কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল—শিলিগুড়ি করিডর বা সুপরিচিত ‘চিকেনস নেক’-এর আকাশসীমা ও ভূখণ্ড সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ও মেগা পদক্ষেপ নিল নয়াদিল্লি। চিন ও পাকিস্তানের যৌথ সামরিক অক্ষকে কড়া বার্তা দিয়ে ইতিমধ্যেই এই করিডরে মোতায়েন করা হয়েছে রাশিয়ার তৈরি শক্তিশালী এস-৪০০ (S-400) ডিফেন্স সিস্টেম। এর পাশাপাশি আকাশপথে শত্রুর যেকোনো অদৃশ্য চক্রান্ত নস্যাৎ করতে এবার যুক্ত করা হলো বিশ্বের অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—ইজরায়েলি অ্যারোস্ট্যাট রাডার (Israeli Aerostat Radar)।
আরও পড়ুনঃ ভারতীয় বাজারে চিনা স্মার্টফোনের আধিপত্যে বড়সড় ধস; জায়গা দখল করছে দেশীয় ব্র্যান্ড
পাহাড় ভেদ করে নজরদারি: ইজরায়েলি অ্যারোস্ট্যাট রাডারের বিশেষত্ব
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, দুর্গম পাহাড় ঘেরা ও কুয়াশাবৃত ভৌগোলিক অবস্থানে সাধারণ রাডার অনেক সময়েই কার্যকরভাবে শত্রু বিমানের গতিবিধি ধরতে ব্যর্থ হয়। সেই সমস্যার পাকাপাকি সমাধানেই ইজরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (IAI)-এর তৈরি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নামানো হয়েছে।
-
বেলুনের মাধ্যমে উঁচুতে নজরদারি: এই রাডারটি মূলত বিশাল বেলুনের মতো আকাশে ভেসে থেকে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বাধাকে পাশ কাটিয়ে সুদূর আকাশসীমার ওপর নিখুঁত নজর রাখতে সক্ষম।
-
ক্ষমতা ও পরিসর: এটি অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে আসা শত্রু পক্ষের ক্রুজ মিসাইল, স্টিলথ ড্রোন (Stealth Drone) বা আধুনিক যুদ্ধবিমান অনেক দূর থেকেই শনাক্ত করতে পারে। ইজরায়েলের এই থ্রি-ডি (3-D) রাডারটি প্রায় ৫০০ কিলোমিটার আকাশসীমার মধ্যে শত্রুর যেকোনো গতিবিধি মুহূর্তের মধ্যে ধরে ফেলতে পারদর্শী।
সীমান্তে বহুমুখী কড়া নিরাপত্তা বলয় ও সামরিক ঘাঁটি
শিলিগুড়ি করিডরের ২২ কিলোমিটার চওড়া সংকীর্ণ ভূখণ্ডকে সুরক্ষিত রাখতে কেবল আকাশপথেই নয়, স্থল ও ভূগর্ভস্থ স্তরেও নজিরবিহীন বন্দোবস্ত করেছে ভারত:
-
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত: সীমান্ত এলাকা এখন সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের আধুনিক বেড়া, শক্তিশালী নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং উন্নত এরিয়া ডমিনেশন ব্যবস্থায় মুড়ে ফেলা হয়েছে। পাতার শব্দ হলেও তা এখন বিএসএফ-এর (BSF) নজরে চলে আসবে।
-
নতুন সামরিক ঘাঁটি: বাংলাদেশ সীমান্তের সংলগ্ন এলাকায় আসামের ধুবড়ি সংলগ্ন বামুনি, বিহারের কিশনগঞ্জ এবং উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে।
-
আকাশ প্রতিরক্ষা: রাশিয়ার তৈরি ‘সারফেস টু এয়ার মিসাইল’ সম্বলিত এস-৪০০ ডিফেন্স সিস্টেম ইতিমধ্যেই মোতায়েন রেখে আকাশপথ দুর্ভেদ্য করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ হারিয়ে যাওয়া মার্টিন রেল! বাগুইআটির বুকে আজও বেঁচে আছে ছোটগাড়ির স্মৃতি
ভূগোল ও জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চিনের ঠিক সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই ‘চিকেনস নেক’ ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলিকে যুক্ত করার একমাত্র ধমনী। স্বভাবতই চিন ও পাকিস্তানের কুদৃষ্টি রয়েছে এই করিডরের ওপর। এমনকি সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, মাদক ও জাল নোট পাচারের পাশাপাশি জঙ্গিদের অনুপ্রবেশের ছকও কষে থাকে বিভিন্ন শত্রুভাবাপন্ন শক্তি।
এই চরম ঝুঁকি এড়াতে ভারতীয় বিমান বাহিনী একাধিক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিয়েছে:
-
পুনরুজ্জীবিত এয়ারস্ট্রিপ: বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পাঁচটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি বা এস্ট্রিপ জরুরি অপারেশনাল সুবিধার জন্য ফের চালু করা হয়েছে।
-
আন্ডারগ্রাউন্ড রেল করিডর: মাটির প্রায় ৪০ কিলোমিটার নিচ দিয়ে একটি স্ট্র্যাটেজিক রেল করিডর গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে শত্রু পক্ষ স্থলপথে আক্রমণ চালালেও বা ভূপৃষ্ঠের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও, মাটির তলা দিয়েই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধের রসদ, অস্ত্র ও সেনা পাঠানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, চিন সীমান্ত সংলগ্ন ‘চিকেনস নেক’-এর সুরক্ষায় ভারতের এই ত্রিমুখী (আকাশ, স্থল ও ভূগর্ভস্থ) প্রতিরক্ষা বন্দোবস্ত শত্রুপক্ষের যেকোনো অপচেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।


