বিশেষ কাশ্মীর ও জাতীয় রাজনীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন:
জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে ফের এক বড়ো রকমের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স (NC)-এর অন্দরে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ এবার তীব্র বিস্ফোরণের আকার ধারণ করেছে। দলের প্রায় ১৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গোষ্ঠীতন্ত্র এবং সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে অবহেলার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের জেরে যদি এই বিধায়করা দল ছেড়ে বিজেপির হাত ধরেন, তবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকারের গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ নতুন সমীকরণ ইজরায়েলে! সরকার গঠনের পথে নেতানিয়াহু?
১. অসন্তোষের নেপথ্য কারণ: মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ ও একতরফা সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ চারজন নতুন মন্ত্রীকে শপথবাক্য পাঠ করান। কিন্তু এই সম্প্রসারণের পরেই দলের ভেতরে বঞ্চনা ও ক্ষোভ প্রকাশ্য রূপ নেয়।
-
বাদ পড়া প্রবীণরা: দলের একাধিক সিনিয়র বিধায়ক মন্ত্রীপদ থেকে বাদ পড়ায় তাঁদের অনুগামী মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। তাঁদের মূল অভিযোগ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেওয়া হচ্ছে না, বরং দলের অন্দরে একটি নির্দিষ্ট ছোট গোষ্ঠীর প্রভাব ও একনায়কতন্ত্র মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে।
-
শ্রীনগরে গোপন বৈঠক ও আলটিমেটাম: সম্প্রতি শ্রীনগরে ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রায় ১৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। নেতৃত্বকে চাপে ফেলতে তাঁরা প্রশাসন ও দলের ওপর ১৪ থেকে ১৫ দিনের একটি কড়া আলটিমেটাম জারি করেছেন। তাঁদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে—মন্ত্রিসভার আমূল পরিবর্তন, অন্দরের উপদেষ্টাদের অপসারণ এবং দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিষ্কার রোডম্যাপ তৈরি করা।
২. অঙ্কের খেলা: বিজেপির সরকার গঠনের সমীকরণ
জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভার মোট আসন সংখ্যা ৯৫টি। এর মধ্যে মনোনীত ৫টি আসন খালি থাকায় বর্তমান কার্যকর শক্তি হলো ৯০টি।
-
ম্যাজিক ফিগার: বর্তমান ৯০ সদস্যের বিধানসভায় সরকার বা গরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য ন্যূনতম ৪৬ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন।
-
সংখ্যাগরমিল ও হিসাব: ন্যাশনাল কনফারেন্সের মোট আসন সংখ্যা প্রায় ৪১ থেকে ৪২-এর কাছাকাছি। কংগ্রেসসহ অন্যান্য সহযোগীদের সমর্থন নিয়ে বর্তমানে ওমর আবদুল্লাহর সরকার গঠিত হয়েছিল। কিন্তু যদি ১৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক দল থেকে বেরিয়ে যান এবং বিরোধী বিজেপির (যাদের বর্তমান আসন সংখ্যা ২৯) পাশে গিয়ে দাঁড়ান, তবে বিদ্রোহী ও বিজেপির সম্মিলিত আসন সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৭টিতে। আর এই গাণিতিক হিসাবই এক লহমায় বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে বড়ো প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
-
বিজেপির অবস্থান: প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং একে কাজে লাগানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের দাবি, এই সংকটই প্রমাণ করে যে শাসক দল জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
৩. আগা সৈয়দ রুহুল্লাহর পদত্যাগ ও আদর্শিক চ্যুতি নিয়ে প্রশ্ন
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের অভ্যন্তরীণ ধাক্কা আরও তীব্র হয়েছে শ্রীনগরের সাংসদ আগা সৈয়দ রুহুল্লাহর এক বিস্ফোরক পদক্ষেপে।
-
দল ও সংসদ থেকে পদত্যাগ: তিনি একযোগে দল ও সংসদীয় পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা করেছেন। তাঁর সাফ অভিযোগ, ন্যাশনাল কনফারেন্স বর্তমান সময়ে এসে তাদের মূল আদর্শিক প্রতিশ্রুতি ও নীতি থেকে সরে এসেছে। তাঁর এই পদত্যাগ দলীয় অস্থিরতার পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ এসএফআই-সিপিএম চক্ষুশূল! বিজেপি সরকারের প্রতি ‘আস্থাশীল’ বুদ্ধদেবপুত্র সুচেতন
৪. এনসি নেতৃত্বের সাফাই ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলেও, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতৃত্ব এই ঘটনাকে ‘বিদ্রোহ’ বলে মানতে নারাজ।
-
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের যুক্তি: দলের প্রবীণ নেতারা দাবি করেছেন, কিছু বিধায়কের ক্ষোভ বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে, যা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক দলীয় প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। দল ভাঙার কোনো সম্ভাবনা বা পরিকল্পনা নেই। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং দলনেতা ফারুক আবদুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হবে বলেই তারা আশাবাদী।
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সীমিত ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে রাজ্যর মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দাবি যখন জোরালো, ঠিক তখনই ঘরের অন্দরের এই বিদ্রোহ যদি সত্যিই সংখ্যাতত্ত্ব বদলে দেয়, তবে কাশ্মীরের রাজনৈতিক মানচিত্র রাতারাতি পাল্টে যেতে পারে। বর্তমানে ১৪-১৫ দিনের আলটিমেটামের সময়সীমার মধ্যে শীর্ষ নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজনৈতিক মহল।


