Thursday, 29 October, 2026
29 October
Homeদক্ষিণবঙ্গKali Puja: তন্ত্র ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন; হুগলির ঐতিহাসিক রাজবলহাট ও জাগ্রত...

Kali Puja: তন্ত্র ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন; হুগলির ঐতিহাসিক রাজবলহাট ও জাগ্রত দেবী শ্রীশ্রী রাজবল্লভী মায়ের মহিমা

দেবীর মূর্তির গঠন ও পুজোপ্রথার মধ্যে বৌদ্ধ দেবী নীল সরস্বতী, তারা এবং পর্ণশবরীর সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রতিবেদন:

হুগলি জেলার হাওড়া-তারকেশ্বর রেলপথের হরিপাল স্টেশনের ঠিক কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ—রাজবলহাট। এককালের প্রাচীন ভূরিশ্রেষ্ঠ বা ভুরশুট রাজ্যের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই রাজবলহাট নামের সঙ্গে আজও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দেবী শ্রীশ্রী রাজবল্লভী মাতার জাগ্রত স্মৃতি। জনশ্রুতি বলে, দেবী রাজবল্লভী এবং একসময়ের তৎকালীন সমৃদ্ধ ‘হাট’—এই দুই শব্দ যুক্ত হয়েই ‘রাজবল্লভী হাট’ থেকে কালক্রমে আজকের ‘রাজবলহাট’ নামের উৎপত্তি।

আরও পড়ুনঃ  তন্ত্রসাধক অমরকৃষ্ণ চক্রবর্তী এবং এক অনন্য ঐতিহ্যের কাহিনী; শোভাবাজারের দিক নির্দেশক ‘লাল মন্দির’ ও মা পুঁটিয়া কালী

মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: রাজা সদানন্দ ও কাপালিক সাধনা

লোকঐতিহ্য ও প্রাচীন নথি অনুযায়ী, আনুমানিক ১২৪২ খ্রিস্টাব্দে ভুরশুটের রাজা সদানন্দ রায় (বা মুখোপাধ্যায়) এই মন্দিরের পত্তন ঘটান। ইতিহাস বলে:

  • শিকার ও অনুশোচনা: রাজা সদানন্দ একবার শিকার করতে গিয়ে প্রাণীবধে অনুতপ্ত হয়ে পড়েন এবং এক সিদ্ধ কাপালিকের নির্দেশে গভীর অরণ্যে কঠিন শক্তিসাধনায় ব্রতী হন।

  • দেবীর দরশন ও আদেশ: রাজা সদানন্দের কঠোর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং দেবী দেখা দেন এবং মন্দির প্রতিষ্ঠার স্বপ্নাদেশ দেন।

  • অন্যতম মত: অবশ্য অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষকের মতে, ষোড়শ শতকে ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ রুদ্রনারায়ণ রায়ই ছিলেন এই প্রাচীন দেবালয়ের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।

ইতিহাসের পথ ধরে দেবীর নিত্যসেবা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে মন্দিরকে কেন্দ্র করে জেলে, তাঁতি, কুমোর ও গোয়ালা সম্প্রদায়ের বিশাল বসতি গড়ে ওঠে। যা কালক্রমে রাজবলহাটকে আজকের বিশ্ববিখ্যাত তাঁতশিল্পের অন্যতম পীঠস্থানে রূপান্তরিত করেছে।

শ্বেতবর্ণা ত্রিনয়নী প্রতিমা ও ১২/১৪ বছর অন্তর নবকলেবর

দেবী রাজবল্লভীর বিগ্রহের রূপ সাধারণ কালীমূর্তির চেয়ে সম্পূর্ণ পৃথক ও বিস্ময়কর:

  • রূপ ও অলঙ্কার: শরৎকালের জ্যোৎস্নার মতো দেবী এখানে উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণা। তিনি ত্রিনয়নী, মুণ্ডমালিনী এবং দ্বিভুজা। দেবীর ডান হাতে রয়েছে তীক্ষ্ণ ছুরিকা আর বাঁ হাতে সিঁদুর বা রুধিরপাত্র।

  • মহাকাল ও শিবের ওপর পদস্থাপন: দেবীর ডান পা মহাকাল ভৈরবের বুকে এবং বাঁ পা শায়িত বিরূপাক্ষ শিবের মস্তকে স্থাপিত।

  • নবকলেবর পরমপরম্পরা: ঠিক ১২ বা ১৪ বছর অন্তর অক্ষয়া তৃতীয়ায় গঙ্গামাটি ও গঙ্গাজল দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ৬ ফুট উচ্চতার বিগ্রহ নির্মাণ করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সপ্তডিঙা বাণিজ্যের কিংবদন্তি ও অষ্টমীর ডিঙি ভাসানো

দেবীর অলৌকিক আবির্ভাব ঘিরে প্রচলিত রয়েছে এক রোমাঞ্চকর সওদাগরী কাহিনি:

  • গুরুদাস নামে এক সওদাগর সপ্তডিঙা ভাসিয়ে নদীপথে যাওয়ার সময় রাজবলহাটের ঘাটে এক অপূর্ব বালিকাকে দেখতে পান।

  • সওদাগর বালিকাকে নৌকায় তুলতে চাইলে, বালিকা পা রাখামাত্রই একের পর এক ছয়টি বাণিজ্যতরী নদীতে তলিয়ে যায়।

  • সপ্তম নৌকায় পা রাখার মুহূর্তে দৈববাণী হয় যে, ওই বালিকা সাধারণ কেউ নন—তিনি স্বয়ং ভগবতী! সওদাগর ক্ষমা চাইলে দেবী অন্তর্হিতা হন এবং অলৌকিকভাবে ছয়টি ডুবে যাওয়া নৌকা ফের জলে ভেসে ওঠে।

ঐতিহাসিক রীতি: এই পৌরাণিক স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আজও দুর্গাপুজোর মহাঅষ্টমীতে মন্দিরের সামনের দীঘিতে সাতটি নিখুঁত কাটের নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তার মধ্যে ছয়টিকে ডুবিয়ে সপ্তমটিকে ভাসিয়ে রাখার অভিনব প্রথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে।

পঞ্জিকাহীন জলঘড়ির নির্দেশ ও তামাক সেবনের রাজকীয় ভোগ

রাজবল্লভী মাতা সারাবছর দশ মহাবিদ্যার রূপে পুজিত হলেও দুর্গাপুজোর ক’দিন তিনি মা দুর্গারূপে আরাধ্যা হন।

  • জলঘড়ির ব্যবহার: এই মন্দিরে দুর্গাপুজোর শুভক্ষণ ও সময় নির্ধারণে কোনো মুদ্রিত পঞ্জিকা দেখা হয় না। প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে বিশেষ ঘড়িয়াল ‘জলঘড়ি’ দেখে নির্ঘণ্ট মেপে পুজো শুরু ও সমাপ্তির নির্দেশ দেন পুরোহিতেরা। মহা নবমীতে এখানে মেষ, ভেড়া ও মহিষ বলির প্রথা রয়েছে।

  • রাজকীয় শয়ন ও তামাক প্রথা: রাজরাজেশ্বরী দেবী রাতে কাষ্ঠনির্মিত পালঙ্কে মশারি খাটিয়ে নিদ্রা যান। রাতে দেবীর তামাক পানের কামনায় গর্ভগৃহের এক কোণে জলভরা গড়গড়া ও সাজানো তামাক প্রস্তুত রাখা হয়।

  • মহাপ্রসাদ বিতরণ: কোনো ফোঁড়ন বা সম্বর ছাড়াই ভাত, ডাল, রুই মাছের অম্বল, সবজি, পায়েস, লুচি ও সন্দেশ দিয়ে দেবীর মধ্যাহ্ন ভোগ নিবেদন করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ ভক্ত মন্দিরে বসে এই অন্ন ভোগ গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুনঃ সাধক কমলাকান্তের ‘জীবন্ত’ কালী ও কোটালহাটের কালজয়ী সাধনপীঠ; বোরহাটের কমলাকান্ত কালীবাড়ি

তন্ত্র ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন

ইতিহাসবিদদের মতে, একসময় এই অঞ্চল জুড়ে বৌদ্ধ ধর্ম ও আদিবাসী তান্ত্রিকতার চরম প্রভাব ছিল। দেবীর মূর্তির গঠন ও পুজোপ্রথার মধ্যে বৌদ্ধ দেবী নীল সরস্বতী, তারা এবং পর্ণশবরীর সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়। মন্দিরের গর্ভগৃহের পিছনের খপ্পরে রাজা সদানন্দের পঞ্চমুণ্ডির আসল আসন ছিল বলে মনে করা হয়। আজও এই মন্দিরে গুপ্ততন্ত্রের বহু গোপনীয় প্রথা ও কড়া নিয়ম মেনে চলা হয়।

পরবর্তীকালে ১৩৪০ ও ১৩৪৬ সনে পুরোনো জরাজীর্ণ মন্দির সংস্কার করে নতুন নাটমন্দির, নহবতখানা, দীঘির ঘাট ও শিবমন্দির তৈরি করা হলেও রাজবলহাটের সর্বজনীন আবেগ ও রাজবল্লভী মাতার মহিমা আজও অমলিন।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন