বিশেষ অপরাধ ও রাজনৈতিক প্রতিবেদন:
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে দেওয়া শালবনি সরকারি জমি জালিয়াতি মামলা এবার সরাসরি গিয়ে পৌঁছাল শাসকদলের শীর্ষ স্তরে। সরকারি জমি বিক্রির কোটি কোটি বেআইনি টাকা সোজা রাজ্য যুব তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল বলে এর আগেই আদালতে জানিয়েছিল সিআইডি (CID)। এবার ধৃতদের জেরা করে গোয়েন্দারা যে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেলেন, তাতে সরাসরি নাম জড়িয়ে গেল ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সিআইডির দাবি, ধৃত সুমিত রায়ের বয়ান অনুযায়ী—অভিষেকের নির্দেশেই ওই বিপুল পরিমাণ টাকা দলীয় তহবিলে জমা করা হয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ ‘নিয়মিত কথা হচ্ছে..’; ঋতব্রত শিবিরের বিধায়কদের নজর বামেদের দিকে, বিস্ফোরক শতরূপ
অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিতের বিস্ফোরক বয়ান
শনিবার মেদিনীপুর আদালতে ধৃত সুমিত রায়কে পেশ করে রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি একটি বিস্তারিত তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। আদালত সূত্রে প্রকাশ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী:
-
টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ: জেরায় সুমিত দাবি করেছেন যে, সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই ‘টি ঘোষ’ (যিনি সাংসদের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচিত) তাঁকে ওই টাকা দিয়েছিলেন।
-
যুব তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট: কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে থাকা রাজ্য যুব তৃণমূলের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দফায় দফায় প্রায় ৭ কোটি টাকা জমা করেছিলেন সুমিত।
-
দাবি ও সাফাই: জমি জালিয়াতির কোনো টাকা নিজে নেননি এবং কেবল দলের নির্দেশেই তিনি কয়েকবার মেদিনীপুরে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন সুমিত রায়।
কামাক স্ট্রিট ও কালীঘাট কার্যালয়ের যোগ এবং ‘টি ঘোষ’-এর ভূমিকা
তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, অভিযুক্ত প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরার সঙ্গে সুমিতের নগদ আর্থিক লেনদেন প্রত্যক্ষ করেছেন অভিষেকের দুই নিরাপত্তারক্ষী এবং সুজয়ের নিজস্ব গাড়িচালক। সুজয় নিজে কলকাতায় এসে সুমিতের অফিসে টাকা পৌঁছে দিয়ে যেতেন।
গোয়েন্দাদের নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে, সুমিতের নিজস্ব কোনো পৃথক কার্যালয় ছিল না। ক্যামাক স্ট্রিট বা কালীঘাটে অভিষেকের সাংসদ কার্যালয় থেকেই তাঁর যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত হতো। সিআইডির স্পষ্ট বক্তব্য, একজন সাধারণ কর্মচারীর পক্ষে নিজ দায়িত্বে দলের অ্যাকাউন্টে ৭ কোটি টাকা জমা দেওয়া কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। ফলে সুমিতের দেওয়া তথ্য খতিয়ে দেখতে এবার খুব শীঘ্রই ‘টি ঘোষ’-এর বয়ান রেকর্ড করতে চলেছেন তদন্তকারীরা। সিআইডির ইঙ্গিত, এই তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তলব করা হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ ‘আবার ভোট হোক ৬ মাসে’, সুপ্রিম কোর্টের কাছে আর্জি অভিষেকের
আদালতের নির্দেশ ও হেফাজত বৃদ্ধি
শনিবার সুমিত রায় ছাড়াও এই মামলায় ধৃত অপর তিন অভিযুক্ত লক্ষ্মী ভূঁইয়া, নিত্য রায় এবং অমিত ঘোষকে মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়েছিল।
-
সরকারি আইনজীবী সৈয়দ নাজিম হাবিব ধৃতদের আরও গভীরে জেরা করার জন্য ৭ দিনের সিআইডি হেফাজতের আবেদন জানান।
-
বিচারক শুনানি শেষে সমস্ত দিক বিবেচনা করে ধৃতদের ৫ দিনের সিআইডি হেফাজতের নির্দেশ দেন।
-
তদন্তের প্রয়োজনে ধৃতদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন এবং একাধিক স্পর্শকাতর নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করেছেন গোয়েন্দারা।
শালবনি জমি জালিয়াতির মতো প্রশাসনিক দুর্নীতিতে সরাসরি প্রাক্তন শাসকদলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নাম জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে তীব্র আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে।


