বিশেষ প্রশাসনিক ও নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিবেদন:
আইনি জট ও পরিকাঠামোগত প্রস্তুতি চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রস্তাবিত সময়সূচি থেকে পিছিয়ে যেতে পারে আসন্ন কলকাতা ও হাওড়া পুরসভা নির্বাচন। আদালত হস্তক্ষেপ না করলে চলতি বছরের নভেম্বরের পরিবর্তে আগামী ২০ ডিসেম্বর এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার কলকাতা পুরসভার ২০৯টি ওয়ার্ডের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি সর্বদলীয় বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের বক্তব্যে এই সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।
ভোট পিছনোর মূল কারণ ও নতুন সময়সূচি
রাজ্য নির্বাচন কমিশন প্রথমে আগামী ২৮ বা ২৯ নভেম্বর পুরভোট করার বিষয়ে নবান্নে সুপারিশ করেছিল। সেই অনুযায়ী প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি (তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট) প্রার্থী তালিকা ও বায়োডাটা চূলচেরা বিশ্লষণের কাজ শুরু করেছিল। তবে বর্তমানে একাধিক প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক কারণে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে:
-
ওয়ার্ড ও বুথ পুনর্বিন্যাস: ওয়ার্ড পুনর্গঠন এবং প্রায় ১০০টি বুথে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
-
এসআইআর (SIR) ও ভোটার তালিকা সংশোধণ: পূর্বে ২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের ভোটার তালিকাকে মাপকাঠি ধরা হলেও, বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়ার (SIR) জেরে এখন ১ নভেম্বর পর্যন্ত তালিকায় ওঠা নামের ভিত্তিতে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
-
আইনি সময়সীমা ও ছুটি: আগামী ১২ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নিয়ম অনুযায়ী ভোটের বিজ্ঞপ্তির পর অন্তত ২৫টি কার্যদিবসের সময় দিতে হবে। মাঝের ছটপুজো ও অন্যান্য ছুটির ক্যালকুলেটর হিসাব করে আধিকারিকদের অনুমান, আগামী ২০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ করা সম্ভব হতে পারে।
শুধু কলকাতা ও হাওড়াই নয়, এই ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে বালি, হলদিয়া, ধূপগুড়ি, কালিম্পং ও কার্শিয়াং পুরসভাতেও একযোগে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আলিপুরে সর্বদলীয় বৈঠক ও বিরোধীদের ক্ষোভ
মঙ্গলবার আলিপুরের ট্রেজারি বিল্ডিংয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলাশাসকের (জেনারেল) সভাপতিত্বে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের এক সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, পুনর্বিন্যস্ত ভোটগ্রহণ কেন্দ্র নিয়ে আপত্তি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২ নভেম্বর এবং শুনানি হবে ৪ ও ৫ নভেম্বরের মধ্যে। প্রতিটি বরোতে একজন করে ‘এমআরও’ (মিউনিসিপ্যাল রিটার্নিং অফিসার) এবং দলীয় প্রতিনিধিরা ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন।
তবে বৈঠক শেষে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি:
-
মমতা-তৃণমূল (MAITC): দলের প্রতিনিধি বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ তোলেন, “বৈঠকে আমাদের তোলা প্রশ্নগুলির কোনো উত্তর দিতে পারেনি কমিশন। অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ওয়ার্ড ও বুথ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।”
-
কংগ্রেস: কংগ্রেস প্রতিনিধি আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আপত্তি ও আপিলের নিষ্পত্তি না করেই তড়িঘড়ি ভোট করিয়ে শাসকদল ও বিজেপিকে সুবিধা দিতে চাইছে কমিশন। সর্বদলীয় বৈঠকের নামে প্রহসন চলছে।”
-
সিপিআই(এম): বাম প্রতিনিধি সুব্রত দত্ত খসড়া তালিকায় ‘ক্লেমস অ্যান্ড অবজেকশন’-এর জন্য পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার অভিযোগ এনে সরব হন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এসআইআর চলাকালীন ট্রাইব্যুনালে কলকাতার ১ লক্ষ ৩০ হাজার এবং হাওড়ার ৩৯ হাজার ভোটারের নাম বিচারধীন থাকা সত্ত্বেও কিসের ভিত্তিতে এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত?
আরও পড়ুনঃ বৃহৎ সাইবার হানার কবলে সনি; ২৫ লক্ষেরও বেশি গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস
বিজেপির পাল্টা প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে, বিরোধীদের সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বৈঠকে অংশ নেওয়া বিজেপির উত্তর কলকাতার সাধারণ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন দে জানান:
“কমিশন সবাইকে আপত্তি জানানোর পর্যাপ্ত সময় দিয়েছে। বিজেপি নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে এবং যখনই ভোট হোক, তাতে অংশ নিতে পূর্ণ প্রস্তুত।”
আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার টানাপোড়েনে নভেম্বরের নির্বাচন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে গড়াচ্ছে কি না, তা আগামী ১২ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।


