগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

  • কালীপুজো ও বেনারসী: কার্তিক অমাবস্যার কালীপুজোর রাতে এখানে মূল বার্ষিক উৎসব পালিত হয়। পুজো উপলক্ষে দেবীকে নতুন বেনারসী শাড়িতে অপরূপ সাজে সাজানো হয়।

  • হনুমানের সমাধি ও দক্ষিণ ভারতীয় যোগ: সাধক আশুতোষবাবুর একটি পোষা হনুমান ছিল। তার মৃত্যুর পর মন্দিরের ভেতরেই হনুমানটির সমাধির ওপর একটি ‘মহাবীর মন্দির’ গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়া শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের শেষ শুক্রবারে কলকাতার প্রবাসী দক্ষিণ ভারতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ এই মন্দিরে এসে দেবীর বিশেষ আরাধনা করে থাকেন।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন