বিশেষ বিজ্ঞান প্রতিনিধি:
সূর্য থেকে প্রায় ৩০০ কোটি মাইল দূরে মহাবিশ্বের এক অন্ধকার ও হিমশীতল কোণে অবস্থিত প্লুটো। এত দিন ধরে সৌরজগতের এই দূরবর্তী বামন গ্রহকে (Dwarf Planet) এক নির্জীব, জমাট বাঁধা ও ভূতাত্ত্বিকভাবে ‘মৃত’ জগত বলেই মনে করত বিজ্ঞানমহল। কিন্তু নাসা (NASA)-র মহাকাশযান ‘নিউ হরাইজন্স’ (New Horizons)-এর পাঠানো নজিরবিহীন ঐতিহাসিক তথ্য ও ছবি সেই চিরাচরিত ধারণাকে এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে। সাড়ে ৯ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে প্লুটোর মাত্র ৭,৭৫০ মাইল দূর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় যানটি এমন কিছু ভূপ্রকৃতির ছবি পাঠায়, যা দেখে তাজ্জব বনে গেছেন বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব পর্যটন দিবসে বিনিয়োগের সুনামি; পর্যটন খাতে ১২,৫৩৪ কোটি টাকার বিনিয়োগের বার্তা
হৃদয়াকৃতি হিমবাহের পাশে ১১,০০০ ফুটের বিশাল পর্বতমালা
নিউ হরাইজন্সের অতি-সূক্ষ্ম ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, মাইনাস ২২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (−৩৮০°F) তাপমাত্রার চরম প্রতিকূল পরিবেশেও প্লুটোর বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল বিশাল বরফের পাহাড়।
-
পাহাড়ের পরিচয়: প্লুটোর বিখ্যাত হৃদয়াকৃতি হিমবাহ অঞ্চল Sputnik Planitia-র কিনারায় অবস্থিত এই পর্বতমালাগুলির উচ্চতা প্রায় ১১,০০০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছেছে। এগুলির নাম রাখা হয়েছে ‘নরগে মন্তেস’ (Norgay Montes) এবং ‘হিলারি মন্তেস’ (Hillary Montes)।
-
পাথরের মতো শক্ত বরফ: চরম শীতল তাপমাত্রায় প্লুটোর জলীয় বরফ (Water Ice) সাধারণ বরফের মতো থাকে না; তা গ্রানাইট পাথরের মতো অত্যন্ত শক্ত হয়ে পর্বতগুলোর মূল কাঠামো তৈরি করেছে। অন্যদিকে, মিথেন ও নাইট্রোজেনের তুলনামূলক নরম বরফ পাহাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে হিমবাহের মতো প্রবাহিত হচ্ছে।
অপেক্ষাকৃত ‘তরুণ’ ভূখণ্ড ও গর্তের অনুপস্থিতি
বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে এই পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো বড় আঘাতের গর্ত বা ‘ইমপ্যাক্ট ক্র্যাটার’ (Impact Crater)-এর অভাব।
| বিষয় | পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য |
| আঘাতের গর্তের অভাব | অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর মতো প্লুটোর এই অঞ্চলে গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি গর্তের দাগ প্রায় নেই বললেই চলে। |
| ভূখণ্ডের বয়স | বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ভূখণ্ড অত্যন্ত তরুণ—সম্ভবত ১০ কোটি বছরেরও কম পুরোনো (মহাজাগতিক বিচারে যা গতকালের মতো)। |
| অভ্যন্তরীণ সক্রিয়তা | গর্ত না থাকার অর্থ হলো, প্লুটোর অভ্যন্তরীণ কোনো চালিকাশক্তি ক্রমাগত পুরোনো পৃষ্ঠকে মুছে ফেলে নতুন ভূখণ্ড তৈরি করছে। |
আরও পড়ুনঃ বাবুঘাট থেকে আহিরীটোলা; মহালয়ার ভোরে গঙ্গাপাড়ে বাজবে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’
মহাকাশবিজ্ঞানে যুগান্তকারী পরিবর্তন
সূর্য থেকে চরম দূরত্বে থাকা এত ছোট একটি বরফময় জগতে যদি আজও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন বা সক্রিয়তা (Geological Activity) চলতে পারে, তবে তা সৌরজগতের বাইরের অন্যান্য দূরবর্তী গ্রহ ও উপগ্রহ সম্পর্কে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভাবনাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
বিজ্ঞানী মহলের একাংশের মতে, প্লুটোর ঘন বরফের আস্তরণের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে তেজস্ক্রিয় তাপে উত্তপ্ত এক উপ-পৃষ্ঠীয় তরল সমুদ্র। এই আবিষ্কার প্রমাণ করল, সূর্যের তীব্র আলো ছাড়াও কেবল নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর ভর করে মহাশূন্যের নির্জন কোণেও কোনো জগত ‘জীবন্ত’ থাকতে পারে।


