বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি, পুরী:
জগন্নাথদেবের মহাপীঠ পুরী বলতেই সাধারণত ভক্তদের মনে ভেসে ওঠে মন্দিরের চূড়া আর রথযাত্রার ছবি। কিন্তু এই পবিত্র ক্ষেত্রের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয় কেবল জগন্নাথ সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক সমৃদ্ধ শৈব, শাক্ত ও তান্ত্রিক ঐতিহ্য। আর সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন হলো মার্কণ্ডেয় সরোবরের নিকট অবস্থিত সপ্তমাতৃকা দেবীগণের প্রাচীন বিগ্রহসমষ্টি, যেখানে দেবী চামুণ্ডা এক বিশেষ ও অনন্য তাৎপর্য বহন করেন। সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রতিমাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এই বিগ্রহগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত, প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস! জনতার কাছে ক্ষমা চাইলেন বিজেপি বিধায়ক
১. পুরীর সপ্তমাতৃকা মন্দির ও তার অবস্থান
পুরীর মার্কণ্ডেশ্বর সাহি অঞ্চলে, প্রাচীন মার্কণ্ডেয় সরোবরের তীরে এই সপ্তমাতৃকা বিগ্রহসমষ্টি অবস্থিত। স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে এই সাত দেবী ‘সাত বোন’ বা ‘সপ্তভগিনী’ হিসেবে পূজিত হন।
ওড়িশা সরকারের প্রকাশিত গবেষণাভিত্তিক পত্রিকা ‘Orissa Review’-এর বিভিন্ন সংখ্যায় এই অঞ্চলের মাতৃকোপাসনার প্রাচীনত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই সপ্তমাতৃকা গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে—ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী ও চামুণ্ডা। দেবীগণের দুই পাশে বীরভদ্র ও গণেশের উপস্থিতি এই স্থানটিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ওড়িশার যাজপুরেও একটি বিখ্যাত সপ্তমাতৃকা মন্দির থাকলেও, পুরীর মার্কণ্ডেশ্বর অঞ্চলের বিগ্রহগুলি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র এক ঐতিহাসিক নিদর্শন।
২. কালনির্ণয় ও সোমবংশী যুগের সংযোগ
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, পুরীর এই সপ্তমাতৃকা বিগ্রহগুলির শেকড় ওড়িশার প্রাচীন সোমবংশী রাজাদের যুগে নিহিত রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে যা সাধারণত নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী মন্দির-ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থ ‘মাদলাপাঞ্জি’-র ঐতিহ্যবাহী বিবরণ অনুযায়ী, ভীমকেশরী এই বিগ্রহগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।
পাশাপাশি, মার্কণ্ডেশ্বর শিবমন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গেও এর গভীর যোগ রয়েছে। গঙ্গবংশীয় রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গদেবের রাজত্বকালের ৫৭তম বছরের (আনুমানিক ১১৩১–১১৩২ খ্রিস্টাব্দ) শিলালিপিপ্রমাণ এই অঞ্চলের প্রাচীন ধর্মীয় গুরুত্বকে জোরালোভাবে প্রমাণ করে।
৩. প্রতিমাতত্ত্ব এবং দেবী চামুণ্ডার স্বতন্ত্র রূপ
সপ্তমাতৃকা গোষ্ঠীর অন্যান্য দেবীর প্রতিমায় যেখানে স্নিগ্ধতা ও মাতৃত্বের প্রকাশ দেখা যায়, দেবী চামুণ্ডার রূপ সম্পূর্ণ আলাদা ও ভয়ংকরী শক্তির প্রতীক। তাঁর প্রতিমাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রধান হলো:
-
কঙ্কালসার দেহ: অত্যন্ত ক্ষীণ দেহ, ভিতরের দিকে ঢোকানো পেট এবং দৃশ্যমান শিরা-উপশিরা মানবদেহের অনিত্যতা ও ক্ষণস্থায়ী রূপকে ফুটিয়ে তোলে।
-
মুণ্ডমালা: নরমুণ্ডের মালা সময়ের প্রবাহ, মৃত্যুর অনিবার্য পরিণতি এবং মানুষের অহংকারের বিনাশের প্রতীক।
-
নামের উৎপত্তি: মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্য’ (দুর্গাসপ্তশতী) অনুযায়ী, দেবী দুর্গার ভ্রুকুটি থেকে আবির্ভূতা হয়ে যিনি চণ্ড ও মুণ্ড অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনিই চামুণ্ডা নামে পরিচিত হন।
আরও পড়ুনঃ ভেদাভেদহীন বাংলাদেশ গড়ার ডাক; মা দুর্গার উপরই ভরসা শেখ হাসিনার
৪. শৈব ও শাক্ত ঐতিহ্যের সমন্বয়
ওড়িশার সপ্তমাতৃকা ভাস্কর্যের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মাতৃকাগোষ্ঠীর দুই পাশে বীরভদ্র ও গণেশের উপস্থিতি। বীরভদ্র শিবের উগ্র শক্তির প্রতীক এবং গণেশ বিঘ্নবিনাশক। গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে প্রাচীন ওড়িশায় শৈব ও শাক্ত ঐতিহ্য একে অপরের পরিপূরক হিসেবে পাশাপাশি বিকশিত হয়েছিল।
পুরীর এই সপ্তমাতৃকা বিগ্রহগুলি কেবল পূজার উপকরণ বা পাথর খোদাই করা মূর্তি নয়; এগুলি ওড়িশার প্রাচীন শাক্তশিল্প, মাতৃকোপাসনার বিস্তার এবং মধ্যযুগীয় বাংলার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের গভীর আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র :-
এই বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে চাইলে নিচের প্রকাশনাগুলি বিশেষভাবে কাজে আসবে।
✅ ১. Orissa Review, September 2009
ওড়িশার সপ্তমাতৃকা উপাসনাকেন্দ্র এবং পুরীর মার্কণ্ডেশ্বর সাহি অঞ্চলের সপ্তমাতৃকা বিগ্রহ সম্পর্কে তথ্য রয়েছে।
[Orissa Review—September 2009](https://ova.gov.in/ovauploads/IandPRDeptRepository/04032022183512_-0-OR-Sep-2009.pdf?utm_source=chatgpt.com)
✅ ২. Orissa Review, June–July 2020
মার্কণ্ডেশ্বর মন্দির, সপ্তমাতৃকা বিগ্রহের কালনির্ণয় এবং সোমবংশী যুগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।
[Odisha Review—June–July 2020](https://magazines.odisha.gov.in/orissareview/2020/Jun-Jul/engpdf/june-july-or-2020.pdf?utm_source=chatgpt.com)
✅ ৩. Orissa Review, July 2005
ওড়িশার শাক্ত ঐতিহ্য এবং বারাহীসহ বিভিন্ন দেবীর প্রতিমাতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
[Orissa Review—July 2005](https://magazines.odisha.gov.in/Orissareview/jul2005/engpdf/eng_july_05_pdf.pdf?utm_source=chatgpt.com)
৪. রত্নাকর মহাপাত্রের Temples of Purushottama Kshetra (Puri)
পুরীর মন্দিরসমূহের স্থাপত্য, ইতিহাস এবং প্রতিমাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা।
[Temples of Purushottama Kshetra (Puri)](https://www.wisdomlib.org/history/essay/temples-of-purushottama-kshetra-puri/d/doc1457941.html?utm_source=chatgpt.com)
৫. দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী
চণ্ড ও মুণ্ডের বধ এবং চামুণ্ডা নামের উৎপত্তি বোঝার জন্য প্রাথমিক শাস্ত্রীয় সূত্র।


