বিশেষ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রহস্যময় ক্ষেত্র সমীক্ষা:
মেদিনীপুর শহরের মহতাবপুর এলাকার পদ্মাবতী মহাশ্মশান—যেখানে একধারে জ্বলতে থাকা চিতার আগুন, আর অন্যদিকে গা ছমছমে নীরবতার মাঝে স্বমহিমায় বিরাজিতা মা উগ্রতারা। সাধারণ চণ্ডীমণ্ডপ বা মণ্ডপের মৃন্ময়ী প্রতিমা নয়, এখানে তন্ত্র সাধনার চরম ও জটিলতম প্রকরণে অপঘাতে মৃত ষোড়শবর্ষীয়া কুমারী মেয়ে এবং মৃত ব্রাহ্মণ পুরুষের অস্থির কাঠামো ও করোটি (খুলি) দিয়ে নির্মিত বিগ্রহে স্বয়ং উগ্রতারা ও মহাদেব শিব রূপে পূজিত হন। শ্মশানের ভয়াল পরিবেশ এবং শব সাধনার ঐতিহ্যকে ধারণ করে গড়ে ওঠা এই তন্ত্রপীঠের মহিমা আজও মেদিনীপুর শহর তথা সমগ্র বাংলার সাধক ও পুণ্যার্থীদের আকর্ষণ করে।
আরও পড়ুনঃ পাতকুয়োর অন্ধকারে আরাধ্যা দেবী! দক্ষিণ কলকাতার ‘ছানা কালী’ ও মনোহর ডাকাতের অজানা কাহিনী
বিগ্রহের অদ্ভুত নির্মাণশৈলী ও আধ্যাত্মিক রহস্য
মেদিনীপুরের এই প্রাচীন মন্দিরটি অন্য যেকোনো শক্তিপীঠ বা কালী মন্দির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিগ্রহ ও আসন নির্মাণের ক্ষেত্রে এখানে প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্রের কঠোরতম অনুশাসন মেনে চলা হয়েছে:
-
তিনটি বিশেষ করোটির সংযোজন:
-
দেবী উগ্রতারা: দেবী মূর্তির মূল মুখমণ্ডলের অভ্যন্তরে গ্রথিত রয়েছে অপঘাতে প্রয়াণ ঘটা এক ষোড়শবর্ষীয়া কুমারী মেয়ের মাথার করোটি এবং তাঁর অস্থির ওপর নির্মিত হয়েছে দেবীপ্রতিমার কাঠামো।
-
মহাদেব শিব: দেবীর চরণতলে থাকা মহাদেব শিবের মুখমণ্ডলে গ্রথিত রয়েছে এক মৃত ব্রাহ্মণ পুরুষের করোটি।
-
শব/প্রেত রূপ: দেবীর পদতলে শায়িত শবের মুখমণ্ডলে সংযোজিত রয়েছে একজন চণ্ডাল বা চাড়ালের করোটি।
-
-
পঞ্চমুণ্ডির আসন: মন্দিরে গভীর শব সাধনার নিমিত্তে পাঁচটি মানব করোটি দিয়ে নির্মিত ও প্রতিস্থাপিত রয়েছে অতিজাগ্রত পঞ্চমুণ্ডির আসন।
-
গর্ভগৃহে দেব-দেবী: শ্মশান সংলগ্ন মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহে প্রেতের ওপর শিব এবং তাঁর ওপর স্বয়ং দেবী উগ্রতারা। দেবীর দুই পাশে রয়েছেন অতন্ত্র সঙ্গী ডাকিনী ও যোগিনী এবং সর্বদা অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকায় বিনায়ক গণেশ।
-
নবকলেবর ও পুনর্নির্মাণ: প্রতি ১২ থেকে ১৩ বছর অন্তর পুরনো কঙ্কাল ও অস্থি কাঠামোর ওপর নিয়ম মেনে পুনর্নির্মাণ করা হয় নবনির্মিত বিগ্রহ।
দেড়শো-দুশো বছরের ইতিহাস ও বেনারসের সাধু
স্থানীয় প্রবীণ ও ঐতিহাসিকের মতে, এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ও তন্ত্রাচার শুরুর সুনির্দিষ্ট কোনো নথিভুক্ত তারিখ না পাওয়া গেলেও, ইতিহাস আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ বছর পুরনো।
-
সাধক পশুপতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগমন: জনশ্রুতি রয়েছে, পরাধীন ভারতে বেনারস থেকে আগত পশুপতি বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একসিদ্ধ তন্ত্রসাধক (কারো মতে পরিচয়হীন এক ভিনদেশি সাধুবাবা) প্রথম মহতাবপুর মহাশ্মশানে আসেন।
-
প্রতিষ্ঠা ও প্রথা: তিনিই প্রথম অপঘাতে মৃত কুমার-কুমারীর অস্থি সংগ্রহ করে উগ্রতারা ও শিবের বিগ্রহ রূপ দান করেন এবং চরম গুপ্ত তন্ত্রাচারে পুজোর সূচনা করেন।
আরও পড়ুনঃ চুন-সুরকির নীলচে বিগ্রহ ও শতবর্ষের অনন্য তান্ত্রিক ইতিহাসের রূপরেখা; শিবপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘হাজার হাত কালীবাড়ি’
চিতাভস্মের হোম ও বাৎসরিক কায়দা
মেদিনীপুর শহরবাসীর কাছে এই ধামটি ‘শ্মশানকালী মায়ের পুজো’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
-
চিতার আগুনে হোম প্রজ্জ্বলন: এই মন্দিরের বাৎসরিক ও বিশেষ পুজোর হোমাগ্নি অন্য কোনো সাধারণ কাষ্ঠ বা প্রদীপে জ্বালানো হয় না। পাশেই অবস্থিত পদ্মাবতী মহাশ্মশানের সদ্য জ্বলন্ত চিতা থেকে আগুন সংগ্রহ করে হোমকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত করা হয়।
-
পশু বলি ও উপাচার: সম্পূর্ণ প্রকট তন্ত্রাচারে পূর্ণ উপাচার ও বলিদান পদ্ধতির মাধ্যমে দেবী উগ্রতারার আরাধনা সম্পন্ন হয়।
বারো মাসই স্থানীয় অধিবাসী ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধু-সন্ন্যাসী ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগে থাকে এই অতিজাগ্রত তন্ত্রপীঠে। মহাশ্মশানের চিতাভস্মের ধোঁয়া আর দেবী উগ্রতারার গম্ভীর উপস্থিতি আজও মেদিনীপুরের রহস্যময় ইতিহাস ও প্রাচীন শাক্ত ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল।


