বিশেষ অপরাধ ও রাজ্য প্রতিবেদন:
প্রেমিকাকে চুম্বন করার মতো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোমহর্ষক ও অমানবিক ঘটনার সাক্ষী রইল দক্ষিণ কলকাতার বেহালার সরশুনা। প্রকাশ্যে নাবালিকাকে চুম্বনের অভিযোগে এক তরুণ, তাঁর বাবা এবং অপর এক বন্ধুকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে রাস্তায় প্রায় ৫০ মিটার হাঁটাতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে খোদ কিশোরীর পরিবারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বর্বরোচিত এই ঘটনার ভিডিও পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়। এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়। পুলিশ ইতিমধ্যেই কিশোরীর বাবা, মা এবং মামা—এই তিন মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে।
আরও পড়ুনঃ ভারতীয় বাজারে চিনা স্মার্টফোনের আধিপত্যে বড়সড় ধস; জায়গা দখল করছে দেশীয় ব্র্যান্ড
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত রবিবার সন্ধ্যায় ১৮ বছরের এক তরুণ সরশুনার খালপাড় মাঠের সামনে তাঁর ১৩ বছরের পরিচিত এক কিশোরীর সঙ্গে দেখা করতে যান। তাঁর সঙ্গে ১৯ বছরের এক বন্ধুও ছিলেন। কথপ্রসঙ্গের মাঝেই তরুণ ওই নাবালিকাকে চুম্বন করেন, যা দূর থেকে দেখতে পেয়ে যান নাবালিকার মামার এক পরিচিত। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কিশোরীর বাবা ও মামাকে বিষয়টি জানান।
অভিযোগ, এরপরেই কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার এবং মামা রাহুল বর্মন ওই দুই তরুণকে জোর করে ক্ষুদিরামপল্লির একটি বাড়িতে ডেকে পাঠান। মামা রাহুল ফোন করে তাঁর আরও জনা ছয়েক বন্ধু ও সহযোগীকে ডেকে নেন। বাড়ির ভেতরে দীর্ঘক্ষণ ধরে দুই তরুণকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে তরুণের বাবা পৌঁছালে তাঁকেও ছাড় দেওয়া হয়নি।
বন্দুক ঠেকিয়ে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটার চরম অত্যাচার
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, এর পরেই তিন জনের মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাঁদের পরনের সমস্ত পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়। এরপর বিবস্ত্র অবস্থায় রাস্তায় প্রায় ৫০ মিটার হাঁটতে বাধ্য করা হয় ওই তরুণ, তাঁর বন্ধু এবং খোদ তরুণের বাবাকে। গোটা ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করা হয়।

পরবর্তী সময়ে স্থানীয় কিছু সাহসী বাসিন্দার হস্তক্ষেপে এবং সক্রিয় ভূমিকায় ওই তিন জন হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পান। স্থানীয়রাই তাঁদের উদ্ধার করে একটি স্থানীয় গ্যারাজে সাময়িক আশ্রয় দেন এবং তাঁদের পোশাক ফিরিয়ে দেন। এই বর্বরোচিত ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উত্তেজিত জনতা ওই কিশোরীর পরিবারের বাড়িতে ভাঙচুর চালায় বলে খবর।
পুলিশি পদক্ষেপ ও আইনি ধারা
ঘটনার পরই সরশুনা থানায় তরুণের বাবার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার একটি জোরালো মামলা রুজু করা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র সংশ্লিষ্ট ধারায় খুনের চেষ্টা, বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে আঘাত, জোর করে অপহরণ বা তুলে নিয়ে যাওয়া, বেআইনি ভাবে আটকে রাখা, সম্মানহানি এবং ভয় দেখানোর অপরাধে মামলা রুজু করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র আইনের (Arms Act) ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই এআইআর-এ নাম থাকা তিন মূল অভিযুক্ত—কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার, মা রিঙ্কু সরকার এবং মামা রাহুল বর্মনকে গ্রেফতার করেছে।
আরও পড়ুনঃ ‘বিজেপি দফতরের সামনে গায়ে আগুন দেব’! অর্জুনকে নিশানা করে আচমকা হুঁশিয়ারি বিধায়ক কৌস্তুভের
রাজনৈতিক যোগ ও তদন্তের অগ্রগতি
এই ঘটনায় রাজনীতির রঙও লেগেছে। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, মূল অভিযুক্ত কিশোরীর মামা রাহুল বর্মন একসময়ে সক্রিয়ভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১২৬ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। বিরোধী শিবির এই নিয়ে শাসকদলকে আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে।
পুলিশ ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে এবং ব্যবহৃত অস্ত্রের খোঁজ পেতে এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ সংগ্রহ করছে। নিগৃহীত দুই তরুণের মেডিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাঁদের গোপন জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়েছে। তরুণেরা পুলিশকে জানিয়েছেন যে পোশাক খুলতে বাধ্য করতে তাঁদের মাথায় বন্দুক ঠেকানো হয়েছিল। তবে এখনও পর্যন্ত পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। পলাতক অপর ছ’জন অভিযুক্তের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে সরশুনা থানার তদন্তকারী দল।


